একদিনে ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৬৯ লিটার মজুত তেল উদ্ধার (সোল্ডার)

কত তেল লুকানো


প্রকাশিত:
১২ মে ২০২২ ০৩:০৫

আপডেট:
১৮ মে ২০২২ ০৬:৫৮

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ৫৮টি টিম সারাদেশে গতকাল বুধবার এক লাখ ৮০ হাজার ৯৬৯ লিটার মজুত করা ভোজ্যতেল উদ্ধার করেছে। এসব তেল উদ্ধার করে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। তাছাড়া গত ১০ দিনে ১ লাখ ১৫ হাজার ৩২ লিটার ভোজ্যতেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। বাজার তদারকির পাশাপাশি ভোজ্যতেলের মজুতদারদের বিরুদ্ধে এই অভিযান চলমান থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। তিনি জানান, আজ থেকে প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ করা শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে মামলাও করা হবে।

ঈদের প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই খুচরা বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যায়। তখন থেকেই সয়াবিন তেল পাচ্ছিল না ভোক্তারা। এমন পরিস্থিতির মধ্যে তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। কিন্তু তারপরও বাজারে তেল পাওয়া যাচ্ছিল না। সারা দেশে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মজুতকৃত তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, গত ১ মে থেকে ৯ মে পর্যন্ত ৭ জেলায় অভিযান চালিয়ে ৬৯ হাজার ৮৪০ লিটার ভোজ্যতেল উদ্ধার করা হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকায় ৩১ হাজার ৭৩০ লিটার, চট্টগ্রামে ১৬ হাজার ৫০ লিটার, কুমিল্লায় ছয় হাজার লিটার , দিনাজপুরে এক হাজার লিটার, নাটোরে ৩ হাজার ৬০০ লিটার, রংপুরে ১০ হাজার লিটার ও রাজশাহীতে এক হাজার লিটার ভোজ্যতেল উদ্ধার করা হয়।

গত ১০ মে ১৬টি জেলায় ৪৫ হাজার ১৯২ লিটার ভোজ্যতেল উদ্ধার করা হয়। এরমধ্যে যশোরে ১ হাজার ১৮ লিটার, নড়াইলে ৬০০ লিটার, সিলেটে ৫ হাজার লিটার, রংপুরে ১ হাজার ৩০০ লিটার, গাজীপুরে ৭ হাজার ১৫৮ লিটার, পাবনায় ১ হাজার ২৪৪ লিটার, সিরাজগঞ্জে সাড়ে ৪ হাজার লিটার, রাজশাহীতে ১৩২ লিটার, রাঙ্গামাটিতে ৩২০ লিটার, বরিশালে ৭০০ লিটার, ঝালকাঠিতে ১৫ হাজার লিটার, চাঁদপুরে সাড়ে ৭ হাজার লিটার, মৌলভীবাজারে ১০০ লিটার, মুন্সীগঞ্জে ৭০ লিটার, গোপালগঞ্জে ৩৫০ লিটার এবং মানিকগঞ্জে ২০০ লিটার ভোজ্যতেল উদ্ধার করা হয়।

বুধবার গাজীপুর ও ঢাকা জেলার বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুতে রাখা ১২ হাজার ৮২২ লিটার ভোজ্যতেল উদ্ধার করেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ঢাকা জেলার কর্মকর্তারা। এই অভিযান পরিচালনা করেন প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মণ্ডল ও মো. শরিফুল ইসলাম।

রাজশাহী নগরীতে অভিযান চালিয়ে একটি গুদামে থেকে আরও ১১৪ ব্যারেলে থাকা ২৩ হাজার ২৫৮ লিটার ভোজ্যতেল উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা এই অভিযান চালান। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হাসান আল মারুফ।
সাতক্ষীরার রাজার এলাকার সাকার মোড়ের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও সুলতানপুর বড় বাজারে অভিযান চালিয়ে ৯৭৪ লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। সয়াবিন তেল মজুত রাখার অভিযোগে দুই প্রতিষ্ঠানের মালিককে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় গুদামে সয়াবিন তেল মজুতের অপরাধে তিন প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বুধবার সকালে উপজেলার ঝিটকা বাজারে অভিযান চালিয়ে তাদের জরিমানা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মানিকগঞ্জের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, সারা দেশে এই অভিযান চলমান থাকবে। জরিমানার পাশাপাশি আমরা আজকে থেকে প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ করে দিচ্ছি। আর এই মাসের শেষ দিকে আমরা মামলা করা শুরু করবো।

