হাফিংটন পোস্টে ইন্টারভিউ

হারুকি মুরাকামির অজানা অধ্যায়


প্রকাশিত:
২৩ মে ২০২১ ১৬:৪৭

আপডেট:
২০ জুন ২০২১ ১২:৩৬

হারুকিভক্ত মাত্রই জানেন, তিনি তার পাঠককে অদ্ভুত ও পরাবাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে চান। ‘ওয়ানকিউএইটিফোর’ কিংবা ‘হার্ড-বয়েল্ড ওন্ডারল্যান্ড অ্যান্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ গ্রন্থে আমরা এর প্রমাণ পাই। তবে তিনি যতই তার পাঠককে পরাবাস্তবতায় নিয়ে যেতে চান না কেন, বাস্তবতায় ঘটনার অস্তিত্ব ঠিকই খুঁজে পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হোক্কাইডো’র সাপ্পোরোয় ডলফিন হোটেল কিন্তু সত্যিই রয়েছে। মজার বিষয়, ‘আ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ গ্রন্থে হারুকি যখন এমন একটি হোটেলের বর্ণনা দিলেন, তখন তিনি মোটেও এ বিষয়ে কিছু জানতেন না।

একইভাবে ‘ওয়ানকিউএইটিফোর’ প্রকাশ হওয়ার পর একটি পরিবার মুরাকামিকে চিঠি লিখে দাবি করে, তাদের অ্যাওমামে নামের একজন সদস্য রয়েছেন, যিনি বিশ্বাস করেন, তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেছেন! প্রসঙ্গত, হারুকির ওই গ্রন্থে একই নামে একটি চরিত্র ছিল, যে বিশ্বাস করে, নিজেকে সে আবিষ্কার করেছে।

মুরাকামির গল্পে বেড়ালের সন্ধান মেলেই। ‘ওয়ানকিউএইটিফোর’ থেকে শুরু করে ‘কাফকা অন দ্য শোর’ পর্যন্ত প্রায় সব গ্রন্থেই বেড়ালকে নিয়ে এসেছেন তিনি। ১৯৮৯ সালে এক রচনায় মুরাকামি দাবি করেন, জীবন চলার পথে দশটিরও বেশি বেড়াল তাকে সঙ্গ দিয়েছে। এমনকি ১৯৭৪ সালের পর থেকে অদ্যাবধি তার বাড়িতে অন্তত একটি বেড়াল তো বাস করছেই।

একই রচনায় তিনি আরো দাবি করেন, জাপানি ঔপন্যাসিক রিউ মুরাকামি (যার কাজ হারুকির চেয়েও বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং সহিংস বলে পরিচিত) কিরিন নামে একটি বেড়াল উপহার দিয়েছিলেন তাকে।

নিউইয়র্ক টাইমসকে একবার সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় সমালোচক ও সাহিত্যিক স্যাম অ্যান্ডারসন হঠাৎ হারুকি মুরাকামিকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, প্রথম যে রেকর্ডটি তিনি কিনেছিলেন, তা মনে করতে পারবেন কি না।

মুরাকামি তার রেকর্ডের বিশাল সংগ্রহের দিকে একবার তাকিয়ে জবাব দিলেন, জেন পিটনি।


তিনি জানালেন, ১৩ বছর বয়সে জাপানের কোবে থেকে রেকর্ডটি কিনেছিলেন। এরপর এতবার বাজিয়েছেন যে, পরবর্তী সময়ে আবারও তাকে রেকর্ডটি কিনতে হয়।

হারুকি মুরাকামি টোকিও’র ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বহু ঘটনা তিনি তার বইয়ে বর্ণনা করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার চলচ্চিত্রে আসক্তির বিষয়টি মুরাকামিভক্তদের অজানা থাকতে পারে। সিনেমা দেখায় তিনি এতটাই আসক্ত ছিলেন যে, কোনো কোনো বছর দুইশ’ ছবি দেখারও রেকর্ড করে বসতেন। তার প্রিয় পরিচালক ফিনিশ আকি কওরিসমাকি।

লেখক জীবনের শুরুর দিকে মুরাকামি বহু বই জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এগুলোর মধ্যে রেমন্ড কার্ভারের সারা জীবনের কাজ, ট্রুম্যান ক্যাপোটের একাধিক বই এবং জে.ডি স্যালিঙ্গারের দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই উল্লেখযোগ্য।

তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মুরাকামি মনে করেন এফ. স্কট ফিৎজারেল্ডের ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবাই’। তিনি এই উপন্যাসকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেও বর্ণনা করেছিলেন একবার।

যে ব্যক্তিই মুরাকামির লেখা পড়েছেন, তিনিই বুঝতে পেরেছেন, সঙ্গীতের প্রতি তার কতটা আসক্তি। সঙ্গীতই যেন তার লেখার শ্বাস। একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ঠিক কতটা রেকর্ড তার সংগ্রহে রয়েছে?তিনি ধারণা করে জবাব দিলেন, দশ হাজারের মতো হবে। সেই সঙ্গে এও জানিয়ে দিলেন, তাকে যেন গুনে জানানোর অনুরোধ করা না হয়!

