পেত্রা নগরীর ইতিহাস


প্রকাশিত:
১৬ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৪২

আপডেট:
২৯ নভেম্বর ২০২১ ১১:০৮

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই লোহিত সাগর এবং মৃত সাগরের মধ্যে অবস্থিত এই সুপরিচিত নবাটাইন কাফেলা শহরটি আরব, মিশর এবং সিরিয়ার মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ চৌরাস্তার মতো ছিল। পেট্রা নগরী অনেকটাই অর্ধনির্মিত এবং অর্ধেক শিলার খোদাই করা। তাছাড়া এর প্যাসেজগুলি ও স্তম্ভগুলো পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট। যেখানে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহি হেলেনিস্টিক স্থাপত্যের সাথে অনেকটা মিল পাওয়া যায়।

পেত্রার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
গ্রীক নাম পেত্রা (“রক”) সম্ভবত বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত নাম সেলা থেকে এসেছে। পেটোলিথিক এবং নিওলিথিক সময়কালের কিছু অবশিষ্টাংশ যা পরবর্তীতে পেত্রায় আবিষ্কৃত হয়েছে। ইদোমাইট নামে একটি জাতি খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে এই অঞ্চলটি প্রথম দখল করে বলে জানা যায়।

এর কয়েক শতাব্দী পরে, নবাটাইন নামে একটি আরব উপজাতি এটি দখল করে এবং এখানে তাদের রাজ্যের রাজধানী গড়ে তোলে। খ্রিস্টপূর্ব ৩১২ সালে, এই অঞ্চলটি সেলুসিড বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, এবং সে সময় তারা শহর দখল করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

নবাটাইন শাসনের অধীনে, পেত্রা (petra) মশলা ব্যবসায়ের কেন্দ্র হিসাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল। এসময় চীন, মিশর, গ্রীস এবং ভারত এইরকম একটি রাজ্যের সাথে ব্যাবসায়িক দিক দিয়ে জড়িত ছিল। তখন এ শহরের জনসংখ্যা ১০,০০০ থেকে ৩০,০০০ এর মধ্যে উন্নীত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন।

১০৬ খ্রিস্টাব্দে যখন নবাটাইনরা রোমানদের কাছে পরাজিত হয়েছিল, তখন পেত্রা (petra) আরবে রোমান প্রদেশের অংশ হয়ে উঠেছিল এবং এর ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক রুট পরিবর্তনের ফলে নাবাটাইন বাণিজ্যর পতন ঘটে।

৫৫১ সালের ভূমিকম্পের পরে (পেত্রায় ভুমিকম্প এটাই প্রথম নয়) প্রাচীন এ শহরটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তখন থেকেই মূলত, উল্লেখযোগ্যভাবে এখানকার বিভিন্ন বাসস্থান বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে করা হয়। সপ্তম শতাব্দীতে এখানে ইসলামী আক্রমণ ঘটে এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে সেখানে যে একটি ক্রুসেডার ফাঁড়ি ছিল, এ আক্রমনের সময় এ বিষয়ে একটি কার্যকলাপের প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়।

ক্রুসেডের পরে এই শহরটি পশ্চিমা বিশ্বের কাছে একপ্রকার অজানা ছিল যতক্ষণ না ১৮১২ সালে সুইস ভ্রমণকারী জোহান লুডভিগ বার্কার্ড্ট এটি আবিষ্কার করেন।

জেরুজালেমের British School of Archaeology এর পক্ষে ১৯৫৮ সাল থেকে পেত্রা (petra) নগরীতে খনন কাজ শুরু করে এবং পরবর্তীকালে আমেরিকান সেন্টার অফ ওরিয়েন্টাল রিসার্চ (American Center of Oriental Research) পেট্রার প্রত্নতত্ত্ব উদ্ধারে ব্যাপকভাবে নিজেদের যুক্ত করেছিল।

ধ্বংসাবশেষ থেকে সাধারণত সিক (ওয়াদি আল-সাক) নামে পরিচিত সরু ঘাট, যা পূর্ব থেকে আগত একটি রাস্তাকে নির্দেশ করা হয়, সেটা খুঁজে পাওয়া যায়। সিক থেকে প্রথম দেখা সাইটের মধ্যে, খাজনা (“ট্রেজারি”) উল্লেখযোগ্য, এবং এটি আসলে একটি বিশাল সমাধি। আল-ডেয়ার (“মনাস্ট্রি”) পেট্রার অন্যতম বিখ্যাত রক-কাট (পাথর কেটে তৈরি) স্মৃতিস্তম্ভ।

এটি একটি অসম্পূর্ণ সমাধির সম্মুখভাগ যেটা বাইজেন্টাইন সময়ে গির্জা হিসাবে ব্যবহৃত হত। পেট্রার অনেক সমাধিতে অনেক বিস্তৃত মুখোমুখি জায়গা রয়েছে। এছাড়া কোরবানির হাই প্লেস নামে একটি নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়, যা বাইবেলের সময়কাল থেকে কাল্টিক বেদি পর্যন্ত একটি সু-সংরক্ষিত সাইট। প্রাচীন শহরের বিশাল জনগোষ্ঠীকে সার্বিক সহযোগিতার লক্ষে, এর বাসিন্দারা বাঁধ, জলাশয়, শিলা-খোদাই করা জলের চ্যানেল এবং সিরামিক পাইপ সহ একটি বিস্তৃত জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থা নির্মাণ করেছিল।

পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে শুরু হওয়া খননকার্যে আরও বেশ কয়েকটি মন্দির ও স্মৃতিসৌধ আবিষ্কৃত হয়েছে যা প্রাচীন শহরের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিষয়টিকে বিস্তারিত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। বর্তমানে ধ্বংসাবশেষগুলি বন্যা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, এবং এখানে প্রতিনিয়ত পর্যটকদের ভীর, স্মৃতিস্তম্ভকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে।

১৯৮৫ সালে পেত্রা (petra) নগরী ইউনেস্কোর একটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে মনোনীত হয়।

২০১৬ সালে, স্যাটেলাইট চিত্র থেকে এবং ড্রোন ব্যবহার করে একটি খুবই বৃহত, এবং পূর্বে আবিষ্কার হয়নি এমন একটি স্মৃতিসৌধের কাঠামো প্রত্নতাত্ত্বিকগণ আবিষ্কার করেছিলেন। ধারণা করা হয় যার সূচনাটি হয়েছিলো প্রায় ১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, যখন নবাতিয়ানরা তাদের তাদের জন সাধারণের জন্য ভবন নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করেছিল।

এটি নগরীর কেন্দ্রস্থল থেকে জাবাল আন-নিময়ের পাদদেশ এবং প্রায় ০.৫ মাইল (০.৮০ কিমি) দক্ষিণে শহরের প্রধান ক্ষেত্রের বাইরে অবস্থিত। তবে এটি শহরের দিকে নয়, পূর্ব দিকে মুখ করে অবস্থিত। কাঠামোটি একটি বিশাল, ১৮৪ বাই ১৬১ ফুট (৫৬ বাই ৪৯ মিটার) প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে গঠিত এবং এর পূর্ব দিকের সমস্ত অংশে একটি সত্যিকারের সিঁড়ি রয়েছে। বৃহত প্ল্যাটফর্মটি কিছুটা ছোট।

পেত্রার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এর ভৌগলিক গুরুত্ব বিবেচনায় পেত্রাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে মনে করা হয়। এ সকল বিষয় বিবেচনায়, ২০০৭ সালে পেত্রাকে নতুনভাবে নির্বাচিত পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য এর ১টি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top