এদিকে, বাংলাদেশে বছরে ২৫ থেকে ২৮ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা। এর মধ্যে ৯০ ভাগই আমদানি করতে হয়। আর মাত্র ৭-৮টি প্রতিষ্ঠান এসব ভোজ্য তেল আমদানি করছে। এর মধ্যে ৮০ ভাগই আমদানি করছে মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান আমদানি করার পর কার কাছে কী পরিমাণ তেল মজুদ রয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠান কোন ডিও ব্যবসায়ী বা পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করছে তার কোনো সঠিক তথ্য নেই। তথ্য না থাকার কারণেই ভোজ্য তেলের বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ভোজ্য তেলের মজুদ সরকারের হাতে নেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান ভোজ্য তেল আমদানি করায় তারা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। যখন-তখন কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করছে বাজারে। এভাবে দফায় দফায় ভোজ্য তেলের দাম মাত্র দুবছরে বোতলজাত ১০০ থেকে এখন ২০০ টাকায় ঠেকেছে। আর খোলা সয়াবিনের দাম ঠেকেছে ৮০ টাকা থেকে ২২০-২৫০ টাকায়।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সময়ের আলোক বলেন, ভোজ্য তেলের মজুদের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। খাদ্য অধিদফতরের যেমন গুদাম রয়েছে, তেমনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা টিসিবির মাধ্যমে ভোজ্য তেল মজুদের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের যদি সে সক্ষমতা না থাকে তা হলে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আর সরকারের মজুদ সক্ষমতা নেই বলেই ভোজ্য তেলের ব্যবসায়ীরা এত বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভোজ্য তেলের বাজারে বর্তমানে যে টালমাটাল অবস্থা তার জন্য যে ৬-৭টি কোম্পানি আমদানি করে এবং মিলে রিফাইন করে বাজারে ছাড়ছে কেবল তারাই দায়ী। এসব ব্যবসয়ীর নীতি-নৈতিকতাবিবর্জিত কাজ এবং অতিমুনাফা লোভের কারণেই ভোজ্য তেলের বাজার আজ এত অস্থির। কারণ বাজারে এখন যেসব ভোজ্য তেল রয়েছে, সেগুলো দুই থেকে তিন মাস আগে আমদানি করা এবং সেগুলো কম দামে কেনা। তা হলে কম দামে তেল কিনে কেন বেশি দামে বিক্রি করবে।

গোলাম রহমান আরও বলেন, সরকার ভোজ্য তেলের ওপর থেকে তিন ধাপে ৩০ শতাংশ ভ্যাট কমাল। অথচ তখন দাম কমাল লিটারে মাত্র ৮ টাকা। আর ব্যবসায়ীরা যখন নতুন করে প্রস্তাব দিল দাম বাড়ানোর, তখন একলাফে লিটারে ৩৮ টাকা বাড়ানো হলো। তা হলে কি বোঝা যাচ্ছে, সরকার সাধারণ মানুষের কথা না ভেবে ব্যবসায়ীরা যে প্রস্তাব দিচ্ছে সেভাবেই দাম বাড়াচ্ছে। সরকার দাম বাড়িয়ে ১ লিটারের দাম ১৯৮ টাকা নির্ধারণ করে দিল, কিন্তু তবুও বাজারে সয়াবিন তেলের সঙ্কট। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের ব্যবসায়ীকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, ঈদের আগে আমরা মিল পর্যায়ে অনেকগুলো অভিযান চালিয়েছি। এ সময় দেখা গেছে, মিল থেকে পর্যাপ্ত ভোজ্য তেল সরবরাহ করা হয়েছে। এগুলো মিল থেকে নিয়েছেন ডিও ব্যবসায়ী এবং পাইকারি ব্যবসায়ীরা। আমরা এখন দেখতে চাই তারা এসব তেল নিয়ে কী করলেন এবং কোথায় রাখলেন। ডিও ব্যবসায়ীরা এবং পাইকারি ব্যবসায়ীরা তেল মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করছে বলে আমরা মনে করছি। অভিযান চালিয়ে তাদের কাছ থেকে তেলগুলো যাতে বাজারে সাপ্লাই দেওয়া যায় সে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, মিলমালিকরা কী পরিমাণে ভোজ্য তেল আমদানি করেন এবং প্রতিদিন কী পরিমাণে বাজারে সরবরাহ করেন তার সঠিক তথ্য অনেক সময় দিতে চান না। এসব তথ্য আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস থেকে সংগ্রহ করতে হয়। সঠিক তথ্য না থাকার কারণে ভোজ্য তেলের মজুদেরও সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। এজন্য ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে, তারা যেন তাদের মজুদসহ সব তথ্য আমাদের দেন।

এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, প্রথম কথা হলো- মজুদের দায়িত্ব সরকারের নেওয়া ঠিক হবে না। সরকার যেটি করতে পারে এবং সেটি সরকারের পক্ষে করা খুবই সহজ যে, কোন কোম্পানি কতটুকু ভোজ্য তেল আমদানি করল, কোন কোম্পানি কতটুকু তেল মিলে শোধন করল এবং কোন কোম্পানি কী পরিমাণ বাজারে সরবরাহ করল তার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। একইভাবে ডিও ব্যবসায়ী কী পরিমাণে তেল নিল, পাইকারি ব্যবসায়ী কী পরিমাণে তেল নিল তার তথ্যও সংগ্রহ করতে হবে। যদিও এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা তথ্য দিতে বাধ্য হবে- এমন কোনো আইন নেই, কিন্তু এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে আইন করে হলেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এসব তথ্য নিতে হবে সরকারকে।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top