এই অঞ্চলের তরুণরা তাদের সময়ে বাস করে না: ফরহাদ মজহার


প্রকাশিত:
১ নভেম্বর ২০২১ ১৬:৪১

আপডেট:
২৯ নভেম্বর ২০২১ ১২:২৬

ফরহাদ মজহার

কবি, কলামিস্ট, লেখক, গবেষক, ওষুধশাস্ত্রবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, দার্শনিক, সমাজসংস্কারক, মানবাধিকার কর্মী এবং পরিবেশবাদী হিসেবে নিজের চিন্তা, প্রজ্ঞা এবং কর্মের দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়েই ফরহাদ মজহার হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি। গত কয়েক দশকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর সরব উপস্থিতির কথা তিনি নিজেই বলে থাকেন। বিপ্লব তাঁর চেতনা ও মজ্জায় মিশে আছে, যে কোন ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার বিপরীতে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বৈপ্লবিক রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেন তিনি। বহুমাত্রিক গুণে গুণান্বিত ফরহাদ মজহার তাঁর শৈশব, কৈশোর, প্রেম, কবিতা, সংগীত, রাজনীতি সমাজনীতিসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর বিশেষ এই সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন সিফাত বিনতে ওয়াহিদ।

প্রশ্ন: আপনার ছেলেবেলা তো কেটেছে অবিভক্ত ভারতের নোয়াখালিতে...মানে আপনার জন্ম তো সেখানেই

আমার জন্ম ৯ আগস্ট,১৯৪৭। মানে, সে হিসাবে বলতে পারেন, ইংরেজের সঙ্গে দেনদরবার করে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার একদম শুরুর দিকে, ৫ দিন আগে। হ্যাঁ, নোয়াখালিতেই আমার জন্ম।

আজকের পত্রিকা: আপনার ছেলেবেলা সম্পর্কে একটু জানতে চাই। ছেলেবেলার কোনো স্মৃতি কি আপনাকে তাড়িত করে? এ রকম কোনো স্মৃতি...

ছোটবেলার একটা মেমোরি আমাকে খুব প্রভাবিত করে- মেঘনা নদী নোয়াখালি শহর ভেঙে ফেলছে, তখনকার গল্প। মায়ের মুখেই এই গল্প শোনা। শহর ভাঙছে, আর আমার মা আমাকে বুকে নিয়ে চলে আসছেন এখনকার শহরের দিকে। এই গল্পের স্মৃতি, মায়ের মুখে শোনা গল্প হলেও, খুব আছে আমার মনের মধ্যে। খুব ভালোভাবে আছে। তাতে, বলতে পারেন, আমি ঘরভাঙা মানুষ আর কী!

তাড়া? তাড়না? অনেক স্মৃতি আছে। নির্ভর করছে কোন পরিপ্রেক্ষিতে বলব? অনেক স্মৃতিই তো তাড়না করে। যেমন, এই নদী ভাঙার স্মৃতি। নদি ভাঙা শহর নদীতে বিসর্জন দিয়ে আম্মা আমাকে নিয়ে নতুন শহরে ওঠলেন। শহর তো না, যেখানে বড় হয়েছি তখনো শহর গড়ে ওঠেনি। যেটাকে আমরা মাইজদি কোর্ট বলি, সেখানে সরকারি অফিসগুলো স্থানান্তরের জন্য বড় একটা দীঘি খনন করা হয়। চাষের জমি চতুর্দিকে। তারই প্রান্তে যেখানে আমাদের নতুন বসত হয় সেটা একটা গ্রাম। আমার একটা কবিতার মধ্যে এই গ্রাম আছে। গ্রামটার নাম হলো লক্ষ্মীনারায়ণপুর। লক্ষ্মী এবং নারায়ণ একসঙ্গে যেখানে অধিষ্ঠিত ছিলেন, সেই গ্রাম। অনেক তাৎপর্যপূর্ণ গ্রাম। কিন্তু মুসলিম প্রধান গ্রাম, হিন্দু প্রধান গ্রাম না কিন্তু ওটা। কারণ ছিলো। জমিদাররা হিন্দু ছিলেন, হয়তো তারাই নাম দিয়েছেন। এর আগে ওখানে নাথপন্থীরা ছিলো; এরা এলাকাতেও ‘যোগী’ নামে পরিচিত ছিল। এটা আমার নিজের আবিষ্কার। নতুন শহর থেকে দূরে খালের দিকে ওদের বসত, ওখানে আমার যোগাযোগ ছিল। বাই দিস টাইম ওরা লুপ্ত আমাদের এলাকা থেকে... মানে নোয়াখালি অঞ্চল থেকে প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে স্মৃতির মধ্যে সেই যে একটা আচ্ছন্নতা সেটা আমার রয়ে গিয়েছে।

কৃষিজমির প্রান্তে তোলা আমাদের ঘর থেকে বাইরে দাঁড়ালেই আপনি দেখছেন সামনে বিশাল সরোবরের মতো দীঘি, যার মাটি তুলে পুরো শহরটা উঁচু করা হয়েছে। স্মৃতির মধ্যে সেই দীঘি নিত্য টলমল করে। সরকারি অফিসগুলো তার চতুর্দিকে গোল হয়ে আছে। ফলে, ছেলেবেলায় ওখানে যাচ্ছি, চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এইসব প্রবল ভাবে মনে আছে। দীঘির পাড়গুলোতে বকুল গাছ ছিল। বকুল ফুলের গন্ধ ঝরছে। আর রাতের বেলা গ্রামের মেয়েরা, বিশেষ করে ফকফকে জ্যোৎস্নায়, কোন কোন সময় দল বেঁধে যাচ্ছে গোসল করতে, এগুলো প্রচুর মনে আছে।

ছেলেবেলা খুবই ভালো কেটেছে। কিন্তু চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি যে একটা গ্রাম কী করে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। যেখানে আমাদের বাড়ি, তার পেছনেই একটা বন ছিল। ফলে আমরা ছেলেরা খেলতে খেলতে বনে চলে যেতাম। বনে তখন শিয়াল, বাঘ ছিলো না বোধহয়, তবে সাপ, জোঁক সবই ছিলো। ফলে বনটা বেশ গহীন বন ছিলো। সেই বনের মধ্যে দিয়ে আবার রেললাইন গেছে। ফলে এগুলো আমাদের খেলবার দিক থেকে, মানে বাচ্চারা আমরা যারা খেলতাম, তাদের জন্যে খুবই মজার একটা জায়গা ছিলো। থমথমে সবুজ। দারুন। সেইসব এখন আর নাই।

আমার বন্ধুবান্ধব ছিলো প্রচুর। আরেকটা বড় স্মৃতির মধ্যে আছে ঘুড়ি। আমি খুব ঘুড়ি উড়াতাম। নোয়াখালিতে ঘুড়ি ওড়ানোর খ্যাতি ছিল আমার, খুব বিখ্যাত ছিলাম সুতায় মাঞ্জা দেওয়ার জন্য। সুতাকে ধার করার জন্য মাঞ্জা দিতে হয়। আমি সাংঘাতিক মাঞ্জা দিতে পারতাম। তখন এখনকার মতো প্রাণ ও প্রকৃতির সর্বনাশ ঘটে নি, আকাশে প্রচুর চিল ছিলো। তখন একদিন সুতা দিয়ে আমি চিল ফেলে দিয়েছিলাম মাঞ্জা দেওয়া সুতা দিয়ে উড়ন্ত অবস্থায় ডানা কেটে। এটা আমাকে খুব ডিপলি ইফেক্ট করে। একটা চিলকে আমি সুতা দিয়ে কেটে ফেলে দিয়েছি, চিলটা উড়তে পারছে না, অসহায় ভাবে মাটিতে পড়ে আছে। এটা দীর্ঘদিন মানসিকভাবে আমাকে বেশ কষ্ট দিয়েছিল।

প্রশ্ন: বয়স কেমন ছিল তখন আপনার?

তখন আমার বয়স কত হবে- ১৩/১৪। কলেজে যাইনি তখনো। এ ঘটনায় আমার মা আমার সাথে খুব রাগ করেছিলেন।

প্রশ্ন: এই চিলের গল্প কি আপনার কোনো কবিতায় এসেছিলো?

ওভাবে আসেনি। এটা খুব ফ্রয়েডিয়ান ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু এটা খুবই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা আমার জন্যে, আমি ভুলে যাবার চেষ্টা করতাম যে আকাশের রাজাধিরাজ তুচ্ছ বালকের মাঞ্জা দেওয়া সুতায় ডানা কেটে মাটিতে পড়ে আছে। আর উড়তে পারছে না, উড়তে পারবে না। এই কষ্ট ভুলে যেতে চাইতাম। আপনি জানেন যে, ফ্রয়েডিয়ান এই ব্যাপার খুব পেইনফুল। এটা। এই স্মৃতি আপনাকে সাপ্রেস করে রাখতে বাধ্য করে।

পরবর্তীকালে আমার নয়াকৃষি করা, প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা, পাখপাখালি গরু ছাগল প্রীতি ইত্যাদি হয়তো এসেছে এক ধরনের গিল্ট সেন্স থেকে, তো যদি আপনি ফ্রয়েডের অ্যানালিটিকাল জায়গায় যেতে চান তাহলে বিস্তর কথা বলা যায়। এখনো একটা স্পষ্ট ছবির মতো মনে আছে- একটা চিল, গলাটা সাদা, উপরে উড়ছিল। চিলটাকে আমি কেটেছিলাম ঠিকই, কিন্তু বিস্ময়কর যে, কোনো বিজয়ী বোধ আমার ছিল না। এটা ডেফিনেটলি, এই বেদনা সাপ্রেস করে রাখার পরিণতি, পরবর্তীকালে আমার স্বভাব-চিন্তায় বড় একটা ভূমিকা ফেলেছিল।

প্রশ্ন: তারপর আপনার লেখাপড়া শুরু করলেন কোথা থেকে?

আমি একদমই গ্রামের ছেলে। একশো ভাগ। আমি নোয়াখালি জিলা স্কুল থেকে পাস করেছি। পাস করে চৌমুহনী কলেজে পড়েছি। চৌমুহনী কলেজ ছিলো আমাদের ওখান থেকে ৭ মাইল দূরে। আমরা ভোরবেলার ট্রেনে যেতাম। অনেকটা সময় আমরা হেঁটেও যেতাম। কিন্তু চৌমুহনী রেল স্টেশনে নেমে সেখান থেকে আরও এক মাইল হাঁটতে হতো। বৃষ্টি হলে থক থকে কাদার মধ্যে। পাকা রাস্তাও ছিলো না। তারপর আমি শহরে এসেছি। মানে ঢাকাতে ইউনিভার্সিটি ভর্তি হয়েছি।

প্রশ্ন: প্রথমে যখন ঢাকায় আসছেন সেই স্মৃতিটা কেমন ছিলো আপনার?

ঢাকায় আমি এর আগেও এসেছিলাম। মানে নিজে পড়ার জন্যে আসার আগেও আমার বোনরা পড়তেন ঢাকায়। ফলে তাদের আনতে আমাকে আসতে হতো ঢাকায়। তাই ঢাকা সম্পর্কে ধারণা আমার ছিল। কিন্তু ঢাকাতে যখন এসেছি তখন তো সেটা ঘোড়াগাড়ির ঢাকা, তখনকার ফুলবাড়িয়া ইস্টিশন..., সেগুলা মনে আছে...ঘোড়ার ছাপ, চিৎকার, আস্তাবলের ময়লা - এগুলো খুব ভালো মনে আছে। মানে পুরানা ফুলবাড়িয়া ইস্টিশন খুবই ভালো মনে আছে আমার।

ঢাকাতে সেই সময় তো গলিতে গলিতে আসতো ফেরিওয়ালা, সিঙ্গারা নিয়ে আসতো কী? হ্যাঁ, সিঙ্গারা ভাজাপোড়া ছিল। মিষ্টি ও বড় বড় মাখন নিয়ে আসতো। শাকশব্জি ফলমূল গৃহিনীদের কাঁচাবাজারের নানান জিনিস থাকতো। ফেরিওয়ালাদের ওই ডাকগুলো আমার কানে বাজে।

প্রশ্ন: তখন গাড়ি টানা ঘোড়াগুলোর অবস্থা কি এমন করুণ ছিলো?

না করুণ ছিলো না। কিন্তু সবগুলার অবস্থা ভালো ছিল না, বাট করুণ ছিলো না। সেই ঢাকার সৌন্দর্য ছিল। আমি যখন ১৩/১৪ বছর বয়সে, ভালোই স্মৃতিটা মনে আছে আমার। রমনা তো তখন খুবই সুন্দর ছিলো। কৃষ্ণচূড়া, শিমুল ইত্যাদি গাছে ভর্তি ছিল রমনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখন যিনি ভিসি ছিলেন, তিনি ছিলেন আমার আত্মীয়। ফলে মাঝে মাঝে রমনা হয়ে ওখানে যেতাম। ভারী সুন্দর ছিল। রমনা পার্ক তো তখন ছিল না,তখন একদম খোলা রাস্তা দিয়ে আমরা খালি পায়ে হেঁটে যেতাম।

প্রশ্ন: আপনি বোনদের আনার জন্যে ঢাকায় আসতেন। লেখাপড়ার জন্যে তো এর আগে ঢাকায় আসেননি। পরিবর্তনটা কেমন ছিলো আপনার। আপনি যে গ্রামে ছিলেন, গ্রামের স্কুল, কলেজে পড়েছেন, তারপর ঢাকায় এসে পড়া... মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টা কী রকম ছিলো?

একদিকে ছিলো শকিং স্বভাবতই। পরিবারের কেউ কেউ এখানে ছিলো। তাই মানিয়ে নেয়াটা সহজ ছিলো। মফস্বলে ভাইবোনরা একসঙ্গে থাকতে পছন্দ করতাম। ফলে সবাইকে মিস করতাম খুব। ছুটিতে চলে যেতাম ধুমধাম করে। তবে ঢাকায় খুব দ্রুতই বন্ধু বানিয়ে নিলাম। আমি আসছি সম্ভবত ৬৪ সালের দিকে। ঢাকা হলে থাকতাম। তো ঢাকা হলে যখন থাকতাম তখন মানিয়ে নিয়েছিলাম। টান ছিলো গ্রামের দিকে, আবার শহরের প্রতি বিস্ময়ও ছিলো। কারণ আপনি সিনেমা দেখতে পারছেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারছেন, নতুন একটা জগৎ তৈরি হচ্ছে। এই জগৎ নিয়েই আমার সাহিত্য জগৎটা ভালোভাবে তৈরি হয়। আগেও লিখেছি। লেখা পড়েছি। কিন্তু সেখানে বন্ধুরা যারা ছিলো যেমন রফিক আজাদ থেকে শুরু করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান... তো আড্ডাটা তখন খুব দ্রুতবেগে জমে ওঠে। এসবের মধ্যেই আমি অতিশয় ঢাকাইয়া নাগরিক হয়ে ওঠলাম আর কী! দ্রুত। ঢাকায় রাতের বেলা চষে বেড়াচ্ছি।

প্রশ্ন: তো আপনার সাহিত্য জীবন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই শুরু হয়েছে। জানতে চাচ্ছিলাম, কবিতা কখন অনুভব করলেন প্রথমবার?

