হলি আর্টিজান হামলার পর কতটা এগোলো বাংলাদেশ


প্রকাশিত:
১ জুলাই ২০২২ ১১:১০

আপডেট:
১ জুলাই ২০২২ ২১:২৫

রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ছয় বছর পূর্ণ হলো আজ। এ ঘটনায় বিচারিক আদালতের রায়েরও কেটে গেছে প্রায় ৩১ মাস। কিন্তু এখনও মামলাটিতে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল হাইকোর্টের শুনানির অপেক্ষায় ঝুলে আছে। তবে আশার খবর হলো, মামলার পেপারবুক ইতিমধ্যে প্রস্তুত সম্পন্ন হয়েছে। তবে সব গুছিয়ে উঠতে ব্যয় হবে আরও কিছু সময়।

ছয় বছর আগে এই দিনে (২০১৬ সালের ১ জুলাই) নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি বেকারিতে ঢুকে প্রথমে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশি ২২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এছাড়া রাতভর জিম্মি করে রাখে বেকারিতে আসা বেশ কয়েকজন অতিথি ও বেকারির স্টাফদের। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে পার হওয়া সেই রাত শেষে ভোরে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ইউনিটের নেতৃত্বে পুলিশ ও র‌্যাব যৌথভাবে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামে অভিযান চালায়। ওই অভিযানে নিহত হয় পাঁচ জঙ্গি। উদ্ধার করা হয় হলি আর্টিজান বেকারিতে জিম্মি অবস্থায় থাকা দেশি-বিদেশি অতিথি ও বেকারির স্টাফসহ প্রায় ৩৫ জনকে।

বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ওই ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করে পুলিশ। এরপর মামলার তদন্ত হয়ে শুরু হয় বিচার। মামলার আট আসামির বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। টানা এক বছর মামলার বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমানের আদালত তার রায়ে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও একজনকে খালাস দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো- হামলার মূল সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা ওরফে র‌্যাশ, ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ। প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলার অপর আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেওয়া হয়।

বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশ রায়ের পর নিয়ম অনুসারে ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স ও খালাস চেয়ে করা আসামিদের জেল আপিল শুনানির জন্য মামলার নথিপত্র বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। বিচারিক আদালতের এসব নথির মধ্যে মামলার এজাহার, জব্দ তালিকা, চার্জ শিট, সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও রায়সহ মোট ২ হাজার ৩০৭ পৃষ্ঠার নথিপত্র হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় জমা করা হয়।

জানা গেছে, বিচারিক আদালত থেকে আসা মামলাটির সব নথিপত্র একত্রিত করে আপিল শুনানির জন্য উত্থাপনের জন্য পেপারবুক তৈরি করতে হবে। আর সে লক্ষ্যে সুপিম কোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা থেকে নথিপত্রগুলো বিজি প্রেসে পাঠানো হয়।

পেপারবুক প্রস্তুতের অগ্রগতি ও শুনানির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে চলে এসেছে বলে জানতে পেরেছি। তবে মামলার নথি যেহেতু রেফারেন্সে এসেছে সেহেতু মামলায় আসামিদের নিযুক্ত হবে। এসব বিষয় শেষ হলে মামলটি শুনানির জন্য প্রস্তুত হবে। তখনি প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ করবো, স্পর্শকাতর এই মামলাটি যেন দ্রুত শুনানির জন্য বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কেননা ওই ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্টের অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তাই অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মামলটির পেপারবুক প্রস্তুত হয়েছে। তবে আনুষঙ্গিক কিছু কাজ চলছে। সেগুলো শেষ হলেই শুনানির জন্য উঠবে।

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার পর জঙ্গি দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। বৃহস্পতিবার (৩০ জুন) নিজ দফতরে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি এ কথা জানান।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘হলি আর্টিজান একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা এবং আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা ছিল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নের জন্য আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং এটি এখনও বলবৎ আছে। এটি বাস্তবায়নের সফলতার কারণে এর পরে আর এমন ঘটনা ঘটেনি।’

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি

হলি আর্টিজানে হামলার পর বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‌‘ওই ঘটনার পর থেকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন ইউনিট, যারা সন্ত্রাসবাদ দমনে কাজ করছে, তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টারপোল বা বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’

সন্ত্রাসবাদের যে আন্তর্জাতিক মাত্রা সেটির প্রতি বাংলাদেশের নজর আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি বাংলাদেশে কোনও আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, সেটির বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি ও যোগাযোগ দুটোই করা হয়েছে।’

এছাড়া, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিও জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অন্য জায়গায় যদি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে থাকে, তবে সেটির প্রতি আমাদের নজর থাকে, যাতে করে সেটির প্রভাব আমাদের দেশে না পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগগুলোতে আমরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করি। সেখানে আমাদের সফলতা ও চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো আলোচনা করি।’