নিজের লেখার মতো কোনো স্বপ্ন কখনো দেখেছিলেন কি না, একবার জানতে চাওয়া হলো হারুকি মুরাকামির কাছে। জবাবে তিনি জানালেন, কোনো স্বপ্নই তিনি মনে করতে পারেন না। তবে একবার তিনি দুঃস্বপ্নে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কয়েক বছর এ রোগ তাকে তাড়া করে। একই স্বপ্ন বারবার দেখতেন।

স্বপ্নে তিনি দেখতেন, বিশাল আকৃতির এক লোক তাকে সাপের মাংস দিয়ে টেমপুরা, শুঁয়োপোকা এবং ভাত রেঁধে দিচ্ছেন, যার মধ্যে ছোট ছোট পাণ্ডা চরে বেড়াচ্ছে। স্বপ্নের সবচেয়ে খারাপ অংশটা হলো, মুরাকামি এ খাবার খেতে না চাইলেও তার মনে হতো, তাকে সেগুলো খেতে হবে। সৌভাগ্যবশত খাবার মুখে দেওয়ার আগেই তিনি জেগে উঠতেন।

লেখা শুরুর পর এ পর্যন্ত মুরাকামির বেশ অনেকগুলো বই (যার মধ্যে অনেকগুলো ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা থেকে অনুবাদ গ্রন্থও রয়েছে) প্রকাশ হয়েছে। এটা সত্যি যে, মুরাকামির মস্তিষ্ক যথেষ্ট উর্বর। তারপরও তিনি কঠিন নিয়মানুবর্তিতায় জীবন পরিচালনা করেন।

মুরাকামি নিজেই বিষয়টি জানিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন রাত নয়টায় তিনি ঘুমাতে যান (যা কখনো কখনো সামাজিকতা রক্ষা কঠিন করে তোলে) এবং কোনো অ্যালার্ম ছাড়াই ভোর চারটায় জেগে ওঠেন। এরপর টানা পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা তিনি লিখেন।

শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য রক্ষাও জরুরি বলে মনে করেন মুরাকামি। খাবার-দাবারে যথেষ্ট নিয়মের মধ্যে দিয়ে চলেন। সেই সঙ্গে মাঝে মধ্যেই লেখা শেষে সাঁতার কাটতে কিংবা দৌড়োতে বেরিয়ে পড়েন তিনি।

একবার মুরাকামির কাছে জানতে চাওয়া হলো, তার গল্প নিয়ে কেউ যদি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চান, তাহলে কোন পরিচালককে তিনি পছন্দ করবেন? তিনি জবাব দিলেন, এরাসেরহেড ও মুলহল্যান্ড ড্রাইভ ছবির পরিচালক ডেভিড লিঞ্চ বা অ্যানি হল ও মিডনাইট ইন প্যারিস ছবির পরিচালক উডি অ্যালেনকে তিনি পছন্দ করবেন। মুরাকামির ধারণা, এরাই তার কাজ সামলাতে পারবেন।

একটি লেখা প্রকাশের প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য। অনেকক্ষেত্রেই নতুন করে খসড়া তৈরি ও ব্যাপক সম্পাদনার প্রয়োজন পড়ে। সম্পাদনার ক্ষেত্রে শুধু লাইনগুলোকেই সাজাতে হয় না, শব্দগুলোকেও সাজাতে হয়। লেখার সূচনা পর্ব থেকে প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে একবার মুরাকামি ভিডিও গেমস প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, কখনো কখনো লেখার সময় আমার মনে হয়, আমি কোনো ভিডিও গেম ডিজাইন করছি। সেই সঙ্গে নিজেকেও একজন খেলোয়াড় মনে হয়। আমি প্রোগ্রামটা তৈরি করেছি এবং এখন আমি এর ভেতরে। বাম হাত জানে না, ডান হাত কী করছে। এটা এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা। বিভক্তির এক অনুভূতি।

প্রসঙ্গত, ভিডিও গেম ‘মেমোরেন্ডা’ মুরাকামির গল্প অবলম্বনেই তৈরি হয়েছিল।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top