কবিতা আমি অনেক আগেই লেখা শুরু করি। লেখার একটা বড় কারণ ছিলো, ধরুন, নোয়াখালিতে আমরা যখন বড় হই তখন থেকেই। আমার মায়ের একটা বিরাট গুণ ছিলো। এ রকম যে জায়নামাজে বসে কোলে নিয়ে উনি আমাকে ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’ কবিতা মুখস্ত করিয়েছেন। তো আমি নোয়াখালির মতো একটা জায়গায় কর্ণকুন্তী সংবাদের মতো একটা কবিতা আবৃত্তি করতে পারতাম খুব ভালোভাবে। কবিতা তখনই রক্তে মিশে গিয়েছিলো। আমার মা শিক্ষিকা ছিলেন। ফলে তার শিক্ষিকা মহলে, তার স্কুলের মধ্যে, প্রায় গ্রামীণ কিন্তু ছোট্ট শহরটার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, আমি অতএব খুবই দৃষ্টিগ্রাহ্য একটা বাচ্চায় পরিণত হই। আমি তখন আবৃত্তি করেছি, অনেক পুরস্কার পেয়েছি। আমার বড় ভাই, ফারুক মোজাম্মেল হক, আমার দাদা, খুবই গুণী মানুষ ছিলেন। তিনিও ভালো আবৃত্তি করতেন। আর আমি নোয়াখালি যখন থাকি তখন আমার কবিতা লেখার ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেটা হোল আমার বাল্যকালীন পারিবারিক পরিবেশ।

ব্যাপারটা হলো এই যে আমার বড় ভাই খুবই কবিতা পছন্দ করতেন। আমি তখন আধুনিক কবিতা সম্পর্কে কিছু জানি না। তিনি দুটো বই আমার জন্যে এনে দিয়েছিলেন। একটা হলো ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’। বইটা আমি হারিয়ে ফেলেছি, হারিয়ে পরে খুবই কান্নাকাটি করেছি। আর বিষ্ণু দে’র কবিতা। প্রায় মুখস্ত ছিলো দু জনের অধিকাংশ কবিতাই। তখন থেকেই আমি কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম। আধুনিক কবিতা। তখনই যে আধুনিক কবিতার ভেতর প্রবেশ করেছি তা না। কিন্তু কর্ণকুন্তী সংবাদ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আধুনিক কবিদের কবিতা আবৃত্তি করতাম, কীর্তন শুনতাম প্রচুর।

আমি প্রথম কবিতা লিখি রাধা কৃষ্ণ নিয়ে। ছাপা হয়েছিলো ফেনির মতো মফস্বলের একটা পত্রিকায়। প্রথম যখন ছাপা হলো, আমি তো থতমত খেয়ে গেছি নিজের নাম দেখে। ফলে কবিতা, সাহিত্য ইত্যাদি অনেকটা আমার স্বভাবের মধ্যেই বাসা বেঁধেছিল। আর কিছুটা আমার মায়ের প্রভাবে ভেতরে প্রবেশ করেছিলো। তিনি সাহিত্যের খুবই অনুরাগী মানুষ ছিলেন।

প্রশ্ন: প্রথম কবিতাটি কি মনে আছে?

কিচ্ছু মনে নাই। শুধু মনে আছে বিষয় রাধা কৃষ্ণের প্রেম। প্রেম কী তখনো সেটা বোঝার জন্য উপযুক্ত হই নাই, কিন্তু সেটা নিয়ে ভাবতে খুব ভালো লাগছিলো। কিন্তু কবিতাটা ছাপা হয়েছিলো, স্থানীয় পত্রিকায়, সেটাই ছিল আমার জন্য সেই বয়সে খুব বিস্ময়ের। নোয়াখালি থেকে লিখে পাঠানো যে কবিতা ঢাকায় প্রকাশিত হয়েছে সেটা হচ্ছে নাজিম হিকমতের কবিতার অনুবাদ। এটা ছাপিয়েছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত। তিনি কবিতা পেয়ে খুব অবাক হয়েছিলেন। তিনি আমার ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন। কিন্তু আমি যে পাঠিয়েছি সেটা আমার ভাইকে বলিনি। আমি পাঠিয়েছি ছাপলে ছাপবেন, না ছাপলে না ছাপবেন। কিন্তু উনি ছেপে দিয়েছেন। অনেক বড় কবিতা ছিলো সেটা। নাজিম হিকমতের কবিতাটা ছাপার পরে রণেশদা জানতে পারলেন আমি ফারুক মোজ্জামেল হকের ভাই। পরে আর তিনি অবাক হন নাই। ইংরেজি অনুবাদে নাজিম হিকমতের সহজ কবিতাগুলো পড়ে, আমি তখন ইংরেজি শিখছি।

আরেকটা বড় ঘটনা ছিলো ছেলেবেলার মধ্যে যেটা আমার জীবনে খুব প্রভাবিত করেছিলো, তখন এশিয়া ফাউন্ডেশন বা মার্কিন কোন সংস্থা থেকে অনেক বই যেতো আমাদের কলেজে, আমরা প্রায়ই লাইব্রেরিতে যেতাম। লাইব্রেরিয়ান আমাদের খুব পছন্দ করতন। কোনো ভালো বই এলে বলতেন, এই বই আসছে দেখে যা। আমরা লাইব্রেরিতে গিয়ে বসতাম। তো একদিন গিয়ে দেখি যে রাসেল আর হোয়াইটহেডের একটা বই এসেছে। বইটা ছিলো সিম্বোলিক লজিকের ওপর, ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’। তখন আমি কলেজে পড়ি। সিম্বোলিক লজিক কী কিচ্ছু জানি না। তখন রাসেল সম্পর্কে শুনছি কেবল। রাসেল শান্তি নিয়ে কথাবার্তা বলেন, দার্শনিক বলে শুনেছি। পরে মোটা মোটা বই নিয়ে এসেছি বাসায়। তার গদ্যটা খুব সহজ ছিলো। গদ্যটা সহজ থাকার কারণে পুরো বই পড়ে ফেলেছি। সেই বয়সে। কিছু বুঝেছি কিম্বা কিছুই হয়তো বুঝি নাই। কিন্তু ভাষার অন্তর্গত যুক্তি ও ব্যাকরণের শক্তি আমাকে স্তম্ভিত করেছিলো। ভাষাকে যুক্তিবাক্য হিশাবে ব্যবহার এবং যুক্তিবাক্যকে সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে লিখে গণিতের তর্কে প্রবেশ করা যায় দেখে রীতিমতো থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। গণিতের ফিলোজফিক্যাল ফাউন্ডেশনের ব্যাপারে সেই বয়সে আবছা হলেও দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে।

তবে প্রতীকী লজিক এবং গণিতের ভিত্তি নিয়ে আলোচনা যে এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, সেটা আমি বুঝেছি অনেক পরে- যখন বিদেশে পড়তে গেছি। বাংলাদেশে কিন্তু কেউ আমাকে বলে নাই, রাসেল-হোয়াইটহেডের কাজ এত গুরুত্বপূর্ণ। গণিতের ফিলোজফিকাল ফাউন্ডেশন সম্পর্কে এটা ছিল প্রাথমিক অ আ ক খ। অর্থাৎ দর্শনে আমার বিস্ময় ও আগ্রহের শুরু এখান থেকে। আমি যখন বিদেশে পড়তে যাই, তখন এই বইটা আমার সাংঘাতিক কাজে লাগে। এইটা আবার আমার ফিলোজফার হিসেবে, আমার দার্শনিক যে জীবন, সে জীবনে এই বইটা খুব বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে প্রভাবটা ফেলে নিঃসন্দেহে আমার মা।

রাধা কৃষ্ণের প্রেমের কথা বলছিলেন, নারী এবং পুরুষের প্রতি যে একটা প্রেম, সেটা আপনার জীবনে প্রথম কবে আসলো? সেটা কি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পরে এসেছে?

না, বয়ঃসন্ধির যে নির্দোষ প্রেম সেটা তো হয়। কিন্তু সেটা খুব একটা যে মনে আছে, তা তো নয়। আর খুব মনে আছে আমার এক বোন ছিল গ্রামে। এটাকে প্রেম বলা যায় না। খুব সুন্দর ছিল দেখতে। খুব মধুর ছিল। তাকে আমার ভালো লাগতো। আমার থেকে বয়সে ছিলো বড়। কেন এটাকে আমি উল্লেখ করছি? উল্লেখ করার কারণটা হলো, ও যখন গ্রাম থেকে বিয়ে হয়ে চলে যায় আমি খুব মিস করতাম।

আর একটা প্রেম(?) ছিল ছোটবেলায়। আমি যেহেতু কর্ণকুন্তী সংবাদ ও রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বিভিন্ন কবিতা মুখস্থ বলতে পারতাম, বৈষ্ণব পদাবলী জানি, মহাভারতের গল্প আমার জানা ছিল, ছোট মফস্বল শহরে আমার একটা খ্যাতি তৈরি হয়েছিল। আমাদের আগে ওখানে, ৬৫’ এর আগে, হিন্দু সমাজের একটা বড় অংশ বাস করতেন। উকিল, মোক্তার, শিক্ষক -- এডুকেটেড ক্লাসের অনেকেই বাস করতেন। আমার টিচার মায়ের সুবাদে তাদের সঙ্গে আমার খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। তাদের মেয়েদের তিনি শিক্ষক ছিলেন। আমি সেখানে, হিন্দু প্রধান পাড়ায়, খুব যাতায়াত করতাম। সেখানে আমি মিস করি যাকে, আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়, আমি প্রেমের অর্থে বলছি না, কিন্তু তাকে আমি খুব মিস করি। ওনার নাম ছিলো ধরুন, মমতা। আসল নামটি এখন আর বলছি না। মমতা ওখানে গিয়ে আমাকে কোলে নিয়ে সমস্ত হিন্দু পাড়ায় কর্ণকুন্তী সংবাদ শোনাতো সবাইকে। আমি ছিলাম ওদের জন্যে দৃশ্যগ্রাহ্য বিস্ময়কর ব্যাপার। একটা মুসলমানের ছেলে কর্ণকুন্তী সংবাদ মুখস্ত বলে! এটা অবিশ্বাস্য ছিল ওদের জন্য। আর ওই পাড়াতে সাধারণ মুসলমানরা খুব প্রবেশ করতো না। দুই পক্ষই খুব রক্ষণশীল ছিল।

তো একবার আমি ওখানে একজনের রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিলাম। এটা নিয়ে পুরো পাড়ায় একটা হুলস্থুল অবস্থা ঘটে গেল। এই ঘটনা যখন আমি আমার মাকে বললাম, তিনি আমাকে খুবই বকাঝকা করলেন, মমতাও খুব কান্নাকাটি করলো। পরে মাকে বললাম, এতে কী হয়েছে? মা বুঝিয়ে বললেন, হিন্দুদের রান্নাঘরে মুসলমানদের প্রবেশ নিষেধ। এতে খুব অবাক হয়েছিলাম। পরে ৬৫’ সালের পরে মমতারা ভারতে চলে যান।

প্রশ্ন: পৃথিবীতে কবিতাকে অনেকেই অনেকভাবে ব্যাখ্যা করে। ফরহাদ মজহারের কাছে কবিতা কী আসলে? আপনি কবিতাকে কীভাবে দেখেন?

কবিতার তো ব্যাখ্যার দরকার নাই। ব্যাখ্যা করলে তো গদ্যই লেখা যায়। প্রথমত কবিতা হচ্ছে একটা প্রথাগত ভাষাকে ভাঙা। ষাট ও সত্তর দশকে আমাদের স্লোগান ছিল - ‘প্রথম বিপ্লবের খুন বের হবে ভাষা থেকে’। মানে প্রথাগত ভাষাকে যখন আপনি ভাঙেন তখন নতুন অর্থের সম্ভাবনা, নতুন চিন্তার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে কবিতার প্রথম কাজটা কিন্তু ডিনাই দ্য ল্যাংগুয়েজ। প্রচলিত ভাষাকে অস্বীকার করা। আপনি যে ভাষায় কথা বলেন, আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি একে অস্বীকার করা। অস্বীকার করার মধ্যে দিয়েই কবিতা কবিতা হয়ে ওঠে। নতুন ভাষা ও ভাবের সম্ভাবনা তৈরি করে।

কিন্তু কবিতার যে ট্র্যাজেডি সেটা হলো কবিতা ভাষাকে ব্যবহার করে তার কাঁচামাল হিসেবে, ভাষা দিয়েই কবিতা লিখতে হয়, ভাষা ছাড়া কবিতা নাই, অথচ কবিতা ভাষাকে গুরুত্ব দেয় না, দুর্বোধ্য হবার ঝুঁকি নিয়ে ভাষাকে স্রেফ উপাদান হিশাবে ব্যবহার করে, নতুন ভাষা তৈরির চেষ্টা করে। ফলে এই কনট্রাডিকশনের মধ্যেই কবিতা তৈরি হয়। এই হচ্ছে আমার দিক থেকে কবিতা চর্চার একটা ধারণা।

দ্বিতীয়ত, কবিতার একটা স্পিরিচুয়াল মানে আছে। কবিতা চেষ্টা করে, টু গো বিয়ন্ড দ্য ল্যাংগুয়েজ। মানে ভাষার আগের যেই অবস্থা, আগের যেই জগৎ যার সঙ্গে কবির একটা ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ সংবেদনা বা অভিজ্ঞতা ছিলো। সেই ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ বিশুদ্ধ, কিন্তু বিশেষ অভিজ্ঞতাটা ধরতে চেষ্টা করে কবিতা। অথচ সেই বিশেষ সময়ই অধরাই থেকে যায়। কবিকে তাই সংবেদনশীল না হলে চলে না। আপনি কী করে সেই ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ বিশুদ্ধ কিন্তু বিশেষ অভিজ্ঞতার কাছে যাবেন এই আকুতিটুকু প্রত্যেকটা কবির মধ্যে থাকে এবং বলাবাহুল্য, প্রত্যেকটা নবীর মধ্যেও থাকে।

প্রশ্ন: আপনার কাছে কি কবি সত্তা আর ব্যক্তি সত্তা অভিন্ন মনে হয়?

না। আমার কিছুই মনে হয় না। লেখক সত্তা, কবি সত্তা, ব্যক্তি সত্তা...আমি আমার প্রতিষ্ঠানে যখন কাজ করি, কৃষি কাজ যখন করি, কিম্বা যখন ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়িতে থাকি, কখনো মনে হয়নি এটা একটা ইস্যু। একই মানুষ একই ভাব তার নানান প্রকাশ।

প্রশ্ন: কবিতায় যে আধুনিক এবং উত্তরাধুনিকের একটা বিতর্ক, এটাকে কীভাবে আপনি দেখেন?

আমি সাধারণভাবে আধুনিকতা বিরোধী লোক। কিন্তু আমাদের দেশের আধুনিকতাটা আর্টিফিশিয়াল। এটা পোস্ট কলোনিয়াল মেন্টালিটি হিশাবে টিকে রয়েছে। সেটা হোল, ইংরেজ বা সাহেবদের ভাবভঙ্গী অ্নুকরণ করাই আধুনিকতা। কারণ আমাদের এখানে আধুনিকতা আসেনি। যে অর্থে পাশ্চাত্যকে আমরা আধুনিক বলি। আমরা আধুনিক সমাজ না। আমরা আধুনিকভাবে চিন্তা করতে পারি না। কারন তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক শর্ত নাই, তৈরি হয় নি। মানে বাংলাদেশে কোনো আধুনিক ব্যক্তি হাজির থাকার শর্ত নাই। আমরা এখানে কী করি- আমরা দেখি আপনি কী ইসলামপন্থি, আপনি কী বাঙালি জাতিবাদী, আপনি কোন দল করেন- এভাবে চিন্তা করি। এইসব গোত্রবাদী বা সামন্তবাদী চিন্তা। এভাবে বিচার করি না যে কেউ ব্যক্তির নাগরিক ও মানবিক অধিকার স্বীকার করে কিনা। আমরা বাংলাদেশ বহু গোষ্ঠি ও দলে বিভক্ত । এখানে এখনও কোন আধুনিক পরিসর গড়ে ওঠে নি। উত্তরাধুনিক তো দূরের কথা। আধুনিক এবং উত্তরাধুনিকের বিতর্ক বাংলাদেশে হাস্যকর বিতর্ক।

প্রশ্ন: মর্ডানিজম শুরু হওয়ার পরও কি কমন বিষয়গুলা থেকে যায় না?

আমরা নিজেরা যখন আধুনিক সমাজ বানাই, সেই সমাজে তো একটা শ্রেণি থাকবেই যে এটাকে চর্চা করে। বুর্জোয়ারা এলো ইউরোপে, তারা তো সামন্তদের সঙ্গে লড়াই করে এলো। তারা ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বললো, তারা নতুন ধরনের রাষ্ট্র করলো-যেটা পুরনো সামন্ত বা রাজতন্ত্র নয়। আপনি তো গণতন্ত্রই প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন নাই। আপনি কীভাবে এই সমাজকে আধুনিক বলেন? আপনি একটা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে বাস করেন।

প্রশ্ন: গণতন্ত্র এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত কি আমরা বলবো না এই সমাজ আধুনিকতায় প্রবেশ করেছে?

