দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের গ্র্যান্ড প্লান কেন ব্যর্থ হয়েছিল


প্রকাশিত:
১৯ নভেম্বর ২০২০ ১২:২৭

আপডেট:
১৭ মে ২০২১ ০৭:১০

১৯৪১, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুই বছর অতিবাহিত হয়েছে। জার্মান বাহিনীর সামনে সাফল্যের বিশাল তালিকা। কোনো বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই প্রায় সমগ্র পশ্চিম ইউরোপ দখলে চলে আসে জার্মান বাহিনীর, তেমন কোনো প্রতিরোধের লক্ষণও দেখা মেলেনি। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মুসোলিনির রোমান সাম্রাজ্যে ইতালীয়দের প্রতিষ্ঠা জার্মান হস্তক্ষেপে কার্যকর হয়।

‘‘শক্তি প্রতিরোধে নয়, আক্রমণেই প্রকাশিত হয়’’- অ্যাডলফ হিটলার

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তি জার্মানকে অনেকটাই পঙ্গু করে দেয়, এর থেকেই এবং হিটলারের উগ্র জাতীয়তাবাদ জন্ম দেয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ছবি : সংগৃহীত

জার্মান বাহিনী গ্রীসকে পরাস্ত করে এবং যুগোস্লাভিয়ায় উপনিবেশ স্থাপন করে। উত্তর আফ্রিকায়, রোমেলের নেতৃত্ব ব্রিটিশ ও মিত্র বাহিনীকে পরাস্ত করতে সমর্থ হয়। প্রথম দিকে খুব দ্রুত সাফল্য অর্জন করতে থাকে নাৎসি বাহিনী।

দ্রুত আক্রমণ করে প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধের কোনো সুযোগ না দিয়েই জিতে নেওয়ার হিটলারের এই রণ কৌশল ইতিহাসে ব্লিতযক্রিগ বা বিদ্যুৎ গতির যুদ্ধ নামে পরিচিত। তবু শেষ পর্যন্ত হিটলারকে পিছু হটতে হয়েছিল। আর এর পেছনে ছিল বেশ কিছু কারণ ও ঘটনা।

পরাজয়ের শুরু
হিটলারের প্রধান সমস্যাটি ছিল জার্মানি একই সময়ে একাধিক দেশের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পরে। যার জন্য যথাযথ সম্পদ ছিল না। হিটলারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপক ফ্রিটজ টড ইতিমধ্যে এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে শুরু করে। কিন্তু ২৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৪২ সালের এক বিমান দুর্ঘটনায় টড মৃত্যুবরণ করে।

টডের স্থানে স্থলাভিষিক্ত হয় হিটলারের ব্যক্তিগত স্থপতি তরুণ আলবার্ট স্পার। হিটলারের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও জয়ের জন্য প্রবল ইচ্ছা স্পারকে অনুপ্রাণিত করে নতুন করে হাল ধরতে। স্থপতি স্পার অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন করেছিলেন যা টড অনুভব করেছিলেন। তাঁর পদ্ধতিগুলি জার্মান প্লান্টগুলিতে নির্মিত প্লেন ও ট্যাঙ্কের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে এবং সৈন্যদের কাছে গোলাবারুদ সরবরাহ বাড়িয়ে তোলে।

মিত্র বাহিনীর তুলনায় জার্মানদের অস্ত্রের যোগান ছিল সীমিত। ছবি : সংগৃহীত

তবুও মিত্র বাহিনীর তুলনায় এই সংখ্যা প্রথম দিকে সামাল দিতে পারলেও শেষটায় দাড়াতে ব্যর্থ হয়। যার ফলে বড় বড় কিছু যুদ্ধে পরাজয় বরণ করতে হয় নাৎসি বাহিনীকে। পরবর্তীতে যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করে।

১৯৪১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পরে
১৯৪১ সালের শেষ নাগাদ নাৎসি বাহিনীকে শুধু মাত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্ত্র উৎপাদনের সাথেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়নি। বরং, বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধেও মোকাবেলা করতে হয়েছে।

১৯৪১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ব্রিটেনকে বাড়তি পরিমাণে অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে শুরু করেছিল। ডিসেম্বরের শুরুতে যখন জাপানিরা পার্ল হারবারে বোমা হামলা করে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পরে।

১৯৪২ সালে জার্মান ১৫০০০টি, ১৯৪৩ সালে ২৬০০০ এবং ১৯৪৪ সালে ৪০০০০ টি নতুন যুদ্ধ বিমান তৈরি করে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যথাক্রমে ৪৮০০০টি, ৮৬০০০টি এবং ১১৪০০০ টি যুদ্ধ বিমান তৈরি করে ঐ বছরগুলোতে।

এর সাথে যোগ হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে তৈরি বিমানগুলো। ১৯৪২ সালে ৩৭০০০, ১৯৪৩ সালে ৩৫০০০ এবং ১৯৪৪ সালে ৪৭০০০টি যুদ্ধ বিমান তৈরি হয় সোভিয়েত ইউনিয়নে।

