ভারতের সিদ্ধান্তে টালমাটাল গমের বাজার


প্রকাশিত:
১৬ মে ২০২২ ২০:৫৩

আপডেট:
১৬ মে ২০২২ ২০:৫৫

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢেলেছে ভারত। দেশটি গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যতম প্রধান এই খাদ্যশস্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে গমের বেঞ্চমার্ক ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

তীব্র দাবদাহের কারণে গমের উৎপাদন ব্যাহত এবং দাম রেকর্ড উচ্চতায় চলে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এই শস্যের রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে ভারত। বিশ্ব পণ্য বাজারে গমের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্প্রতি পাউরুটি থেকে শুরু করে কেক নুডলস, পাস্তাসহ প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে।

ভারতের সরকার বলেছে, রপ্তানির জন্য ইতিমধ্যে যেসব ঋণপত্র ইস্যু হয়েছে এবং যেসব দেশ তাদের খাদ্য নিরাপত্তার চাহিদা পূরণে সরবরাহের অনুরোধ করেছে, সেসব দেশে গম রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে।

দেশটির সরকার আরও বলেছে, বিশ্ববাজারে গমের রপ্তানিতে এই নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী নয় এবং কিছুদিন পর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে। তবে জার্মানিতে এক বৈঠকে অংশ নিয়ে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর জোট জি৭ এর কৃষিমন্ত্রীরা ভারতের গম রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

জার্মানির খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী সেম ওজদেমির বলেছেন, ‘যদি প্রত্যেকে রপ্তানি বিধি-নিষেধ আরোপ করতে শুরু করে অথবা বাজার বন্ধ করে দেয়, তাহলে সঙ্কট আরও বাড়বে।’

বিশ্বের সাতটি বৃহত্তম ‌‌‘উন্নত’ অর্থনীতির দেশের জোট জি৭। বিশ্ব বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম নিয়ন্ত্রক এই জোট। কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই জোটের সদস্য।

ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী হলেও অতীতে কখনই দেশটি বিশ্ববাজারে এই শস্যের প্রধান রপ্তানিকারক ছিল না। কারণ দেশটিতে উৎপাদিত বেশিরভাগ গম অভ্যন্তরীণ বাজারেই বিক্রি হয়ে যায়।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর বিশ্ববাজারে গমের রপ্তানিতে প্রচণ্ড ধাক্কা আসে। খরা এবং বন্যার কারণে অন্যান্য প্রধান উৎপাদনকারীদের গমের উৎপাদন হুমকিতে পড়ে। যদিও ব্যবসায়ীরা আশা করছিলেন সরবরাহের ঘাটতি ভারত থেকে পূরণ হবে।

নিষেধাজ্ঞার আগে ভারত চলতি বছর রেকর্ড এক কোটি টন গম রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। জাতিসংঘের (ইউএন) তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম গত মার্চে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

সংঘাতের কারণে বিশ্বের বৃহত্তম সূর্যমুখী তেল রপ্তানিকারক ইউক্রেন থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এই সংঘাতের প্রভাব প্রাথমিকভাবে তেলের বাজারে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা অন্যান্য প্রায় সব পণ্যের ওপর পড়েছে। ইউরোপের এই দেশটি ভুট্টা এবং গমের মতো খাদ্যশস্যেরও প্রধান উৎপাদনকারী। এসব পণ্যের দামও ব্যাপক বেড়েছে।

জাতিসংঘ বলেছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম গত এপ্রিলে সামান্য কমলেও তা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি রয়েছে। ক্রমবর্ধমান খাদ্য মূল্য, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতিও বেড়েছে। সূত্র: বিবিসি।

তবে যেসব দেশ খাদ্য সংকটে ভুগছে, সেসব দেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া যেসব দেশে এর আগে গম পাঠানোর চুক্তি হয়েছিল ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির, তারাও তাদের আগের চুক্তি অনুযায়ী গম পাঠাতে পারবেন। সেই হিসেবে আগামী জুলাই পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন রপ্তানি করতে পারবেন দেশটির রপ্তানিকারকরা।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্যসচিব বি. ভি. আর সুব্রাহমানিয়াম রোববার সংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন। শনিবার আন্তর্জাতিক বাজারে গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত। এক বিবৃতিতে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক কর্তৃপক্ষ ডিরেক্টোরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেডের (ডিজিএফটি) পক্ষ থেকে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

গম উৎপাদনে বিশ্বের দেশসমূহের মধ্যে শীর্ষে আছে চীন, তারপরই ভারতের অবস্থান। তবে উৎপাদনে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে থাকলেও গম রপ্তানিতে বেশ পিছিয়ে আছে দেশটি; এবং তার প্রধান কারণ অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা।

নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর তাই রপ্তানি করার জন্য গম তেমন অবশিষ্ট থাকে না ভারতের। বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা— প্রতিবেশী এই তিনটি রাষ্ট্রেই মূলত গম রপ্তানি করে ভারত।

আন্তর্জাতিক বাজারে গম রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন; কিন্তু এ দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় কৃষ্ণ সাগর অঞ্চল থেকে গমের চালান আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই চলছে এ অবস্থা।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লম্ফণ ঘটেছে গমের দামে। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্ব বাজারে গমের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশেরও বেশি। এদিকে, কৃষ্ণ সাগর থেকে গমের সরবরাহে উন্নতি না ঘটা ও বৈশ্বিকভাবে দাম বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দিক থেকে চাপ বাড়ছে ভারতের ওপর। কিন্তু আবহাওয়াগত কারণে বিগত বিভিন্ন বছরের তুলনায় চলতি বছর দেশটিতে গম উৎপাদনে রীতিমতো ধস নেমেছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যসচিব।

সাংবাদকিদের তিনি বলেন, গত বছর ১০৬ মিলিয়ন টন গম উৎপাদন করেছিল ভারত; কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও তাপপ্রবাহের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতে গমের ফলন। গত বছর যেখানে ভারতে উৎপাদিত গমের পরিমাণ ছিল ১০৬ মিলিয়্ন টন, সেখানে চলতি বছর এখন পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৩ মিলিয়ন টন গম।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top