কী করে বলবেন? সমাজে তো সেই চিন্তা থাকলে, ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটলে সংস্কৃতি রাজনীতি গণতন্ত্রে সেটা রিফলেক্ট করবে। করবেই। বাংলাদেশে আপনি তো চিন্তিত না তার জন্যে। আপনার সমাজে তো ব্যক্তি ও সমষ্টির দ্বন্দ্ব এবং তার সম্ভাব্য মীমাংসার জন্য কোনো চিন্তা নাই। ক্ষমতাবানরা আপনার ব্যক্তি অধিকার হরণ করে নিচ্ছে, অথচ আপনি তার জন্যে বিচলিত নন। উলটা আপনি ফ্যাসিস্ট সরকার ও রাষ্ট্রের সহযোগী হয়ে ভাবছেন আপনি ‘আধুনিক’। এটা কি হয়? আপনি যদি ‘আধুনিক’ ব্যক্তি হয়ে থাকেন তাহলে তো বিচলিত হবেনই, কিন্তু ব্যক্তি হয়ে ওঠার লড়াই বা বিপ্লব তো আপনাকে করতে হবে। এটা হলো পলিটিক্যাল আধুনিকের মানে। ব্যাক্তিকে হাজির করবার লড়াই আপনি করলেন না, পুরানা সম্বন্ধ চিন্তাচেতনার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন, এরপর আধুনিকতা নিয়ে কথা বলে কী ফায়দা? ব্যক্তির বিকাশ নিশ্চিত করবার রাজনৈতিক শর্ত হাজির না থাকলে, ‘আধুনিক’ হবেন কিভাবে?

‘আধুনিকতা’র মানে আপনি কি করে বুঝবেন? সেটা অনেক বড় পরিসরের তর্ক। পাশ্চাত্যের জিনিস। এটা তো কোকাকোলা নয় যে আপনি আমদানি করবেন আর খাবেন। এখানে আধুনিকতার মানে হলো পাশ্চাত্যের অনুকরণ করা। বাহ্যিক জৌলুস অনুকরণ করা। আপনার এখানে তো হেগেল আসেন নাই, আপনার এখানে তো কান্ট সাহেব আসেন নাই। এমনকি নিজেদের ভাবচর্চার ইতিহাস সম্পর্কেও আমরা অজ্ঞ। এখানে তো ধর্মের ক্রিটিক হয়নি। আপনার সমাজ ধর্ম নিয়ে মারপিট করছে কিন্তু ধর্মের ক্রিটিক করতে পারেনি,পর্যালোচনা করতে পারে নি। হেগেল তার ‘ফেনমেনলজি অফ স্পিরিট’ গ্রন্থে দাবি করছেন, আমি এসেছি কারণ আমি প্রমাণ করবো, প্রোটেস্টান ধর্ম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এটা আমি প্রমাণ করবো ধর্মতাত্ত্বিক ভাবে না, প্রমাণ করবো দার্শনিকভাবে...। এরপর ফয়েরবাখ এলেন, মার্কস এলেন...। আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসে আপনি কই?

প্রশ্ন: আমরা কি বলতে পারি বাংলাদেশে আপনি এই কাজটা নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন?

আমি জানি না। আমি করছি এ কাজ। কতটুকু পারছি সেটা বড় কথা না। আমার একার পক্ষে তো সম্ভব না। আমার আগে, বঙ্গে তো কান্ট নাই, কার্ল মার্কস নাই, আগে কোন এই স্তরের দার্শনিকরা নাই। আমাকে আবিষ্কার করতে হচ্ছে নিজেদের ইতিহাস খুঁড়ে।

প্রশ্ন: বঙ্গে নাই সেটা বলতেছেন?

বাংলা ভাষাতে নাই। বাংলা ভাষা তো সম্প্রতিকালের। খুব বেশি দিনের কথা না। কিন্তু বাংলা ভাষায় চিন্তাশীলতা ও ভাবচর্চার যে স্কুল গড়ে উঠেছিলো কলোনিয়াল কারণে তার সঙ্গে তো আমাদের ছেদ ঘটেছে। এই যে দেখুন, আধুনিকতার প্রশ্নে আবার ফিরে আসি। আমরা যদি আসলেই পাশ্চাত্যর আধুনিকতা মানি তাহলে তো আমাদের নিদেন পক্ষে কান্ট হেগেলের স্তরে ভাবতে শিখতে হবে। সেই হিম্মত তো আমাদের নাই।

কিম্বা বলুন, আমাদের ‘আধুনিক’ হবার দরকারটাই বা কী? আমরা তো কান্ট হেগেল হবো না। আমরা আমাদের মতোই হবো। ধরুন আজকে কৃষ্ণদাস কবিরাজের মতো কবি, তার মতো একজন মানুষ, যিনি দার্শনিক বই লিখছেন কাব্যে। কার সম্পর্কে? চৈতন্য সম্পর্কে। চৈতন্যের জীবনী এবং দর্শন নিয়ে লিখছেন তিনি। পয়ারে। কবিতায়। এটা চাট্টিখানি কথা না। বিশাল ব্যাপার।

তাহলে আপনি এদের তুলনায় এখনকার আধুনিকতাকে কেন নিজের বলবেন? কেন হেগেল হবেন? কান্ট হবেন?

কিন্তু আমরা কিছুই হই নি। কিছুই না। নাথিং। এমন কি কবি হিশাবে কৃষ্ণদাস কবিরাজের ধারে কাছেও নাই আমরা। কিম্বা সৈয়দ সুলতান কিম্বা আলাওলের নখের যোগ্যও নই। চৈতন্য চরিতামৃত পাশে নিয়ে বসেন। তাদের যে প্রকল্প, তাদের চিন্তার যে দুর্ধর্ষ সাহস, তা দেখে আপনি তাজ্জব বনে যাবেন। কী প্রকল্প? যে আপনি চৈতন্যকে দার্শনিকভাবে লিখবেন এবং তার জীবনীও লিখবেন। তার জীবনী হবে দর্শন। ফিলোসোফাইজ করছেন আপনি একজনের জীবনী আর সেটাও করছেন কবিতায়। আপনি কি বলতে পারবেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যে কিংবা বিদেশেও এটা হয়েছে? নাই। অসম্ভব। ফলে আপনি তো বিশাল ‘আধুনিক’ কাজটা অনেক আগে করে ফেলেছেন। এই বিপ্লব আরও স্বচ্ছ ভাবে হাজির হতে পারত যদি গণতান্ত্রিক বিপ্লব বা ব্যক্তির আবির্ভাব আমরা নিশ্চিত করতে পারতাম।

কিন্তু এর সঙ্গে এখন আপনার আর কোন যোগ নাই। এসবের সাথে বিচ্ছেদ মানে আপনার নিজের সঙ্গেই নিজের বিচ্ছেদ, আধুনিক হওয়া তো দূরের কথা। বিচ্ছেদ কেন ঘটলো? কারণ আপনি কলোনিয়াল আমলের পর থেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে আপনি একটা কালো লোক, আপনি একটা বেঁটে লোক, আপনি বাজে লোক। আপনি অশিক্ষিত, বর্বর পশ্চাতপদ। আপনার চামড়া সাদা না। ঠিক না? ফলে আপনাকে ‘আধুনিক’ হতে হলে সাদার মতো হতে হবে। আপনার চামড়া সাদা না হলেও আপনাকে সাহেবই হতে হবে। ফলে আপনার যা কিছু, আপনার যতো দর্শন, সাহিত্য কালচার খাওয়া দাওয়া সমস্ত কিছু আপনি তাই ঘৃণা করতে শুরু করছেন। সজ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে। এইসব করে করে আপনি যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, ‘আধুনিকতা’র ভারে জর্জরিত আপনার সঙ্গে তো আপনার নিজের অতীতের কোনো সম্পর্ক নাই । এমনকি আপনার পূর্ব পুরুষ চৌদ্দ পনেরোশ বছর আগের ইসলাম ধর্ম কেন গ্রহণ করলো সেটা বোঝারও তো কোন উদ্যোগ আপনার নাই। আপনি ভাবছেন অতীত ইতিহাসকে মাটি চাপা দিয়ে আপনি ‘সাহেব’ হবেন, আধুনিক হবেন। এভাবে হয় না। আধুনিক হওয়ার একটা প্রধান লক্ষণ হচ্ছে ইতিহাস সচেতন হওয়া। নিজের ইতিহাসের। নিজের জন্মবৃত্তান্ত জানা এবং বোঝা।

তাই দেখুন, আপনার ‘আধুনিকতা’র ধারণায় ইসলাম একটি বর্বর ও জঙ্গিদের ধর্ম।

আমাদের পূর্বপুরুষ যেসব আবিষ্কার করে গিয়েছে সে সম্পর্কেও আমাদের কোন খবর নাই। আমরা কৃষি নিয়ে কাজ করি। আমাদের পূর্বপুরুষ ১৫ হাজার জাতের ধান আবিষ্কার করেছে, আর তথাকথিত আধুনিক বিজ্ঞানিরা এত বছর গবেষণা করে ৮০ টি কিম্বা দুই একটি কমবেশি করেছে। অথচ আপনার বাপদাদারা করেছেন ফিফটিন থাউজেন্ড। একটা দুটা না। আমাদের কাছে আড়াই হাজার জাতের ধান আছে। আপনি তার কিছুই জানেন না। আপনাকে যদি জিজ্ঞাসা করি, আপনি একটা ধানের নাম বলতে পারবেন না। অথচ আপনি বাঙালি। আপনি কিসের বাঙালি? আপনি তো মাছের নাম জানবেন না। মাছ চিনবেন না। আপনাকে রান্না করতে দিলে রান্না করতে পারবেন না। সেটা বাদ দিন। এমনকি আপনি ‘তিল’ নামক শস্য থেকে ‘তৈল’ শব্দটা উৎপাদিত হয়েছে, তাও জানেন না। তৈলকে আমরা কেন তৈল বলি বলতে পারবেন না। আপনি সরিষার তেল এখন চেনেন না, সয়াবিন তেল চেনেন। কিন্তু তিল থেকে তৈল বা তেল, এটা জানেন না। তাহলে এই যে ইতিহাস বিচ্ছিন্ন একটা অজ্ঞ মুর্খ গোলামদের জগত গড়ে উঠেছে এটা কলোনাইজড পিপলদের জগত। তো এখানে ‘আধুনিকতা’র কথা বলা তো ফালতু কথা। এটা গোলামদের কারাগার। এখানে গোলামি কী জিনিস তাকে সাংস্কৃতিক দার্শনিক ভাবে বুঝুন। এখানে কী আধুনিকতা এসেছে বলবেন? কে ‘আধুনিক’?

প্রশ্ন: তো আপনি ধর্মের ক্রিটিক করার ভেতর দিয়ে নিজে যেখানে প্রবেশ করছেন কিংবা আপনার মতো আরও যদি কেউ থেকে থাকে তার ভেতর দিয়ে আমরা যারা এটাকে ফলো করতেছি, আমরা কি আবার সেই পুরানা আধুনিকতায় প্রবেশ করতেছি?

ক্রিটিক কথাটির মানে কি? সমালোচনা করা? না। ক্রিটিক মানে পর্যালোচনা। বিচার। পর্যালোচনা মানে কোন বক্তব্যের সার কথা, তার যে সারবস্তু, তা আত্মস্থ করে এগিয়ে যাওয়া। আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন। আপনি তো অতীতকে মুছে দিচ্ছেন না। ছেদ করছেন অতীতের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক। ঠিক আছে না? আপনি যখন কান্টকে ক্রিটিক করছেন হেগেল হয়ে, তখন কান্টকে ফেলে দিচ্ছেন না। কান্ট তার চিন্তাটা যতটুকু নিয়ে এসেছে সেটাই তো পাঠকের সামনে নিয়ে এসে, তার পর্যালোচনা করে কয়েক কদম এগিয়ে যেতে চাইছেন। আইনস্টাইন যখন নিউটনিয়ান মেকানিক্স থেকে বেরিয়ে আসছেন, তিনি তো নিউটনকে নাকচ করে বেরিয়ে আসেন নি, নিউটনের বিজ্ঞানের সারবস্তু ধারণ করে সামনে এগিয়ে গিয়েছেন। আইনস্টাইন যখন তাঁর আগের বিজ্ঞানিদের তত্ত্ব থেকে এগিয়ে গেলেন, তিনি কি অতীত থেকে সম্পূর্ণ নতুন কিছু করেছেন? আধুনিক কালের জ্যামিতি যখন ইউক্লিডের জ্যামিতির বাইরে নন-ইউক্লিডিয়ান জগতের কথা বলল, তখন কি ইউক্লিডকে তারা ত্যাগ করেছেন? এডমুন্ড হুসার্ল যখন রেনে দেকার্তের জগত থেকে বেরিয়ে আসছে তারা কি দেকার্তেকে ফেলে দিয়েছেন? ক্রিটিক মানে তো আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন। চিন্তার যে সারপদার্থ, চিন্তার যে আবিষ্কার সে আবিষ্কারটা আপনি ধরে রাখছেন। ধরে রেখে আপনার মধ্যে নতুন জিজ্ঞাসার উদ্ভব ঘটছে, আপনি এগিয়ে চলেছেন। আপনি সচল।

কিন্তু আপনি যখন কবিতা প্রসঙ্গে বললেন যে, ভাষাকে ডিনাই করার মধ্যে দিয়ে কবিতা তৈরি হয়, আপনার যেমন প্রথম দিককার কবিতাগুলোতে তৎকালীন যে প্রচলিত বাংলা ভাষা সেটা কি খুব বেশি ডিনাই করেছেন আপনি?

না, না। কবিতার চরিত্রই ভাষাকে অস্বীকার করা। আপনি যখন কবিতা লিখতে বসছেন তখন তো আপনি বিদ্যমান ভাষাকে অস্বীকার করছেন। আমার কবিতার মধ্যে অবশ্যই ভাষা নিয়ে কারবার আছে। ভাঙচুর আছে, ভাঙন আছে। তারপরে থিমেটিক এনগেইজমেন্ট আছে। কবিতা তো আপনি গদ্য আকারে পড়েন না। সেটা আলাদা জিনিস। কবিরা যখন ভাষা নিয়ে কাজ করে তখন ভাষার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নতুন ভাষা তৈরি করে। এই জন্য ‘কাব্যভাষা’, কবির ‘নিজস্ব’ কন্ঠস্বর ইত্যাদি নানান ধারণা কাব্যালোচনায় আমরা পাই।

আমি তো সামাজিক-রাজনৈতিক মানুষ বলে কবিতার মধ্যে এসেছি। ফলে ভাষার ভাঙন কিছু কিছু কবিতায় সরাসরি এসেছে। কিছু কিছু কবিতায় আসেনি। বা ভিন্ন ভাবে এসেছে। কবিতার বিবর্তনের মধ্যে কবিতা সম্পর্কে সাধারণ মন্তব্য হচ্ছে এই কাজটা, কবিতা প্রথমত তার কারবারটা, সবসময় প্রথাগত ভাষার সঙ্গেই করে।

আমি আপনার সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলছি সেই ভাষাকে ক্রিয়েটিভ কাব্য চিন্তা প্রতিবন্ধকতা মনে করে। কেন মনে করে? কারণ ভাষার আগে বস্তুজগতের যে ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ উপলব্ধি কবি ব্যক্ত করতে চায় সেখানে কবি যেতে পারে না, ভাষা একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আপনি তাদের আগেই নাম দিয়ে ফেলছেন। আপনি তাকে ফুল, লতা, পাতা, পাখি ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করে ফেলছেন। অথচ আপনি চাইছেন এই বিদ্যমান নামের জগত অতিক্রম করে জগতের সঙ্গে আপনার নতুন অভিজ্ঞতা বিদ্যমান ভাষা অতিক্রম করে নতুন ভাষায় প্রকাশ লাভ করুক। অতিক্রম করতে গিয়ে কবি যখন দেখে তার নতুন অভিজ্ঞতাটা আপনাকে প্রথাগত ভাষায় বোঝাতে পারছে না, তখন সে প্রতীক ব্যবহার করে, উপমা ব্যবহার করে,নানান ইশারা ইঙ্গিত ব্যবহার করে। কবির ভাষার মধ্যে একটা মিস্ট্রি চলে আসে। ঠিক আছে? সে কারণে কবিতা মাত্রই হলো প্রথাগত ভাষার সঙ্গে কবির টানাপড়েন, বিদ্রোহ। এজন্যই ‘প্রথম বিপ্লবের খুন বের হয় ভাষা থেকে’।

আপনি ভাষাকে যখন এই নতুন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাবার শর্ত তৈরি করেন, তখন সমাজে নতুন চিন্তার শর্ত তৈরি হয়। আপনি তখন এই ভাষার মধ্য দিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ যদি না আসতো, তাহলে ‘আধুনিক’ বাঙালি লোকজন অতোটা চিন্তা করতে পারতো না। রবীন্দ্রনাথ আসার আগে বাংলা ভাষার কী অবস্থা ছিলো? মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার এবং অন্যান্য পণ্ডিতরা সাহেবদের সঙ্গে মিলে এক অদ্ভূত বাংলা গদ্য তৈরি করেছিল। তারা তো আসলে জগাখিচুড়ি সংস্কৃত ভাষা দিয়েছে বাংলার নামে। তো সেই ভাষা থেকে বেরিয়ে এসে রবীন্দ্রনাথ কী করলেন? তিনি বাংলাকে মুখের ভাষার দিকে নিয়ে যাবার সাধনা করলেন। এটাই তো ভেবেছিলেন তিনি, যে সাহেব-পণ্ডিতদের বাংলাকে মুখের ভাষায় দিকে নিয়ে যাবো। তো উনি সাহিত্যকে মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। এভাবে তিনি নতুন ভাষাও তৈরি করেছেন, আমাদের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছেন।

তাও তো তিনি সকলের কাছে যেতে পারেননি। ভাষার ক্ষেত্রে যারা কাজ করেছেন যাদের আমরা নাম শুনি না। জানি না, তারা যেভাবে সাধারণ মানুষের কাছে যেতে পেরেছে রবীন্দ্রনাথ পারেন নি। আপনি বয়াতী গান শুনেন কিনা জানি না। জালাল উদ্দিনের নাম শুনেছেন? গ্রামে যে দশটা গান গাওয়া হয় তার মধ্যে সাতটা গানই জালাল উদ্দিন খাঁর গান। জালাল উদ্দিন একজন নামকরা দার্শনিক। লালন যেমন দার্শনিক তেমন। তো এরা ভাষা নিয়ে প্রচুর কাজ করেছেন। অনেকে বলে না যে আমরা লালনের গান বুঝি না। কেন বলে? কারন বাংলাভাষা সম্পর্কে আধুনিকদের আসলেই তো কোনো অভিজ্ঞতা নাই। অভিজ্ঞতা নাই যেহেতু বাংলা ভাষার নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই সম্পর্কে আপনার আমার কোনো যোগবিয়োগই মিলছে না। সে কারণেই একটা কলোনাইজড জনগোষ্ঠীর কথা আমরা বলছি। কলোনাইজড জনগোষ্ঠীর এই দশাই ঘটে। ফলে তাকে লড়াইও করতে হয় ডাবল।

প্রশ্ন: আপনার প্রথমদিকের কবিতার বইগুলোর মধ্যে এখন সবচেয়ে পছন্দের বই কোনটা?