ডিসেম্বরের শুরুতে জাপানিরা পার্ল হারবারে হামলা চালালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পরে। ছবি : সংগৃহী

এই বছর গুলোতে জার্মান প্রতিবছর গড়ে ৬০০০ করে ট্যাঙ্ক উৎপাদন করে। ব্রিটেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের উৎপাদন ছিল এর তিনগুণ বেশি। ১৯৪৩ সালে মিত্র শক্তির তৈরি মেশিনগানের সংখ্যা এক মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায় যেখানে জার্মানদের উৎপাদন ছিল ১৬৫০০০।

‘‘যে আকাশকে সবুজ দেখে এবং জমিনকে আঁকে নীল রঙে তাকে নপুংসক করে দেওয়া কর্তব্য’’-অ্যাডলফ হিটলার

আটলান্টিকের রণক্ষেত্র
১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশরা জার্মান সাইফার ডিকোড করার পদ্ধতি আবিষ্কার করে এবং তাদের রণতরী জার্মান ইউ-বোটগুলোর আশপাশে অবস্থান করতে থাকে। ছোট যুদ্ধ বিমানগুলোও এর সাথে যোগ দেয়। স্পটার বিমানগুলো জার্মান সাবমেরিন সনাক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হতো যা ব্রিটিশ কনভে গুলোতে থাকতো এবং সাবমেরিন সনাক্ত করতে বেশিরভাগ সময় ব্যয় করতো।

১৯৪৩ সালে মে মাসে জার্মানদের ডুবে যাওয়া জাহাজের চেয়ে বেশি পরিমানে জাহাজ মিত্র বাহিনী নির্মাণ করতে থাকে। ১৯৪৩ সালের ২৪ মে জার্মান নৌবাহিনীর অধিনায়ক অ্যাডমিরাল কার্ল ডনিটজ পরাজিত হন এবং উত্তর আটলান্টিক থেকে সাবমেরিন সরিয়ে নিয়ে যান। এভাবেই নাৎসি বাহিনীর পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে আটলান্টিক যুদ্ধ শেষ ছিল।

আবহাওয়াজনিত কারণ
১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে জাপান যুদ্ধে জার্মানদের সাথে যোগ দেয়, ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পরে। জার্মান বাহিনী রাশিয়ায় আক্রমণ করলে স্ট্যালিন বিপুল সংখ্যক সৈন্য ও অস্ত্র পশ্চিমে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। ফলশ্রুতিতে জার্মান বাহিনী মস্কোর বাইরে থেমে যেতে বাধ্য হয়।

এছাড়া শীতকালীন যুদ্ধের কারণেও জার্মান বাহিনীকে বেকায়দায় পরতে হয়। এছাড়া দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং এই অবস্থায় জার্মান বাহিনীকে রাশিয়ার রাজধানী দখল করার চিন্তা ত্যাগ করতে হয়। এ সময় জেনারেলদের অনেকেই গুরুতর হার্ট অ্যাটাক ও স্নায়ুতন্ত্রের অবসান জনিত সমস্যার সম্মুখীন হন।

ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ট্যাংক যুদ্ধ
এরপর থেকে জার্মান সেনাবাহিনী ক্রমাগত পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। স্ট্যালিনগ্রেডের রেড আর্মি ককেসাসে জার্মান বাহিনীর জন্য হুমকি হয়ে দাড়ায়। তাই নাৎসি বাহিনী ঐ অঞ্চলের তেলের ভাণ্ডারের দখল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। জুলাই ১৯৪৩ কুর্স্কে জার্মান সর্বশেষ পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটায়। এটি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থল যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত। এ যুদ্ধে চার মিলিয়ন সৈন্য, ১৩০০০ ট্যাংক এবং ১২০০০ যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করা হয়েছিল।

আগাম সতর্কবার্তায় সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল, রেড আর্মি তাদের প্রতিরক্ষা জোরদার করছে। তবুও জার্মানরা আক্রমন করলে হামলাটি অকৃতকার্য হয়। অপর প্রান্তের সোভিয়েত ট্যাঙ্ক ফোর্স জার্মান বাহিনীর প্রায় ২০০টি ট্যাংক ধ্বংস করে দেয় বলে দাবী করা হয়। স্থানীয় দল ক্যাসিসার স্ট্যালিনকে জানান যে তারা ৪০০ টিরও বেশি জার্মান ট্যাংককে ধ্বংস করে দিয়েছিল।

কুর্স্কের হামলাটিই জার্মানদের সর্বশেষ হামলার ঘটনা। ছবি : সংগৃহীত

এক মিলিয়নেরও বেশি সৈন্য, ৩২০০ ট্যাংক এবং সেলফ প্রপেলড বন্দুক এবং প্রায় ৪০০০ যুদ্ধ বিমান সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে যুদ্ধ করে জার্মানের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধটি ইতিহাসে “ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ট্যাংক যুদ্ধ” হিসেবে পরিচিত।

‘‘যে যুবক ভবিষ্যৎকে জয় করে, সে হয় একা’’-অ্যাডলফ হিটলার

সূত্র : লাইফস্টোরিজ



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top