দেশীয় প্রস্তুতি

হলি আর্টিজান আমাদের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক ঘটনা ছিল উল্লেখ করে ইতালি ও জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসাবে কাজ করা মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘বিদেশি নাগরিকদের প্রতি আচরণ এবং তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ট্র্যাক রেকর্ড অত্যন্ত ভালো।’

তিনি বলেন, ‘দেশীয় উগ্রবাদি ও সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা মোকাবিলা করার মতো প্রস্ততি আমাদের ছিল না। ওই সময়ে আমাদের প্রস্তুতি না থাকলেও স্বল্প সময়ের মধ্যে বিষয়টি আমরা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীর তৎপরতার কারণে এটি সম্ভব হয়েছিল।’

বিভিন্ন বাহিনীর কার্যক্রমের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন মহলও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পরিবার বা বাড়িওয়ালা বা প্রতিবেশী সন্দেহজনক কিছু নজরে আসলে সেটির বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে থাকে বলে তিনি জানান।

বিদেশিদের আস্থা

হলি আর্টিজানের পর নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কারণে অনেক বিদেশি তাদের পরিবার নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘আমরা জানি যে, এরপর অনেক দেশের কূটনীতিক তাদের পরিবার দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল এবং অনেক দেশ তাদের ওয়াচলিস্টে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সেগুলো গত কয়েক বছরে আস্তে আস্তে তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন ‍বিদেশিরা অনেক স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে।’

তিনি বলেন, ‘জাপানের সাহায্য সংস্থা-জাইকার ভলান্টিয়ারদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আমরা দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মধ্যে আছি। আশা করছি, অচিরেই তারা সীমিত আকারে ফেরত আসবে।’

এ বছর ভলান্টিয়ারদের আসা শুরু হবে কিনা জানতে চাইলে মোমেন বলেন, ‘আমরা আশা করি। এ জন্য কাজ চলছে।’

জঙ্গিদের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট ও আল নুসরা ফ্রন্টের হয়ে সদস্য সংগ্রহের কাজ করছিল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক সামিউন রহমান ইবনে হামদান। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে কমলাপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। কিন্তু তিন বছরের মাথায় ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় কারাগার থেকে সে জামিনে বের হয়ে আসে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যায় ভারতে। সেখান থেকেই সে বাংলাদেশ-ভারতে জঙ্গিদের সংগঠিত করছিল। কিন্তু ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতারের পর সামিউনের জামিন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় তোলপাড় শুরু হয়।

শুধু সামিউন নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ অনেক নেতা ও সাধারণ সদস্য অনেকেই জামিন নিয়ে ফের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, জামিনে বের হয়ে আসা জঙ্গিদের কতটা নজরদারি করা হয়? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, শীর্ষ পর্যায়ের জঙ্গিরা জামিনে বের হলে কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণত সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বা পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যদের জানিয়ে থাকে। এরপর জামিন পাওয়া জঙ্গি সদস্যের ওপর নজরদারি করা হয়। তবে সব জঙ্গির ক্ষেত্রে এটি করা হয় না। সাধারণত শীর্ষ জঙ্গিদের ক্ষেত্রে নজরদারি করা হয়।

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে গঠিত ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট-সিটিটিসির প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা জামিনে বের হয়ে আসা শীর্ষ জঙ্গিদের নজরদারি করি। তারা কেউ পুনরায় জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে কিনা, তা নজরদারি করা হয়। এছাড়া তারা জামিনে বের হয়ে এসে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে বা কোথায় যাতায়াত করছে, তাও পর্যবেক্ষণ করা হয়।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, জঙ্গিবাদের ঘটনায় সাধারণত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। সারা দেশে এ পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রায় ২১০০ মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৫ শতাধিক। এসব আসামি তথা জঙ্গি সদস্যদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি জঙ্গি জামিনে রয়েছে। পলাতক রয়েছে তিন শতাধিক জঙ্গি।

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে গঠিত বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০১৮ সালে চালু হওয়ার পর থেকে তারা জঙ্গিদের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরির চেষ্টা করছেন। ২০০১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তারা জঙ্গিবাদ তথা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা পেয়েছেন ২ হাজার ১০০টি। এসব মামলায় ৯ হাজার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন বছরে ৫৫০ জন জঙ্গি জামিন পেয়েছে।

অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, তারা নিয়মিত জামিন পাওয়া জঙ্গি সদস্যদের মনিটরিং করেন। তবে জনবল স্বল্পতার কারণে কার্যকরীভাবে মনিটর করা যাচ্ছে না। তারা জামিন পাওয়া জঙ্গি সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করে প্রতি মাসে অন্তত দুই বার মোবাইলের মাধ্যমে সরাসরি জঙ্গি সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, অথবা তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এছাড়া তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গেও যোগাযোগ করে জামিন পাওয়া জঙ্গি সদস্যের খোঁজ করেন। এক্ষেত্রে থানা পুলিশের বিভিন্ন বিটের দায়িত্বে থাকা সদস্যদের সহায়তা নিয়ে থাকেন।

অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের গোয়েন্দা সেলের বিশেষ পুলিশ সুপার হাসানুল জাহিদ বলেন, আমরা জামিনে থাকা জঙ্গিদের নিয়মিত মনিটরিং করে থাকি। একই সঙ্গে তাদের ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশনের কাজ করছি। জামিনে বের হয়ে এসে যাতে নতুন করে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়তে না পারে, বা সংগঠিত হতে না পারে, তা নজরদারি করা হচ্ছে।

তবে জঙ্গিবাদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন এমন বিশ্লেষকরা বলছেন, জামিনে থাকা জঙ্গিদের নিয়মিত নজরদারির কথা বলা হলেও তা আসলে অপ্রতুল। তা না-হলে আমরা মাঝে মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই এমন জঙ্গি সদস্য গ্রেফতার হচ্ছে, যারা আগেও গ্রেফতার হয়ে জেলখানায় ছিল। জামিনে বের হয়ে এসে আবারও জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যমসারির একাধিক কর্মকর্তাও বলছেন, জামিনে থাকা জঙ্গিদের শতভাগ নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে যারা একটু নেতা টাইপের, তাদেরকে নজরদারি করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ছোট-খাটো বা সদস্য পর্যায়ের ব্যক্তিদের নজরদারি করা যায় না। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে গঠিত বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর এত জনবল নেই।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওই কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট জঙ্গিবাদ দমনে সফল হলেও তাদের অধিক্ষেত্র হলো রাজধানী ঢাকার মধ্যে। ঢাকার বাইরে অপারেশন করতে হলে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ বা পুলিশ সদর দফতরের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর সারা দেশের জঙ্গিবাদ দমনে ২০১৮ সালে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট গঠন করা হলেও এখনও জনবল সংকটের কারণে তারা প্রত্যেক জেলায় জেলায় কার্যক্রম চালাতে পারছে না। ঢাকা থেকে টিম পাঠিয়ে তাদের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

জঙ্গিবাদ বিশ্লেষক নূর খান লিটন বলেন, জামিনে থাকা জঙ্গিদের সবসময় নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। বিশেষ করে যারা সুপথে ফিরতে চায় তাদের সমাজে রি-এস্টাব্লিস্টমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য ডেডিকেটেডভাবে কোনও একটি সংস্থাকে কাজ করতে হবে। জঙ্গিবাদ দমনে একাধিক সংস্থা কাজ করছে। তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও দেখা যায়। জঙ্গিবাদ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে।

পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গুলশানের আর্টিজানের পরেই তাদের হামলার টার্গেট ছিল মগবাজারে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তরে। সেখানে দেশি-বিদেশি কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবক ছিল। জঙ্গিরা চেয়েছিল রেড ক্রিসেন্টের সদর দপ্তরের সবাইকে জিম্মি করবে। সেখানে বিদেশি থাকায় জিম্মিদশার সংবাদ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ পাবে, এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তারা নিজেদের শক্তি জানান দেবে।

জুলাইয়ের ১ তারিখ আর্টিজানের পর ১১/১২ তারিখের দিকে জঙ্গিদের টার্গেট ছিল রাজধানীর এয়ারপোর্ট রোডের আন্তর্জাতিক চেইন হোটেল রেডিসন ব্লুতে অতিথিদের জিম্মি ও হত্যা করা। জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ছিল রেডিসনের দেশি বিদেশি অতিথিদের হত্যা করে বাংলাদেশকে ‘অনিরাপদ’ হিসেবে ঘোষণা করা।

জঙ্গিরা যখন রেড ক্রিসেন্ট ও রেডিসনে হামলার পরিকল্পনা করেছিল, তৎক্ষণাৎ তা টের পেয়ে যায় বাংলাদেশ পুলিশ। জানায় রেডিসন এবং রেড ক্রিসেন্টকে। কয়েক স্তরের নিরাপত্তা নেয় রেড ক্রিসেন্ট। আর সংবাদ পেয়েই হোটেলের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয় রেডিসন। বাতিল করা হয় সব হল বুকিং। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। রেডিসনের মূল ফটকের ভেতরের প্যাসেজ ও পার্কিংয়ে কাউকে হাঁটা-চলাও করতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এই দুই জায়গায় হামলার সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকায় নস্যাৎ করে দেওয়া হয় জঙ্গিদের পরিকল্পনা। আর যিনি এ তথ্য পেয়ে এই দুই স্থাপনাকে জঙ্গিদের হামলা থেকে রক্ষা করেছেন তিনি হচ্ছেন তৎকালীন বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান। বর্তমানে তিনি পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান। এই বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১৭ সালে তাকে পুলিশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম) পদক দেওয়া হয়েছিল।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top