সবগুলোই পছন্দের। কবিকে জিগ্যেস করলে মুশকিল।

প্রশ্ন: আরেকবার চেষ্টা করে দেখেন, তারপর নির্দিষ্ট কোনো বই এর নাম বলবেন কিনা?

সবই পছন্দ। আমার কবিতার মধ্যে আমি যেটা চেষ্টা করেছি সেটা হলো এই, প্রত্যেকটা কবিতার মধ্যে দেখবেন যে থিম আলাদা এবং কবিতাগুলো থিমেটিক কবিতা। পুরো বইয়ের একটাই হয়তো বিষয়। পুরো বই নিয়ে থিমেটিকালি লেখা বাংলা সাহিত্যে এর আগে হয়নি। ‘বৃক্ষ’ নিয়ে একটা থিমেটিক লেখা পুরাটা,‘এবাদতনামা’ নিয়ে একটা থিমেটিক লেখা। একটা থিমকে আনার চেষ্টা করা।

প্রশ্ন: আমরা তো মনে করি আপনি অত্যন্ত সফল হইছেন।

ধন্যবাদ। অনেক শুকরিয়া। কিন্তু সেই কাজটা, সফলতাটা আধুনিক বাংলা কবিতায় হয়েছে। অথচ আমি কাজ করতে চেষ্টা করেছি এমন সব ক্ষেত্রে যে কাজ আধুনিক বাংলা কবিতায় হয়নি বা করা সম্ভব না। আমার কবিতায় স্ববিরোধী একটা ব্যাপার হচ্ছে, আমি যেহেতু বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ পুরো আধুনিক কবিদের মধ্যে থেকে কবিতা লেখা শুরু করেছি, হয়তো তাই আমি ইচ্ছে করলেই এই ধারা থেকে বের হতে পারি না।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনার মধ্যে কখনো জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রভাব দেখা যায় না।

তা ঠিক আছে। ত্রিশের কোনো কবির বলয়ে আপনি আমাকে ঢুকাতে পারবেন না, আমার মধ্যে তাদের প্রভাব দেখাতে পারবেন না। থার্টিজের কবিদের, যাদেরকে আপনারা আধুনিক কবি বলতে বুঝেন, তাদের আমি কেরানি কবি বা কেরানি যুগের কবি বলি। আমার দাবি হলো ত্রিশের কবিতা বাংলা কবিতার সবচেয়ে খারাপ সময়। সবচেয়ে দুর্দশার সময়। আমার মধ্যে সবচেয়ে বড় কবির যে ইমেজ সে হচ্ছে কৃষ্ণদাস কবিরাজ অথবা সৈয়দ সুলতান। জীবনানন্দ দাশও না। জীবনানন্দ দাশের অত বড় সাহসও নাই কৃষ্ণদাস কবিরাজের মতো কিংবা সৈয়দ সুলতানের মতো।

প্রশ্ন: তিনি শ্রী চৈতন্য নিয়ে কিছু লেখেননি ওই জন্যে?

না। চৈতন্য তো আলাদা। তাকে নিয়ে বলতে গেলে তো অনেক বড় কথা বলতে হয়। অত সময় আপনাদের হবে কিনা জানি না। কিন্তু প্রথম কথাটা হচ্ছে এদের সাহস দেখুন! আপনাকে মনে রাখতে হবে যে সৈয়দ সুলতান যখন তার বইয়ের নাম রাখেন, তখন রাখেন ‘জ্ঞানচৌতিশা’, এটা তার দর্শনের বই। চৌতিশাতে বা চৌদ্দ অক্ষরের পয়ারে জ্ঞান চর্চা করা। তাহলে এই ধারা থেকে আমরা সরে এসেছি কেন? কারন আমরা হঠাৎ করে আধুনিক হতে চেয়েছি। বাইরের রঙচঙে আমরা বিমোহিত হয়ে এরকম হতে চেয়েছি। ফলে প্রজ্ঞাগত, মানে আমাদের যে জ্ঞানের বিকাশটা দরকার ছিলো, একটা জনগোষ্ঠী হিসেবে, ভেতর থেকে, সেটা হয়নি।

প্রশ্ন: আপনার নিজের কি মনে হয়? ওই সময় আপনার কবিতায় ব্যবহৃত ভাষা এবং এই সময়ে ব্যবহৃত ভাষার সাথে তাৎপর্যপূর্ণ তফাৎটা কী বলে আপনার মনে হয়?

শুনুন, আমি যখন ‘খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ’ লিখি, সেটা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের উপর কবিতা। কিন্তু কবিতার বইয়ের এই নাম কিম্বা কবিতার বিষয় হিসাবে এই ধরণের থিম ছিল একদমই নতুন। এটা সেলফ ক্রিটিকাল কাব্য। এটা নিজের পেটি বুর্জোয়া চরিত্রের সমালোচনা, যুদ্ধ যা অচিরেই বদলে দিতে যাচ্ছে। পেটিবুর্জোয়া শহরে থাকে এবং সে লড়াই করতে যাবে কিন্তু করবে কি করবে না খুব নিশ্চিত না। চিলেকোঠার সেপাই হয়ে রয়ে গেছে। ‘খোকন এবং তার প্রতিপুরুষের’ মধ্যে সেই দ্বন্ধটা আছে। খোকন তো চিলেকোঠার সেপাই। এখন এই যে ঘটনা ঘটছে বাইরে, সাধারণত যুদ্ধের সময় মানুষ রাস্তায় নামতেছে, এই ঘটনা তাকে বদলে দিচ্ছে। সে তারই রিফলেকশন করেছে পলিটিক্যালি। কিন্তু কবিতায়। আর কাব্য হিসেবে মানে কাব্য ভাষা হিসেবে যেটা হয়েছে তার পরীক্ষা নিরীক্ষাও আছে।

প্রশ্ন: ‘খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ’ নিয়ে আমার একটা কথা ছিলো। এখানকার কবিতাগুলি তো যুদ্ধের সময়ের। আপনি এখানে লিখেছেন- ‘খোকন, কবি আমার, তুমি ভেবেছিলে পদ্যে পদ্যে তোমার দিন যাবে, দিন যাবে আকাশকুসুম নন্দনতত্ত্বে। কিন্তু বাইরে যুদ্ধ...’ এটাও তো এক ধরনের উদ্দীপনামূলক কাব্য।

বাংলা কবিতায় এর আগে ত্রিশের কবিদের কেরানীযুগ এসেছে এবং বামপন্থিদের একটা যুগও এসেছে, যেখানে কবিতা- ‘পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। এ রকম একটা সোশ্যাল রিয়ালিজমের ডিমান্ড এসেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই কবিতাগুলো লেখা হচ্ছে। আবার যে খোকন সে কিন্তু সেলফ কনশাস ইতিমধ্যে। সেলফ কনশাস, কিন্তু বাংলা কবিতায় নায়ক হিসেবে সে সেলফ কনশাস, আত্মসচেতন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাস তার জানা। কারণ তার আগের আত্মসচেতনতা ছিল বুদ্ধদেব বসুর চেতনা হিশাবে, আগে ছিলো জীবনানন্দ দাশ হয়ে। তো বাংলা কবিতা ভাবছে এভাবেই বোধহয় কেটে যাবে জীবন। কিন্তু বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলা কবিতার নায়কের গালে থাপ্পড় দিয়ে দিল। সে দ্বিধায় পড়ে গেল। তাকে জীবনদেবতা কিম্বা বনলতা সেন না, যুদ্ধ নিয়ে ভাবতে হোল। তাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হোল। ফলে তার পক্ষে আর কেরানি কবি হবার প্রশ্ন ওঠে না। ‘আর কতোদূর নিয়ে যাবে মোরে হে সুন্দরী’ যেমন তার কবিতা হতে পারে না আর, তেমনি হতে পারে না, ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে তাকালেন বনলতা সেন’ টাইপের কবিতা লেখা। বরং খোদ রবীন্দ্রনাথকেই প্রশ্ন করতে হচ্ছে যে ঠাকুরের তো যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল না। বাংলা কবিতার নতুন নায়কের দাবি: রবীন্দ্রনাথ যুদ্ধে যান নি, কিন্ত

“আমি বিশদ যুদ্ধ জানি খুব সহজে মরতে পারি
তোমার জন্য লক্ষ লক্ষ বার এ আমি খুন হয়েছি”
(খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ)

এই যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যে বেড়ে উঠেছে সেতো নতুন মানুষ। দুই হাজার আঠারো সালে এসে সে ‘সদরুদ্দীন’, যার মানে ধর্মের সেনাপতি। যুদ্ধ তো জারি রয়েছে। কেমন সেনাপতি তিনি ‘সদরুদ্দীন’ পড়ুন, বুঝবেন।

আপনি আমার কবিতা ফরহাদ মজহার আকারে পড়বেন না। কিন্তু আপনি বাংলা কবিতার জীবন দেবতাকে অনুসরণ করে আমার সাম্প্রতিক বই ‘সদরুদ্দীন’ পর্যন্ত আসেন। তাহলে বাংলা কবিতারই তো এটা মোহ ভঙ্গ ঘটছে। নিজেকে নিজে কবি বলছেন, তুমি কবিতা লিখতে এসেছো কিন্তু তোমার দ্বারা হবে না। কারণ তোমার সমাজ আছে, তোমার ইতিহাস আছে। সেইসব বাদ দিয়ে তুমি প্যারিসের রাস্তা আর এলিয়টের গালগল্পে মেতে আছো। একবার তাকে ‘জীবন দেবতা’ আরেকবার ‘বনলতা সেন’ করে বেড়াচ্ছ। তোমার ভূগোল তো তুমি চেন না। পথ হারিয়ে ফেলেছ। তোমাকে তোমার সমাজে ও ইতিহাসে পারটিসিপেট করতে হবে, তোমাকে অংশগ্রহণ করতে হবে। ঘরে বসে থাকলে তোমার হচ্ছে না। তুমি চিলেকোঠার সেপাই হয়ে থাকলে তোমার হচ্ছে না। ফলে এটা কিন্তু বাংলা কবিতার নায়কের বক্তব্য, ফরহাদ মজহারের বক্তব্য না।

এই কনটেক্সট আমাদের বোঝার দরকার আছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বললে শামসুর রাহমানকে বোঝার দরকার আছে, আল মাহমুদকেও বোঝা দরকার। শামসুর রাহমানের পর কে আমি জানি না। শামসুর রাহমান তখন কী লিখতেছে? বাম চিন্তায় বিশ্বাসী কবিরা লিখতেছে ঝলসানো রুটি এসব। পূর্ণিমার চাঁদ ঝলসানো রুটি হয়ে গিয়েছে। আর শামসুর রাহমান লিখতেছেন তিনি ‘ভীরু খরগোশ ব্যবহৃত ঘাসে’ একটুখানি শুইতে চান। অর্থাৎ কবি খালি রুটি খায় না, ক্ষুধার জ্বালায় তাড়িত থাকে না। তার অন্য রকম ক্ষুধাও আছে। ভীরু খরগোশ যে ঘাসের মধ্যে খেলা করে গিয়েছে, সেখানে কবি একটুখান ঘুমাবার চায়। কবি হিশাবে শামসুর রহমানের এই ধরণের পংক্তি খুবই ইমপরট্যান্ট আমার জীবনে। বাম বিরোধী চরম প্রতিক্রিয়াশীল কিন্তু এই রোমান্টিক কথার খুব রিয়াকশন ছিল কিন্তু সে সময়। মানে আমরা যারা আসলেই কবি, তাদের মধ্যে।

কিন্তু ঝলসানো রুটির বিপরীতে ভীরু খরগোসের ব্যবহৃত ঘাসে ঘুমাতে চাওয়া বাংলা কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে সাংঘাতিক প্রগেসিভ। একটা রিলিফের মতোন। শামসুর রাহমান নতুন একটা জায়গা তৈরি করছে। দেখুন,একাত্তরে আমরা কিন্তু এই ভাবেই পলিটিসাইজড হচ্ছি। কিন্তু আমাদের মতো করে। কবিতায় বাম-ডানের ভেদ তুলে দিয়ে। বিপরীতে যারা ডিপলিসাইজড হচ্ছে, তারা কিন্তু সুনীল, শক্তি, জয় গোস্বামীর দিকে চলে যাচ্ছে। গঙ্গোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায় আর গোস্বামীদের আছর থেকে তারা বেরুতে পারছে না। কলকাতার পরিপ্রেক্ষিতে সুনীল শক্তি জয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে তারা খাপ খায় না। ইতিহাস ভারি মজাদার জিনিস। কবিতা ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন। সমাজের সঙ্গে যুক্ত না। ওসব কিন্তু এখনকার লোকেরা কেউ পড়ে না।

সেসব হিসেব করলে ‘খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ’ খুব ইন্টারেস্টিং। ‘খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ’ পড়ে যদি বুঝতে পারেন তাহলে আমার শেষ কাব্য ‘সদরুদ্দীন’ও সাংঘাতিক ইন্টারেস্টিং মনে হবে। আপনি জীবনানন্দ পড়েছেন, বনলতা সেনকে চেনেন। কিন্তু ‘সদরুদ্দীন’ তো পড়েননি, দেখেননি, শোনেন নি। অথচ সদরুদ্দীন তো দাঁড়িয়ে আছে আপনারই সামনে। আপনি তো তাকে দেখছেন না। তাকে আপনি যে নামেই ডাকেন না কেন, একাত্তরের মধ্যে যার জন্ম তার তো লড়াই থামবে না। তার লড়াইয়ের কন্টিউনিটি যেমন আছে আমার কবিতার মধ্যে, তার ডিসকন্টিনিউটিও আছে। মানুষ তো ডেভেলপ করে কন্টিনিউটি আর ডিসকন্টিনিউটির মধ্যে। এভাবে কবিতার বিচার পদ্ধতি আমাদের তৈরি করতে হয়। কবি হিশাবে আপনি কোথায় ছেদটা ঘটাচ্ছেন সেটাও কবির নিজের বিকাশ বোঝার জন্য জরুরি। কিছু কিছু কবিতা ধারাবাহিকতা ছিন্ন করে একদম বাইরের দিকে চলে গেছে। যেমন,‘দরদী বকুল’। একদম নতুন ধরনের কবিতা। ‘এবাদতনামা’ একদম নতুন ধরনের কবিতা। ‘এবাদতনামা’ ছিলো রীতিমতো আমার জন্য বড় ধরনের একটা পরীক্ষা। পরীক্ষায় পাস করবো কিনা আমি নিজেও খুব নিশ্চিত ছিলাম না।

প্রশ্ন: ‘এবাদতনামা’ প্রকাশ হওয়ার পরে এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে যে গোলাযোগ সৃষ্টি হয়েছিলো তখন আপনার ব্যক্তিগত অভিমত কীরকম ছিলো?

কিচ্ছু না। এটা আমাকে টাচ করেনি। আমি ওদেরকে মূর্খ মনে করেছি অলওয়েজ। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ‘শিক্ষিত’ মানুষ সম্পর্কে আমার ধারণা এরা অজ্ঞ। কবিতা এরা পড়ে না। কারণ আমার কনফিডেন্স সব সময় ছিলো যে, আমি কবিতা পড়েছি। বাংলা সাহিত্যের কবিতা সম্পর্কে আমি থরোলি অবগত। আধুনিক কবিতা থেকে আরম্ভ করে সৈয়দ সুলতান বলুন, আলাওল বলুন, কৃষ্ণদাস কবিরাজ বলুন আমি থরোলি পড়েছি। ফলে সেখানে আমি শক্ত। আমি জানি আমি কী করেছি। এখন তরুণরা যখন আগামী দিনে আরও কবিতাতে প্রবেশ করবেন, বাংলা কবিতার ইতিহাস বুঝতে চেষ্টা করবেন তখন বুঝবেন। এটাতো বাংলা কবিতার হিস্ট্রির অন্তর্গত ব্যাপার, তার মধ্যেই এটাকে দেখতে হবে। বাংলা কবিতার ইতিহাসের মধ্যে আপনি এটাকে দেখবেন। এটা বাংলা কবিতার ধারাবাহিকতায় এই সব কাজ কোথায় ডিসলোকেট করেছে আর কোথায় ইনোভেট করেছে। ইত্যাদি। ‘এবাদাতনামা’ তো ইনোভেট করেছে একরকম ভাবে, ‘খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ’ ইনোভেট করেছে ভিন্নভাবে। ইনোভেশনের ধরনটা দুটা, দুরকম। ‘সদরুদ্দীন’-এর ইনোভেশন একদম ভিন্নরকম। শিবানিও অন্যরকম। শিবানিতে ফিলোসফিকালি অনেক বেশি কনফিডেন্ট আমি। ‘শিবানি’ তো শেষ করতে পারিনি, শেষ করতে পারলে দেখা যাবে কী দাঁড়ায়। যতটুকু করতে পেরেছি, সেটা তো করতে পেরেছি। কবিতায় তো কাব্যিক ইশারা ফ্ল্যাশের মতো আসে, ফ্ল্যাশের মতো চলে যায়। ধরতে পারা তো সবসময় সম্ভব হয় না।

প্রশ্ন: সাহিত্য জীবন থেকে একটু আপনার রাজনীতি জীবনে আসি।

রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন করলে তো ভয় পাই।

প্রশ্ন: আচ্ছা,আপনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বাম রাজনীতি কী?

প্রশ্ন: আপনি কার্ল মার্কসের অনুসারী ছিলেন। তো সত্তরের দশকের শুরুর দিকে আপনি নকশাল আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি ছিলো সেখানে যুক্ত হয়েছিলেন।

ঠিক না। কোনোটাই ঠিক না।

প্রশ্ন: আপনার মুখ থেকেই শুনি কোনটা সত্য, কোনটা ঠিক...

রাজনীতির আলোচনা করতে হলে আপনাদেরকে রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে। যেমন, নকশাল কথার অর্থ কী? কথাটাকে তো নেতিবাচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আপনি না করলেও আপনি যখন লিখবেন যারা পড়বে তাদের তো তাই মনে হবে। তাহলে আমার একটা বই লিখতে হবে। রাজনৈতিক বিষয় নিয়া কথা বলতে আমার অসুবিধা নাই। সে আমলে লেফটের তর্কের ক্ষেত্র কী ছিলো? তারা কী নিয়ে তর্ক করতো। তাদের রাজনৈতিক পক্ষ...। ব্রডলি যারা রেডিকেল লোক, সোভিয়েতপন্থি না। রেডিকেল লোক বলতে যারা লেনিনের অনুসারী ছিলো, তাদের বক্তব্য ছিলো এই যে আমাদেরকে পুরো পাকিস্তানব্যাপী একটা গণতান্ত্রিক বিপ্লব করতে হবে। যেমন, নকশালরা একাত্তরের যুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলেছে। এটা কে বলছে? এটা তো প্রোপাগান্ডা। তখন গণতান্ত্রিক বিপ্লব ছিলো সকল র‍্যাডিকেল বাম ধারা – মার্কস, লেনিন ও মাওবাদি ধারার কর্মসূচী। লক্ষ্য ছিল পুরো পাকিস্তানব্যাপী একটা গণতান্ত্রিক লড়াই করতে হবে, না করলে বিচ্ছিন্নবাদী অদূরদর্শী চিন্তা দ্বারা যদি পূর্ব পাকিস্তান আলাদা করে ফেলার মতো কোনো কিছু করা হয়, আলাদা হয়ে যায়, তাহলে পশ্চিম পাকিস্তান ফিউডাল সমাজ ও ফিউডাল রাষ্ট্র হিসাবে থেকে যাবে। সামন্ত শ্রেণিকে উৎখাত করা যাবে না। দ্যাট উইল বি ডেঞ্জারাস। আমরা বাম, যারা মার্কসের অনুসারী, আমরা জাতীবাদী না। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষের লোক না আমরা। কখনো ছিলাম না, এখনো না। আমি জাতিবাদ বিরোধী লোক। আমি সেটা সবসময়ই বলে আসছি, এখনও বলতে পারি। এখনও বলি, অসুবিধা নাই।

ফলে র‍্যাডীকাল বাম বা তথাকথিত নকশালদের বক্তব্য ছিলো পুরো পাকিস্তানব্যাপী একটা গণতান্ত্রিক বিপ্লব করতে হবে। এই গণতান্ত্রিক বিপ্লব করবার ক্ষেত্রে একটা তাত্ত্বিক তর্ক চলছিলো তখন, রেহমান সোবহানদের সঙ্গে। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশে দুই অর্থনীতি চলে। আমরা বলছি যে রহমান সোবহানরা ভুল। এটা পেটিবুর্জোয়ার বর্ণবাদি ও সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা। পেটিবুর্জোয়া মনে করে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা বাঙালি বনাম পাঞ্জাবির সমস্যা, বাঙালি বিহারির সমস্যা, ইত্যাদি। অথচ বাংলাদেশে যে শোষণ সেটা একটি সামন্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্যাপিটালিস্ট বা পুঁজিতান্ত্রিক শোষণ। কারণ পাকিস্তান রাষ্ট্র ব্যবহৃত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সম্প্রসারণের জন্য। পাকিস্তানে সামন্ত ও আধা সামন্ত শ্রেণি ক্ষমতায়। ফলে লড়াই গণতান্ত্রিক জনগণের সঙ্গে সামন্ত শ্রেণির। পাঞ্জাবির সঙ্গে বাংগালির কিম্বা বাংলাভাষীদের সঙ্গে উর্দুভাষীদের না।

ভুলে যাবেন না পাকিস্তান পুঁজিতান্ত্রিক উন্নয়নের নীতি গ্রহণ করেছিলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন পাকিস্তানের ডেভেলপমেন্ট পলিসি নির্ণয় করেছে। মার্কিন বিশবিদ্যালয়ের প্রফেসররা ঠিক করে দিচ্ছে সেই পলিসি। সেখানে মেইন পলিসি হচ্ছে ক্যাপিটালিস্ট ডেভেলপমেন্ট ঘটানো। যখন একটা দেশে ক্যাপিটালিস্ট ডেভেলপমেন্ট ঘটে তার চরিত্র হচ্ছে কৃষিকে শোষণ করা এবং সেই শোষণের অর্থ দিয়ে শিল্পায়ন করা। এখানে কৃষির সবচেয়ে লাভজনক ক্ষেত্র কী ছিলো? সেটা ছিল পূর্ব পাকিস্তান। স্বভাবতই ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিতান্ত্রিক উন্নয়ন নীতির কারণে এক্সপ্লয়েট করা হয় পূর্ব পাকিস্তানকে। কৃষি প্রধান বাংলাদেশকে শোষণ করে ইসলামাবাদকে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড করার নীতি সামন্ত শ্রেণি গ্রহণ করেছিল, তার সহযোগী ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। তাই সারা পাকিস্তানব্যাপী গণতান্ত্রিক বিপ্লব মানে একই সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। র্যা ডিকেল বা তথাকথিত ‘নকশাল’ বলতে যাদের নিন্দাসূচক ভাবে ইতিহাসে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয় – এটাই কম্বেশী তাদের প্রত্যকের প্রধান বক্তব্য।

আমরা বলেছি পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ একটি সামন্ত বা আধা সামন্তবাদী রাষ্ট্রে ক্যাপিটালিজমের বিশেষ চরিত্রের লক্ষণ। সাম্রাজ্যবাদের কারণে দেশের অভ্যন্তরে বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যাবার সমস্যা। ইট হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ রেসিজম। রেহমান সোবহানদের‘টু ইকনমি’ মূলত পূর্ব পাকিস্তানের দুর্দশার বর্ণবাদি বয়ান। পাঞ্জাবীরা বাঙালিদের মারতে চায় পাঞ্জাবীরা বাঙালি মারতে উন্মুখ, এটা ট্রু না। পাঞ্জাবিদের মধ্যেও গরিব, শ্রমিক ও সর্বহারা আছে। এটা হচ্ছে প্রথম বক্তব্য।

দ্বিতীয় বক্তব্য হচ্ছে যদি পূর্ব পাকিস্থান বিচ্ছিন্ন হয়, আমরা এটাকে অবশ্যই ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বলেছি, সেই বিচ্ছিন্নতায় বাংলাদেশ ভারতের কলোনি হবে। এখন কী হয়েছে? বাংলাদেশ তো ভারতের কলোনি এখন। এটাই তো আমরা বলেছি সেভেন্টিতে। অতএব জাতিবাদী আবেগে বিভ্রান্ত না হয়ে সারা পাকিস্তানব্যাপী গণতান্ত্রিক বিপ্লব করাটা প্রথম কাজ গণ্য করেছি আমরা।

ঠিক আছে, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, কারন আমাদের ওপর পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও ভূট্টো যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। ভারত যুক্ত হোল তার নিজের স্বার্থে। সেভেন্টি ওয়ানে যুদ্ধ করলাম। কিন্তু যুদ্ধ করার পর আমরা, আওয়ামি লীগ ওয়ালারা, ডেমোক্রেটিক রেভোলিউশন করতে দিলাম না। যারা পাকিস্তানে গিয়েছিলো পাকিস্তানের সংবিধান লেখবার জন্য, ড. কামাল হোসেনের মতো লোকজন, তারা এসে বললো তারাই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সংবিধান লিখবে। কিন্তু ওরা তো নির্বাচিত হয়েছিলো পাকিস্তান সংসদে, লিগাল ফ্রেইম ওয়ার্ক অর্ডারে বা এল এফ ও’তে স্বাক্ষর দিয়ে। সেই নির্বাচন পাকিস্তানী শাসকরাই করতে দিয়েছে। এল এফ ও যখন ওরা সাইন করে তখন তো ওরা কথা দিয়ে এসেছিলো ইয়াহিয়া খানের সাথে যে তারা পাকিস্তান ভাঙবে না। তো পাকিস্তান ভেঙে তারা তো রাষ্ট্রদ্রোহী পাকিস্তানের চোখে। তারা এসে তাদের একটা দলীয় ফ্যাসিস্ট আদর্শের সংবিধান বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিল।

অথচ, স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ, যারা ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে ‘প্রোক্ল্যামেশন অফ দি ইন্ডিপেনডেন্স’ বা স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্যে দিয়ে বলে দিয়েছে তারা কী চায়: তারা বলেছে তারা সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চায়। কিন্তু ফ্যাসিস্টরা দিল্লীর সহযোগিতায় সেটা করতে দিল না। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বদলে আপনি কী ঢুকালেন? ধর্ম নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ইত্যাদি। আপনি ফ্যাসিজম এনে ঢুকালেন। ঢুকিয়ে বাংলাদেশকে আপনি এখন বর্তমান জায়গায় নিয়ে এসেছেন।

তো আমাকে কী করে বুঝবেন? যদি ইতিহাস, বিশেষত বাংলাদেশের বিপ্লবী বাম ধারার পুরো হিস্ট্রি যদি কারো অজানা থাকে -- যেমন, কেন এল এফ ও করলো ইয়াহিয়া খান? করে কেন আওয়ামি লীগকে জিততে দিলো। এটাও আপনার খোঁজ করতে হবে।

এখন দেখুন, শেখ মুজিব ছিলো অ্যামেরিকানদের বন্ধু, তিনি সিয়াটো সেন্টো সমর্থন করেছেন এবং সমর্থন করতেন। তাতে মুজিবের কোন দোষ হয়ে যায় নাই, কারন তিনি তো হো চি মিন না। আমেরিকানরা চেয়েছে চীন এবং ভারতের বিপরীতে একটা শক্তি তারা এখানে তৈরি করবে এবং সেটা তারা তৈরি করবে শেখ মুজিবকে দিয়ে। ভারত তখন কিন্তু নন অ্যালাইনমেন্টে শিবিরে। শেখ মুজিবুর রহমান তখন এল এফ ও এর অধীনে ইয়াহিয়া খানের নির্বাচন করলে্ন। তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সমর্থক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক কেউ না। তাদেরই লোক। গোলটেবিল বৈঠকে তাদের কথাবার্তা হয়েছে। হওয়ার পরে ইলেকশনটা হলো। স্বভাবতই বাংলাদেশের মানুষ শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চেয়েছে, মওলানা ভাসানীও চেয়েছিলেন, কারণ জনগণ চায়। আমেরিকানরাও চেয়েছে, অনেকে চেয়েছে।

চাইলে কী সুবিধা হতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, একটা বড় দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে? শেখ মুজিব কুড বিকাম অ্যা গ্লোবাল লিডার। একটা আন্তর্জাতিক নেতা হতো। স্বায়ত্ব শাসিত পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। কিন্তু আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরের দিল্লীর দালালরা কী করলো? তারা শেখ মুজিবরকে আন্তর্জাতিক নেতা হতে দিলো না। কারন তাদের ইন্দিরা গান্ধী আছে। শেখ মুজিবর তো পাকিস্তান ভাঙতে চাননি। তাহলে পাকিস্তান ভাঙলোটা কে? বা কারা? কী জন্য? এদেরকে চিহ্নিত করা ছিল তখনকার কাজ। আমাদের লড়াই তো ছিলো বড় ভূ-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এদেরই বিরুদ্ধে। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত। আমরা, র‍্যাডিকাল বাম ধারা বা তথাকথিত নকশালরা, স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান চাই নি। ভারতের উপনিবেশ হতে চাই নি, বরং ভারতীয় উপনিবেশ কাশ্মির ও উত্তর পূর্ব ভারতের জনগণের মুক্তি এবং উপমহাদেশ ব্যাপী গণতান্ত্রিক বিপ্লব চেয়েছিলাম, ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক হিন্দু ও মুসলমানের রূপান্তর চেয়েছিলাম। শেষ মেষ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বাংলাদেশ হয়ে ভারতীয় উপনিবেশ হয়েছে। কিছুই তো বদলায়নি।

তো কী করলেন আপনি শেখ মুজিবুর রহমানকে? আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বানানো হোল একটা মাইনর মফস্বলের লিডার। আন্তর্জাতিক রাজনীতির তাৎপর্যের দিক থেকে হু ইজ হি? হি ইজ নোবডি। আপনি তাকে ‘বঙ্গবন্ধু' পর্যন্ত করলেন। কিন্তু আমরা তো ‘বঙ্গ’ না। আমরা তো খণ্ডিত বাংলা। টুকরা বাংলা। মুসলমানদের বাংলা। বঙ্গ তো বিশাল ব্যাপার। সেটা সৈয়দ সুলতানের বাংলা। কিম্বা আলাউদ্দিন হোসেন শাহের স্বাধীন বঙ্গ। বঙ্গ এই প্রথমবার একাত্তরে নতুন স্বাধীন হয় নাই। সে স্বাধীন ছিল, কিন্তু সে স্বাধীনতা হারিয়েছে ইংরেজ আমলে। ইট’স অ্যান এ্যামপায়ার। সে এ্যামপায়ার হওয়ার যোগ্যতা তো আমাদের ছিলো। যারা ভাঙলো, তাদের তো ইতিহাস দিয়ে আপনাকে চিনে নিতে হবে এবং চিনিয়ে দিতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। এটা তো আমাদের বুঝতে হবে, কেন এটা ভাঙলো!

তাহলে তখনকার খাঁটি বিপ্লবীদের, যাদের ‘নকশাল’ বলেন আর যাই বলেন, কমবেশী এটাই ছিল বাংলাদেশী নকশালের অবস্থান। তাদের প্রধান রাজনৈতিক ধারা। তাদের মধ্যেও ভেদ ছিল, দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু আপনি এই ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে না পারলে, বাকি খুচরা জিনিস বুঝে তো লাভ নাই। যেমন, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দুই কুকুরের লড়াই বলেছে; নকশাল মানে তারা গলা কাটে, নকশাল মানে তারা এই করে সেই করে...। এগুলা হচ্ছে প্রোপ্যাগান্ডা। আপনি এখানে এখন ইসলামিক ফোবিয়া যেমন, মোল্লারা এটা করে, ওটা করে। এটাও একই অর্থে সেই রকম প্রোপাগান্ডা। নকশালীদের বূত বানাতেই হবে, নইলে দিল্লীর গোলামি করবেন কিভাবে?

এখন আমাদের বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের এই পলিটিকসটা ফেইল করেছে। এই বৃহৎ রাজনৈতিক স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছে। হিস্ট্রিতে তো ভিলেন এবং হিরোর সীমারেখা খুব ক্ষীণ। আপনি যখন পরাজিত, তখন আপনি পরাজিত। ফলে আপনাকে সেই পরাজয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে আবার ফিরে আসতে হচ্ছে। আপনি বুঝতে পারছেন আপনার স্বপ্ন মিথ্যা না। কিন্তু তা বাস্তবায়িত করবার জন্য যে কাজ করা দরকার ছিল, আপনি সেটা করেন নি। ভেবেছেন সশস্ত্র সংগ্রাম দিয়ে বিশ্ব জয় করে নেবেন। চিন্তা ও পর্যালোচনাকে গুরুত্ব দেন নি। হেরে গিয়েছেন। তাই চিন্তা ও পর্যালোচনার রাজ্যে অধিপতি হয়ে আপনাকে আবার ফিরে আসতে হবে। তো এখন এই হচ্ছে পরিস্থিতি।

ফলে আমাকে আমার রাজনীতি সম্পর্কে বললে এভাবে বলতে হচ্ছে। না বললে আপনি ভালো বুঝবেন না। আপনাকে বুঝতে হবে হুইচ ইজ ট্রু। আর হ্যাঁ, আমি আলবৎ মার্কসের অনুসারী, মার্কসের নিষ্ঠাবান ছাত্র। তাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু মার্কস পয়গম্বর না। তার কাছে এসে জ্ঞানচর্চা থেমে যায় নি।

আর আমি সর্বহারা পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমি ছিলাম শুরুর দিকে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনে। যেখান থেকে সর্বহারা পার্টি হয়েছে। পরবর্তীতে সর্বহারা পার্টির সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিলো। হুইচ ইজ ট্রু। এদের বহু লিফলেটে যে তাত্ত্বিক কথাবার্তা সেগুলো লিখবার ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা আছে। কিম্বা সেইসব আমার লেখা বা চিন্তা থেকে সারার্থ করা। পরবর্তীকালে সর্বহারা পার্টি যে ধারায় রাজনৈতিক সংগ্রামকে নিয়ে যায়, মানে গণবিচ্ছিন্নভাবে হত্যার যে রাজনীতি, সেটা আমি কখনোই সাপোর্ট করিনি। আমি গণবিচ্ছিন্ন গোপন সামরিক লাইনে বিশ্বাস করি না। রাজনীতি একান্তই গণতৎপরতা যেখানে চিন্তা ও চিন্তার প্রচার প্রধান ভূমিকা রাখে। জনগণের সংগঠিত ও সামষ্টিক ইচ্ছার অভিপ্রকাশ হিশাবেই গণঅভ্যূত্থান ঘটে। আমি সারা জীবন তারই বন্দনা করে এসেছি।

আজকের পত্রিকা: আপনি তো তারপরে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়ে আসলেন। এসে মাওবাদী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার একটা চেষ্টা করেছিলেন। সেটা কি খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে?

হ্যাঁ, এখনও 'একত্র'করছি। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণকে একত্র করা। যদিও ‘মাওবাদী’ বলতে কিছু নাই বাংলাদেশে এখন। কিন্তু মাও জে দং ইতিহাসে মজুদ রয়ে গিয়েছেন। মাওবাদের বৈশিষ্ট্যসূচক দিক কী? সেটা হচ্ছে ‘মাস লাইন’ বা গণলাইন যা জনগণ থেকে কখনই বিচ্ছিন্ন হতে রাজি না। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পেটি বুর্জোয়া যে শ্রেণি নিজেদের বামপন্থি বলে এবং তত্ত্ববাগীশ হয়ে জনগণের কাছ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে, নিজের মনগড়া তত্ত্ব নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখে, সেই রাজনীতি আমি করি না। মতাদর্শিক ভাবে যেমন দেখুন, তাদের ইসলাম আতঙ্ক, ইসলাম বিদ্বেষ কিংবা ইসলাম নির্মূল করার রাজনীতি এগুলা সবই তাদেরকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। মাওবাদীরা ধর্ম সম্পর্কে মার্কসের ক্রিটিক অ্যাকসেপ্ট করে। সেটা নাস্তিক্যবাদ না। ‘মোকাবিলা’ বইতে আমি যা ব্যাখ্যা করেছি। কিন্তু কৌশলগতভাবেও তারা ধর্মের প্রশ্ন মীমাংসার ক্ষেত্রে পেটি বুর্জোয়াদের সঙ্গে এগ্রি করে না। ধর্ম বিদ্বেষ আধুনিক যুগের অসুখ।

আমি সহজ করে বুঝিয়ে বলি। সবচেয়ে বড় ক্রিশ্চিয়ান হচ্ছে রুশরা। আপনি কি লেনিনের কোন লেখায় খ্রিস্ট ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো লেখা পাবেন? এটা অবশ্যই পলিটিকাল কারণে। আপনি একজন শ্রমিক। আপনি একটা ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হতেই পারেন। আর আপনি যদি জালিমের বিরুদ্ধে গণসংগ্রামের মধ্য দিয়ে যান তাহলে আপনার অভিজ্ঞতাই আপনাকে ধর্মের পর্যালোচনার সঠিক পথ বাতলিয়ে দেবে। কিন্তু বাংলাদেশে পেটি বুর্জোয়া প্রথমেই জনগণকে শত্রু পরিগণনা করে। কেন? কারণ তারা মুসলমান। তারা আর এস এস বা নরেন্দ্র মোদীর উপমহাদেশ থেকে ইসলাম নির্মূলের রাজনীতি সক্রিয় ভাবে করে।

আরে! ইসলামের নিশ্চয়ই ভালো কিছু আছে নইলে বর্ণাশ্রম জাতপাত থুয়ে আমাদের পূর্বপুরুষ এই ধর্ম গ্রহণ করলো কেন? কিন্তু ধর্ম বিদ্বেষের কারণে তথাকথিত বাম পেটিবুর্জায়া ক্লাউন হয়ে যাচ্ছে, খামাখা হেফাজতের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া যাইতেছে, মোল্লাদের টুপিকোর্তা কিম্বা মেয়েদের হিজাবের বিরুদ্ধে লড়াই করতেছে। তো পিপল আপনাকে একসেপ্ট কেন করবে? তারা তো ধরেই নিবে আপনি তাদের এনিমি। আপনি জনগণের সঙ্গে থেকে লড়ুন। জনগণ বুঝে যাবে কে ধর্মকে শোষণের জন্য আর কে গণমুক্তির জন্য ধর্মের তফসির করছে? তারা মওলানা ভাসানী আর শফি হুজুরকে একই নিক্তি দিয়ে মাপবে না। এটাই গণলাইন। গণ লাইনের রাজনীতি।

অতএব মাওয়ের 'গণলাইন', এটা তো আমি অ্যাকসেপ্ট করি। আমি যখন রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করি। আমার তো ফিলোসফার একটা রূপ আছে, আমার একটা কবি রূপ আছে। পলিটিক্যালি আমি যখন রোল প্লে করি তখন তো আমি ডেফিনিটলি মাও এর কাছে থেকে, চীনা বিপ্লব থেকে, রুশ বিপ্লব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই আমি কাজ করি।

প্রশ্ন: এখনো কি আপনার সেই চেষ্টা চালু আছে কিনা এটাই জানতে চাচ্ছিলাম।

এটা তো আমার স্বভাবের মধ্যেই বর্তমান। শেষ নিঃশ্বাস অবধি থাকবে। না, আমি তো ডেফিনিটলি মাসলাইনকে কবুল করে কাজ করি। এখন দেখুন, আমি বারবার বলি যে বাংলাদেশে বিভাজিত রাজনীতির আমি বিপক্ষে। গণলাইন এই ক্ষেত্রে আস্তিক-নাস্তিক, ধর্ম প্রাণ ধর্ম ভীরু সকলকেই ফ্যাসিস্ট সরকার ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করবার রাজনীতি। এটাই আমাদের এখনকার বাস্তবতা। এর মীমাংসা সবার আগে করতে হবে। জনগণকে আপনি ধর্ম বনাম ধর্ম বিরোধিতা, বাঙালি জাতি বনাম জাতি বিদ্বেষ, যে কোনোভাবে আপনি বিভাজন করেন না কেন, আমি তো তার বিরোধী। মাস পিপলকে, জনগণকে তো আমাদের একটা জায়গায় একত্র করতে হবে। আনতে হলে তো আমাকে নিঃসন্দেহে একটা নীতি এবং কৌশল কার্যকর করতে হবে। বলতে পারেন কাজটা কঠিন। কেন কঠিন?

প্রথমত, দেখুন, আগে আপনি জনগণকে উদাহরণ দিতে পারতেন সোভিয়েত ইউনিয়ন আছে, চীন আছে আপনার সামনে, কিন্তু সেই উদাহরণ তো আর নাই। আপনি কোন মডেল দেখিয়ে জনগণকে কাছে ভিড়াতে পারবেন না। সেটা ভাল। খুবই ভাল। আপনাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে আপনার আদর্শ, আপনার চিন্তা, আপনার ফিলোসফিকাল প্রশ্নগুলো, জিজ্ঞাসাগুলোকে নতুনভাবে সাজাতে হচ্ছে, নতুনভাবে উত্তর দিতে হচ্ছে। যেটা আমি আমার লেখাতে ক্ষুদ্রভাবে চেষ্টা করি। আমাদের দার্শনিক জিজ্ঞাসাগুলো বর্তমানকালে কী আমাদের কাছে, সেটা যথাসাধ্য বোঝাবার চেষ্টা করি।

দ্বিতীয়ত, পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের সময়ে পুরানা জাতিবাদ ইমপসিবল, পুঁজির তৈরি বিশ্বে তীব্র প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কা্রণে নানান কিসিমের আত্মপরিচয়ের রাজনীতি দানা বাঁধছে। নারীবাদ, সমাকামিদের লড়াই, রাষ্ট্রহীন শরণার্থিদের প্রশ্ন, পুঁজি ও ক্রিয়েটিভিটির দ্বন্দ। ইত্যাদি; কারণ মানুষ ক্রিয়েটিভ কিছু করলেই সেটা তৎক্ষণাৎ পণ্য হয়ে ওঠে, শ্রেণি রাজনীতির পুরানা তর্ক বিমূর্ত ও অস্পষ্ট হয়ে আছে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নবিদ্ধ। তালিকা বিশাল। ফলে রাজনীতি বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা এখন প্রাচীন বা তামাদি হয়ে গিয়েছে, বাস্তবতার সম্পূর্ণ বদল ঘটেছে। এটা আগামী দিনে বাংলাদেশে আরও ক্রমশ স্পষ্ট হবে। তাই আমি মনে করি সেদিক থেকে আমার কিছুটা অবদান থাকতে পারে। কারণ বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের রাজনীতিতে ক্ষুদ্র হলেও আমার একটা উপস্থিতি আছে, আমাকে এড়িয়ে, টপকে কেউই যেতে পারছেন না। যতই বলেন না কেন! আমরা বলতাম,বাংলাদেশে কোনো বিপ্লব হলে আমাকে মোহাম্মদপুরে রেখে কেউ কিছু করতে পারবেন না। হা হা হা।

প্রশ্ন: এই প্রসঙ্গে আরেকটু টানি, ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে আনসার বিদ্রোহের পক্ষে লিখে আপনি কারাবরণ করেছিলেন। এমন কী বিএনপির ডানঘেঁষা রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন আপনি। নিজের কলামে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে জামাত ও আওয়ামী লীগের আঁতাত কটাক্ষ করেছেন আপনি। কিন্তু অনেকেই বলে, আপনি ইসলাম বিপ্লব সমর্থন করেন?

অনেকের কথা বাদ দিন। আপনি কী মনে করেন সেটা বলুন। 'অনেকে বলে' ধরনের কথা খুব খারাপ। এভাবে জিজ্ঞাসা করলে আমি বলবো না।

প্রশ্ন: আচ্ছা, তাহলে আমি ডিরেক্টলি জিগ্যেস করি, আপনি কি ইসলাম বিপ্লবের কোনো স্বপ্ন দেখেন?

আমি অবশ্যই বর্তমান ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার বিপরীতে গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে বৈপ্লবিক রূপান্তরের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু সেটা ইসলামি হবে, নাকি বাঙালি হবে, নাকি অন্য কিছু সেটা আমাদের ইতিহাস ও বাস্তব অবস্থাই নির্ণয় করে দেবে। ইরানের বিপ্লব ইরানের বাস্তবতা অনুযায়ীই হয়েছে। আমাদের বাস্তবতা অনুযায়ী আমাদের বিপ্লবও হবে। কসম বিপ্লবের, আমি এই স্বপ্নটাই দেখি।

কিন্তু আপনার প্রশ্নের অর্থটা কী? আপনি কি ফ্যাসিজমের পক্ষের লোক। আপনি কি আওয়ামী লীগের দালাল, আপনি কি ইসলাম বিদ্বেষী? যদি ইসলামি বিপ্লবও হয়, অসুবিধা কি? ইরানের বিপ্লব ফরাসি বিপ্লবের মতোই মানবেতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

প্রশ্ন: না, মোটেও না।

তাহলে কেন আপনি ইসলাম নিয়ে চিন্তিত হচ্ছেন। কই? খ্রিস্টান ধর্ম নিয়ে তো আপনি চিন্তিত না, অথচ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত খ্রিস্টিয় জগতেই আপনি বাস করছেন। আপনার চিন্তা, চলাফেরা পোশাক আশাক সবই। ধর্মের প্রশ্ন তো পিপল বা জনগণ ঠিক করবে। যাতে আমরা বিপ্লবী ভাষায় বলতে পারি, ‘উই দ্য পিপল’ বা ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ...’, ইত্যাদি। কিন্তু আপনি ইসলাম নিয়ে এতো ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? মানে আমরা শুধু ইসলাম নিয়ে এতো উৎকন্ঠিত কেন? ইসলাম সম্পর্কে আমার ক্রিটিক, আমার লেখা পড়েন, আপনি। নিজেকে বুঝবেন।

প্রথম কথা হচ্ছে আপনি রেসিস্ট হবেন না। আমরা বর্ণবাদী হবো না। অবস্থা ভেদে যে কোন ধর্মের ভাল কিম্বা মন্দ ভূমিকা থাকতে পারে। বিভিন্ন বাস্তব পরিস্থিতে ধর্মের ভূমিকাও আলাদা হয়। আমাদের এখনকার ‘কী ওয়ার্ড’ হচ্ছে জালিম ও মজলুম। ধর্ম মজলুমের পক্ষে বয়ান দিচ্ছে, নাকি জালিমের হাতিয়ার হচ্ছে। এটাই তো বিবেচ্য। নাকি?

কিন্তু বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা খুবই বিতিকিচ্ছি জিনিস। বাঙালি মুসলমান কী পরিমাণ সহনশীল, আমাদের কোন ধারণা নাই। দেখেন, আপনি দাবি করছেন যে আপনি টিপ পরবেন। বাঙালি মুসলমান তো বলেনি টিপ পরবেন না। বলেছিলো? কখনো বলেনি। বাঙালি মুসলমানের সহনশীলতায় আমি বিস্মিত হই।

এটা কিন্তু সংস্কৃতি। হিন্দু বাঙালির। বেশ। অতএব হিন্দুর সংস্কৃতি বাঙালিরই সংস্কৃতি। টিপ পরা অতএব বাঙালি সংস্কৃতি। কিন্তু আপনি হিজাবে এত আপত্তি করেন কেন? বাঙালি মুসলমান মেয়ে তো হিজাব পরতেই পারে। আপনি বাঙালি মুসলমান মেয়ে হয়ে যদি টিপকে বাঙালি সংস্কৃতি হিসাবে গ্রহণ করেন, তাহলে হিজাব তো হিন্দু মেয়েও পরতে পারে। হিন্দু বাঙালির সংস্কৃতিকে সকলের সংস্কৃতি করতে আপনার আগ্রহের অবধি নাই, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি গ্রহণে আপনার অসুবিধা। কেন? মুসলমান মেয়েকে যদি টিপ পরাতে পারেন, তাহলে হিন্দু মেয়েদেরও হিজাব পরাতে শেখান।

তো তাহলে এই যে বর্ণবাদ এবং রেসিজমটা রয়ে গেছে সমাজের মধ্যে, এর বিরুদ্ধে লড়ুন না। এই লড়াইয়ের সঙ্গে তো ইসলামের সম্পর্ক নাই। কিন্তু যেহেতু আপনি এটা এগ্রি করতে চান না, বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিকে বাঙালির সংস্কৃতি বলে মানতে চান না, হিন্দু বাঙালির সংস্কৃতিকেই একমাত্র বাঙালি সংস্কৃতি বলে মানেন, তখন প্রশ্নটাই সাম্প্রদায়িক হয়ে যায়।

তখন কী প্রশ্ন তৈরি হয়? আপনি কি ইসলামের পক্ষে না বিপক্ষে? আপনি কি ইসলামি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন নাকি দেখেন না? হোয়াট ডাজ ইট মিন? মূল প্রশ্ন তো এটা না। এটা তো ইসলামের পক্ষে বিপক্ষে ব্যাপার না।

আপনি বাঙালি মুসলমান, আপনি হাওয়ায় এখানে গজান নি। ফলে বাঙালি মুসলমান হিশাবে বাঙালি সংস্কৃতির উচ্চ বর্ণের হিন্দুয়ানির চরিত্রে রূপান্তর ঘটিয়ে আপনি কিভাবে তাকে সকল বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য করবেন, সেটা একটা জিজ্ঞাসা হতে পারে। বিপ্লবে ইসলামের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন হতে পারে। তো সেটা করুন। আমি যা করি।

বাংলাদেশের বিপ্লবে এবং উপমহাদেশের ইতিবাচক রূপান্তরের ক্ষেত্রে আপনার কী দেবার আছে সেটাই বাঙালি মুসলমানের মূল কথা, যদি নিজেকে কংক্রিট ইতিহাসে স্থাপন করে আপনি ভাবেন, তখন আপনি পথ খুঁজে পাবেন। দেখুন, আমরা আল্লাহর সঙ্গে চুক্তি করে মুসলমান হয়ে জন্মলাভ করি নি। কিন্তু যখন হয়েছি, তখন নিজের লোকেশানে দাঁড়িয়েই আমাকে ভাবতে হবে। অন্যকেও লোকেশান জানান দিতে হবে স্মার্ট ফোনের মতো, হাইড করে লাভ নাই।

বাংলাদেশের এখনকার প্রশ্ন: আপনি একটা ফ্যাসিস্ট স্টেট চান নাকি আপনি একটি ডেমোক্রেটিক স্টেট চান। সো, ডেমোক্রেটিক স্টেট চাইলে কোন্‌ কোন্‌ জায়গায় আপনার সঙ্গে আমার ঐক্যমত হতে পারে, কিভাবে আমরা একটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি হতে পারি, কিভাবে পরস্পরের দায় ও অধিকার আমরা সাব্যস্ত করতে পারি সেইসব নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে হোয়াট ইজ পলিটিক্যাল কমিউনিটি? আপনার সঙ্গে আমার অনেক ক্ষেত্রে ডিফারেন্স থাকতে পারে। আমার সঙ্গে একজন ইসলামপন্থির ম্যালা ডিফারেন্স থাকতে পারে। কিন্তু তারা যদি আমার সঙ্গে একই পলিটিক্যাল কমিউনিটির মধ্যে বিলং করে তাহলে তার প্রতি আমার দায় এবং তার অধিকার আমাকে কবুল করতে হবে। একই রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির সদস্য হিশাবে আমরা এই কমিউনিটির মধ্যে পার্থক্য ও বৈচিত্র্য মানি। মানুষ গরুছাগল নয় যে আপনি ধরে বেঁধে তাদের একই গোয়ালে রাখবেন।

ফলে আপনি পরস্পরের সঙ্গে এনগেইজ করবেন কী করে, যাতে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির মধ্যে রাজনৈতিক বন্ধন দৃঢ় হয়? সেটা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু দেখুন আপনি কী করছেন? বাংলাদেশে আপনি মূলত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটা সিভিল ওয়ার, একটা গৃহযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ১৯৭১ সালে। আপনি সেই গৃহযুদ্ধের অংশ হয়ে থাকতে চাইছেন। ফলে আপনি ইসলাম প্রশ্নটা বারবার আনছেন। ইসলাম এদেশের মানুষের ধর্ম, এর মধ্যে ভাসানী আছে। সুফিরা আছে, পীরমুর্শিদ ইত্যাদি আছে। আপনি কি ভাসানীর বিরুদ্ধের লোক? না। তাহলে আপনি ইসলাম নিয়ে এত ব্যস্ত কেন? আপনি সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, কোরান-হাদিস সম্পর্কে আপনার কী বক্তব্য। আমি আপনি চাই বা না চাই লোকে কোরানহাদিস পড়বে। আল্লা রসুলে বিশ্বাস করা বাদ দেবে না। বলুন, ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে, যার নানান ধারা এবং নানান ফেরকা আছে, সে সম্পর্কে আপনার কী বক্তব্য? তাহলে আমি বলতে পারি, কংক্রিট উত্তর দিতে পারি। একজন চিন্তাশীল মানুষ হিশাবে এনগেইজ করতে পারি। বলুন, জামাত সম্পর্কে আপনার সুনির্দিষ্ট কী বক্তব্য। দ্যান,আই ক্যান টক অ্যাবাউট ইট। ইসলামি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখি কিনা সেটা তো খুব ক্লিশে প্রশ্ন হয়ে গেল।

কিন্তু ইসলামকে জেনারালাইজ কেন করি আমরা? আমি তো বাঙালি মুসলমান ঘরে জন্মগ্রহণ করা একটা ছেলে, আমি তো বিলং করি এই কমিউনিটির মধ্যে। আমি তো আমার পূর্ব পুরুষের ইতিহাস ধারণ করি। ১৮৫৭-এর ইংরেজের বিরুদ্ধে সিপাহিদের লড়াই তো অস্বীকার করি না, আমি তো হিস্ট্রির মধ্যে বিলং করি। ইংরেজের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ভূমিতে অধিকার বঞ্চিত কৃষকের লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই আমি বর্তমানে এসেছি। সাতচল্লিশে আমার বাবাদাদারা পাকিস্তান আন্দোলন করে ঠিক কাজ করেছেন বলে মনে করি। বালাকোটের যুদ্ধে অনেকে হেরে নোয়াখালিতে ইসলাম প্রচার করেছে। আমি সেই জায়গার লোক। এটা তো আমার হিস্ট্রি। এটা তো আমি ভুলে যাবো না। আমার হিস্ট্রি পড়বার যে পদ্ধতি সেটা আমার জন্ম, পরিবার এবং রাজনৈতিক জনগোষ্ঠিকে বাদ দিয়ে না।

প্রশ্ন: ফরহাদ ভাই। তাহলে এই ইসলামিক রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ইসলামকে নিয়ে নেতিবাচক ধারণা কেন মানুষের মধ্যে কাজ করে?

মানুষের মধ্যে না তো। মধ্যবিত্ত একটা অংশের মধ্যে। যদি আসলেই বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ইসলাম নিয়ে নেতিবাচক ধারণা থাকত তাহলে একাত্তরের পর এতো ইসলাম এতো মুসলমান এলো কোত্থেকে?

কেন মধ্যবিত্ত একটা শ্রেণির মধ্যে নেতিবাচক ধারণা কাজ করে?

প্রথমত তারা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ। উচ্চবর্ণের বাঙালি হিন্দুর বাঙালিপনা থেকে তারা ইসলামবিদ্বেষটা সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করেছে।

দ্বিতীয়ত এই বিদ্বেষ গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর পলিটিকসের অংশ। মানে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যে অনন্ত যুদ্ধ চালাচ্ছে, তার অংশ। শুনেন, একটা কুকুরকে মারতে হলে তাকে ‘কুত্তা’ বলতে হয়। আপনি মারতে পারবেন ‘কুত্তা’ না বললে? তাহলে আপনাকে যদি আমি খারাপ না বলি, মুসলমানদের জঙ্গি বর্বর না বলতে থাকি, আপনি কি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চালাতে পারতেন তেলের জন্যে?

তাহলে এই কাণ্ডজ্ঞানটুকু বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির নাই কেন? তার কারন আমাদের বুঝতে হবে। এটাই প্রশ্ন। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা ইসলামকে নেতিবাচক ভাবে ভাবা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না, তারা অ্যাসেনশিয়ালি ওয়ার অন টেররের লোকাল ছানাপোনা। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের স্থানীয় বরকন্দাজ এবং একই সঙ্গে দিল্লির ছানাপোনা। হিন্দুত্ববাদীরা এই যুদ্ধকে নিজ দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা লাগাতে, গরু খায় বলে পিটিয়ে মারতে এবং উপমহাদেশের ইতিহাস থেকে ইসলাম নির্মূল করবার কাজে নেমে পড়েছে। স্থানীয় বরকন্দাজ এবং তাদের সহযোগীদের জন্য এটা ভাল সুযোগ। একটা সিভিল ওয়ার তারা কন্টিনিউ করে চলেছে বাংলাদেশে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটা ছোট অংশ কেন এটা পারছে? কারন তারা মহা শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় তারা এই যুদ্ধটা চালাতে পারছে। নইলে তারা অত্যন্ত ক্ষুদ্র। তারা পিপলকে রিপ্রেজেন্ট করে না।

ফলে তারই প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে এক ধরনের ইসলামাইজেশন ঘটছে। যেটা নট নিসেসারিলি পজিটিভ সবক্ষেত্রে। উৎকন্ঠা এখানে। যেহেতু ওদেরকে নেতৃত্ব দেবার, ওদেরকে পথ করে দেবার যে কাজগুলি করার দরকার ছিলো ওই কাজগুলি আমরা করছি না। ওদের তাহলে ছেড়ে দিচ্ছি আমরা কার হাতে? সেই সব লোকের হাতে যারা আন্তর্জাতিক বিশ্ব বা যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে বিভিন্ন শক্তি নিজ নিজ স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করতে পারছে। দোষটা তো আমাদের। আমরাই তো ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে ওদের মতো করে ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে দিয়েছি। এরা তো ডেফিনিটলি জনগণের মিত্র না। জনগণ ভুল লোকের হাতে জিম্মি হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না।

তো আমরা দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে গিয়েছি। এটাতো সহজ কাজ না। আমার কাজটা যদি মনে করেন, এটা মোটেও সহজ না। আমাকে নিঃসন্দেহে সরলার্থে সাধারন মানুষের পক্ষের লোক ভাবতে পারেন। আমি আমার কমিউনিটি অর্থাৎ আমি যে কমিউনিটির মধ্যে বাস করি, যারা আমার গরিব মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, যারা এখান থেকে চাকরি না পেয়ে উৎখাত হয়ে মরে, সমুদ্রে গিয়ে মরে, মালয়েশিয়ায় গিয়ে মরে, সৌদি আরবে মরে, তাদেরই লোক। এরাই তো আমার কমিউনিটি। এমনকি পেটি বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত আমার কমিউনিটি, ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে যাদের কোন ধারনা নাই, আগ্রহও নাই। তাদেরও তো আমি বাদ দিতে পারি না। তাদেরকেও আমার শেখাতে হচ্ছে। তাদের বলদামি দেখিয়ে দিতে হচ্ছে। আমি জিতছি বলেই মনে হয়!

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইসলাম বিদ্বেষী জাতিবাদী মধ্যবিত্ত আমার কমিউনিটি না। এরা ধর্মের জায়গায় জাতিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। নাগরিক দায় ও অধিকার এদের কাছে গৌণ, উচ্চ বর্ণের হিন্দুর তৈরি ‘বাঙালি জাতি’র বাইরে আর কোন নাগরিকের অধিকার তারা মানে না। এরাই তো আমার এনিমি। আমার ক্লাস এনিমি, গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষের শত্রু, অন্যদিকে বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক লড়াই-সংগ্রামের দিক থেকেও আমার শত্রু, কারন তারা ইতিহাস মানে না, ইতিহাস থেকে শিক্ষাও নেয় না। এদের সঙ্গে তো আমার বিরোধ হবেই। এই বিরোধিতায় আমি আনন্দিত এবং গর্বিত যে, দ্যা টেক মি সিরিয়াসলি। কারণ আমি ওদের জন্য সবচেয়ে বড় পলিটিক্যাল এবং ফিলোসফিকাল চ্যালেঞ্জ। আমি যদি খালি আল মাহমুদ হতাম, আমাকে যদি আল মাহমুদ বানাতো পারতো, তাহলে ওরা খুব খুশি হয়ে যেত। ওদের কোনো সমস্যা থাকতো না। হয়তো এতোদিনে আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক বা জাতীয় পুরস্কার পেয়ে যেতাম।

কিন্তু আমাকে আল মাহমুদ বানানো যাচ্ছে না। এটা তাদের খুব দুর্ভাগ্য। এজন্য খুব কষ্ট পায় ওরা। কেন যে আমার বিরুদ্ধে এতো প্রপাগান্ডার পরও আমাকে আল মাহমুদ বানাতে পারছে না, তার জন্য এরা ক্ষুব্ধ।

ডেফিনিটলি আমার ইসলাম নিয়ে অনেক পঠন পাঠন আছে। ইসলামীদের পঠন পাঠন আমার পঠন পাঠন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমি মার্কসের ক্রিটিক অব রিলিজিয়ন সম্পর্কে অবহিত। হেগেল যেমন ক্রিশ্চিয়ানিটির ক্রিটিক করেছেন সেটা আমি থরোলি জানি। ফলে আমি মনে করি ইসলামের একটা ক্রিটিক দরকার। এটা হয় নাই। এটা যে শুধু আমাদের দেশে হয় নাই তা না। ইসলামী জগতে হয় নাই। ফলে ইসলাম একটা থিওলজিকাল জগতে পড়ে আছে। আপনাকে সেই থিওলজিকাল জগৎ অতিক্রম করে একটা প্রজ্ঞার জগৎ অর্থাৎ দার্শনিক জগতে প্রবেশ করতে হবে। আমার ভূমিকা সুনির্দিষ্ট ভাবে এই জায়গায়। এই প্রজ্ঞা অর্জন করতে গিয়ে আপনারা যদি আমাকে ইসলামিস্ট বলেন, হেনতেন বলেন এগুলা পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছুই না। একটা সুবিধা আছে, আমি ইসলামিস্টদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠি।

প্রশ্ন: আপনি একটু আগে যে বললেন, ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ারের সহায়তায় এখানে তারা যা করে সেটা করে যাইতে পারতেছে। কিন্তু এর আগে যে যখন বললাম বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রসঙ্গে যে, ইন্ডিয়ার কলোনি হয়ে থাকবে। তো আপনারা কী ওই মুহূর্তে মনে করতেছিলেন না এটা পাকিস্তানের কলোনি হয়ে আছে? আর তাছাড়া এটা যদি ভারতের কলোনিও হয়, আর তার মাধ্যমে আমরা সাংবিধানিকভাবে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র পাই তাতে ক্ষতিটা কী?

প্রথম কথা হলো,পাকিস্তান কী বাংলাদেশের জনগণ চাইছে না চায় নাই?

প্রশ্ন: চাইছে।

দ্বিতীয়ত আপনি কলোনি হয়ে থাকতে চাইতেই পারেন, সেই দিক থেকে তো আমরা দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে গেলাম। তৃতীয়ত ‘সাংবিধানিক রাষ্ট্র’ কথাটা ভালই বলেছেন, ব্রিটিশদেরও কলোনির শাসন চালাবার ‘সংবিধান” ও বিধিবিধান ছিল। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান তেমনই সংবিধান গণ্য করলে ঠিক আছে। আর আসলে, ঠিকই। কিন্তু যখন বলছেন, ভারতের কলোনি হয়ে থাকতে ‘ক্ষতি কী?’ তখন এর উত্তর কী দেবো?

পূর্ব পাকিস্তানকে তাহলে আপনি কলোনি বলছেন কেন? পূর্ব পাকিস্তানের জনগণই পাকিস্তান চেয়েছে, তারা নতুন জন্ম লাভ করা পাকিস্তানের সংবিধান রচনা করবার অধিকারী হয়ে নির্বাচন করেছে, নির্বাচিতও হয়েছে। সেটা ব্যর্থ হয়েছে বলেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে।

আমরা যে কোনো কলোনাইজেশনের বিপক্ষে। কারণ কলোনাইজেশনের আধুনিক ফর্ম হলো ক্যাপিটালিজম। ফলে যখনই আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ওপর থেকে পাকিস্তান ক্যাপিটালিস্ট রিলেশনস প্রোডাকশন ইন্ট্রোডিউজ করছে, কিন্তু একটা বুর্জোয়া ডেমোক্রেটিক স্টেট আমাদের হতে দিচ্ছে না, উলটা রাষ্ট্রশক্তি হিশাবে সামন্ত ক্ষমতা বহাল রাখছে। তাহলে তার সঙ্গে লড়াই করা কি একই সঙ্গে ‘কলোনি’ বা সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করা না? সো দ্যাটস হোয়াট উই হ্যাভ ডান।

তাহলে আমরা পাকিস্তানের কলোনি ছিলাম, আপনার এই প্রশ্নটাই তো ভিত্তিহীন। এটা বাঙালি জাতিবাদের জাতিবাদী বয়ান। তারা বলে, বাঙালি জাতি পাকিস্তানের কলোনি হয়ে আছে। অতএব আমাদের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। এর সঙ্গে আমাদের অবস্থান ভিন্ন। আমরা পাকিস্তানের কলোনি ছিলাম বলা ভুল হবে। তাছাড়া পাকিস্তান আন্দোলন আমরা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণই করেছে। তাহলে কিভাবে আমরা পাকিস্তানের ‘কলোনি’ ?

কিন্তু ভিন্ন অর্থে ‘কলোনি’ বা সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশীকরণের অধীনে পড়ে গিয়েছিলাম বলেই যুদ্ধ করেছি। পূর্ব পাকিস্তান ইসলামাবাদের কলোনি ছিল না।

প্রশ্ন: আপনারা বিগার সেন্সে অন্য এক কলোনির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, সেটাই তো বলতেছেন?

না, পুঁজির প্রান্তিক সমাজগুলোর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য লড়েছি, বাঙালি, পাঞ্জাবি, বালুচি ইত্যাদি প্রকার জাতিবাদী বিভাজন করি নি। এটা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ শ্রেণি ও নানান জাতিসত্তার সম্পর্কে রূপান্তরের লড়াই, গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার লড়াই। একটা হলো আপনি আর্থ-সামাজিক বা সাংবিধানিক ভাবে শাসিত আরেকটি পরাক্রমশালী দেশের অধীন, টোটালি আন্ডার দ্যা পলিটিক্যাল কন্ট্রোল। সেটা ঔপনিবেশিক পরাধীনতা। কিন্তু স্বাধীন ও সার্বভৌম পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক বিপ্লব চাওয়া একদমই আলাদা জিনিস। ভুলে যাবেন না, পাকিস্তান চেয়েছে বাঙালি মুসলমানরা।

প্রশ্ন: বাঙালি মুসলমানরা কি বাংলাদেশ চায়নি কখনো?

না। নট নেসেসারিলি। এভাবে প্রশ্ন করলে তো হবে না। আপনাকে হিস্ট্রিতে আসতে হবে। প্রথম কথা হচ্ছে ১৯৪৭ সালে বাঙালি মুসলিম কী চেয়েছে? ব্রিটিশরা এখানে যে প্রোপার্টি ব্যবস্থা, তাদেরকে জমি উৎখাত করে তাদের রায়তে পরিণত করা এবং হিন্দু জমিদার এবং হিন্দু মহাজনদের প্রতিষ্ঠিত করা, তার বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছে। ফলে এটা তো জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই।

তাছাড়া আপনি দেখবেন যে, ভারত ভাগ হওয়ার জন্য তো মুসলমান দায়ী না। এই যে লড়াইটা আমরা করলাম, বাংলাদেশে যখন জমির প্রশ্ন মীমাংসা হয়ে গেল ১৯৫৩ তে- বাংলাদেশ থেকে জমিদাররা চলে গেল। বাংলাদেশের জমিদারি তখন সর্বত্র ভাঙাভাবে পড়ে আছে। এটা আপনার জেনারেশনের বোঝা খুব মুশকিল হোয়াট ডাজ ইট মিন! তখন বাঙালি মুসলমানের সেকেন্ড পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেনটা কী? তার ল্যাংগুয়েজ, তার ভাষা। ফলে তারা ভাষা নিয়ে লড়াই করতে নেমে গেছে। কিন্তু ভাষা নিয়ে লড়াই করতে গিয়ে তো কেউ পাকিস্তান ভাঙতে বলে নাই। বাঙালি জাতিবাদীদের সঙ্গে আমাদের রাজনীতির পার্থক্য এখান থেকে শুরু, কথাটা এখান থেকে শুরু করলে বুঝবেন। আমাদের এখন শুধু জাতীবাদী হলে চলবে না। আমাদের এখন আরও গ্লোবাল হতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা তো অনেক বেশি গ্লোবাল।

ফরহাদ ভাই আমাদের কাছে কিংবা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইতিহাসটা কিন্তু অনেকটা বিকৃতভাবে প্রচার হচ্ছে। আমরা কিছু জানি, কিছু জানি না। এটা কিন্তু আপনাদের দায়িত্ব আমাদের কাছে ইতিহাসটা সুন্দর ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।

শুনেন, আমি তো ইতিহাসবিদ নই। তাছাড়া আমার জেনারেশানের বিপ্লবী তরুণদের ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই ডেড। কারে বলছেন ‘আপনারা’! আমরা বাই চান্স বাঁইচা আছি। হুইচ ইজ গুড। কিন্তু যদি বলেন আপনাদেরই দায়িত্ব, একথা বললে এটা ঠিক না। হ্যাঁ, আমরা ডেফিনিটলি, যেমন আপনি আসছেন আপনার সঙ্গে, আমি কথা বলছি। কিন্তু সেভেন্টি ওয়ানে লেফটের ভূমিকা সম্পর্কে বহু দলিল আমাদের হাতে নাই। তাই মৌখিক একটা কথা বললাম, লোকে বলবে আপনি এটা কিসের ভিত্তিতে বললেন? ইট বিকামস অ্যা ভেরি সিরিয়াস প্রব্লেম। হিস্ট্রির জন্যে যে একাডেমিক লেভেলে কষ্ট করা দরকার, আমাদের একাডেমিক লেভেলে তো এই কাজটা হয় নাই। আমি তো অ্যাকটিভিস্ট। অনেকগুলো কাজ একাডেমিশিয়ানরা করে। একটিভিস্টরা তা ব্যবহার করে। আমি তো একাডেমিশিয়ান হই নাই। কারণ একাডেমিশিয়ানদের নিরপেক্ষভাবে এই কাজটা করবার কথা। এদের কাজ দ্বারা আমাদের কাজ করাটা সহজ হয়।

আপনি তো ১৯৬৭ সালে ওষুধ শাস্ত্রে স্নাতক। তারপর আবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থশাস্ত্র থেকে পড়াশোনা করলেন। মেডিসিন থেকে ইকোনোমিক্স এই আগ্রহটা কীভাবে তৈরি হলো?

আগ্রহ সবসময় ছিলো। বরং অর্থশাস্ত্র পড়ার সুযোগ কী করে পেলাম সেটা বিস্ময়। সেখানে ‘মান্থলি রিভিউ’ একটা পত্রিকা আছে, আপনি হয়তো জানেন। তাদের উদ্যোগে মাঝে মধ্যে ছোট আলোচনা সভা হোত, আমি ওই বয়সে সেই সভার জন্য ছোট্ট একটা লেখা লিখেছিলাম। কী করে লিখেছিলাম বলতে পারবো না। লেখাটা ছিলো এ রকম ‘অনটলজিকাল রিডিং অন মার্ক্সিস্ট ক্যাপিটাল’। খুব বেশি বড় লেখা না। ১০-১৫ পাতার লেখা ছিলো। লেখাটার কপি আমার কাছে আর নাই। বিষয় ছিল, মার্কসের বই যদি আমি দর্শন আকারে পড়ি তাহলে কীভাবে পড়বো। তো আমি সেটা পড়লাম পাঠচক্রে বা ছোট আলোচনা সভায়। আমরা এখানে যেমন পাঠচক্র করি সে রকম। এক প্রফেসর ছিলেন তিনি এটা পড়লেন। পড়ে বললেন, হোয়াই ডোন্ট ইউ স্টাডি ইকোনোমিক্স। তিনি বললেন, তুমি আসো আমার সঙ্গে একটা সেমিস্টার করো আর জিআরই পরীক্ষা দাও। তো আমি চলে গেলাম। আমি দুই তিন মাসের মধ্যে খুব মজা পেলাম বটে, কিন্তু শুকনা দর্শন ভাল লাগল না। তখন আমি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে গেলাম পড়তে। গিয়ে একজন প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করে আগ্রহের কথা বললাম। আমি ইকনমিক্স প্লানিং পড়তে চাই। মনে মনে আশা বাংলাদেশে অচিরেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়ে যাচ্ছে। অতএব ইকনমিক প্লানিং দরকার হবে। প্রফেসরকে বললাম, আমি লিনিয়ার প্রোগ্রাম শিখতে চাই, তখন লিনিয়ার প্রোগ্রামের খুব সুনাম। তিনি শুনে বললেন, লিনিয়ার প্রোগ্রাম? আরে সেতো ‘গারবেজ ইন, গারবেজ আউট’।

আমার বিপ্লবী উত্তেজনা দেখে বললেন, তুমি এক কাজ করো, নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চে যাও। ওখানে ইউরোপ থেকে নামকরা প্রফেসররা এসেছেন, খুব নামকরা লোক এরা। ওখানে এডোয়ার্ড বুরস্টাইন নামে একজনকে পাবা, উনি হলেন ক্যাস্ট্রোর বন্ধু। তো সেই বন্ধু তোমাকে ট্যাকনিকাল প্রব্লেম অফ অ্যা সোশ্যালিস্ট স্টেট ভালো পড়াতে পারবে। তো গেলাম, ভালো লাগলো পড়তে। খারাপ লাগেনি। কিন্তু সেটাও একটু নীরস লাগলো আমার। যেহেতু আমার ফিলোসফিকাল মাইন্ড আছে একটা। মানে একেবারে নীরস অর্থনীতি ভালো লাগে না আমার। সেখানে হঠাৎ করে পেয়ে গেলাম টমাস ভিয়েটরিজকে। উনি দেখি ফিলোসফিকাল হিস্ট্রি পড়াচ্ছেন। হেগেলের। পড়তে গেলাম। তো এই হলো আমার দর্শন ও ইকোনোমিক্স পড়া...।

প্রশ্ন: ইকোনোমিক্স পড়ে বাংলাদেশে এ রকম একটা পরিস্থিতে ফিরে এসে কী মনে হয়েছিলো?

খুবই খারাপ লেগেছিলো। কারণ বাংলাদেশে তাহেরকে যখন ফাঁসি দিলো, তখন তো আমি ক্যাম্পেইন করছিলাম আমেরিকাতে তাহেরের পক্ষে। ফলে আমি তো হান্টেড ছিলাম। তো আমি ফিরতে পারছিলাম না। আমি ১৯৭৬ সালে একবার ফিরি কিন্তু আমাকে তাড়িয়ে দেয় গোয়েন্দারা। তখন এসে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তাহেরের জন্যে একটা গানের অনুষ্ঠানও করেছিলাম। তারপর গোয়েন্দারা বললেন আমাদের জেলে তো জায়গা টায়গা নাই। আপনি কেন করতেছেন এগুলা? আপনি চলে যান। পরে আমি চলে গেলাম। আমাকে পরে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলো ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। উনি ইউরোপে গিয়েছিলেন।

একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি, আপনার ‘অসময়ের নোটবই’ কবিতাটি আমার মনে হয় কখনো পুরোনো হবে না। আমি এই কবিতা নিয়ে আপনার কাছে শুনতে চাই।

থ্যাংক ইউ। কিন্তু আপনাকে এই ফাঁকে একটু বলি, আমার একটা ভালো কবিতার বই কিন্তু ‘অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারীমেশিন'। এর কারণটা হচ্ছে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি সবে মাত্র হচ্ছে। সেই কবিতা আমি যখন লিখি তখন আমার টার্গেট ছিলো ডেভেলপমেন্ট ইস্যু কবিতায় প্রকাশ করতে পারবো কিনা অ্যাজ অ্যা প্রোটেস্ট এবং অ্যাজ অ্যা ভবিষ্যৎ বাণী আকারে। আমার ধারণা যে ‘অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারীমেশিন’ অত্যন্ত ভালো বই। ফলে কর্পোরেশন বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিপক্ষে কাব্যিকভাবে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ ব্যাপারটা সবসময় ছিলো আমার কবিতার মধ্যে। ব্যাপারটা নতুন না। আর আপনি যেটা বলেছেন ‘অসময়ের নোটবই’ কবিতাটা কর্পোরেট কালচারের বিরুদ্ধে এক্সপ্লিসিটলি লেখা।

প্রশ্ন: আপনার গানের জীবন নিয়ে কিছু বলুন।


আমি তো গান লিখেছি অনেক। কিন্তু আপনারা হয়তো ওভাবে শুনেননি। একটা সঞ্জীব চৌধুরী গেয়েছিলো।


প্রশ্ন: সঞ্জীব চৌধুরী তো আপনার ‘এই নষ্ট শহরে’ গানটা গেয়েছিলেন...


হ্যাঁ, ও যখন আমার এখানে এসেছে ওই গানটা নিয়ে গিয়ে গেয়েছে।

প্রশ্ন: এই গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডে আপনি নিজেকে কতটা দার্শনিক হিসেবে দাবি করেন?

না। আমি তো নিজেকে দার্শনিক হিসেবে দাবি করি না। এটা তো আপনারা বলেন। আমার যেটা ভাল দিক সেটা এই যে চিন্তা করতে ভালো লাগে, চিন্তা করাটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি আমি তাই করি। আমি কি আমার কোনো লেখায় বলছি, আমি একজন দার্শনিক হৈয়া গেছি?

প্রশ্ন: আপনি একটু আগে বলছিলেন তরুণরা আপনাকে নীরব একটা সাপোর্ট দেয়। অসংখ্য তরুণ আপনাকে পছন্দ করে। আপনার কাছে আসে। কিন্তু আমি এটাও শুনেছি এদের মধ্যে অনেকের আবার আপনার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।

এই আলোচনাগুলো কি প্রাসঙ্গিক? এটি হচ্ছে আপনাদের সমস্যা। সিরিয়াস প্রব্লেম। ‘শোনা কথা’ নিয়ে ব্যস্ত। কারণ আমরা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আলোচনা করেছি। এখন আমি একটা সামাজিক, রাজনৈতিক মানুষ। আমার বিপক্ষ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষ আসবে যাবে। তাহলে আমি এটা কি হাওয়া থেকে উত্তর দিবো? যদি না জানি তারা কারা?

আমি বলতে চাচ্ছি মতের বিরোধ থাকতেই পারে কিন্তু আপনি হয়তো জানতে চাইছেন, এই ধরনের নেতিবাচক কথা আমাকে পীড়া দেয় কিনা?

প্রথম কথা হচ্ছে যে আমাকে কিচ্ছু পীড়া দেয় না। আমি পীড়িত লোক না। আমি দুঃস্বপ্নে ভুগি না। আমার কোনো দুঃস্বপ্ন নাই। আমি খুবই সুখী একজন মানুষ এবং আমি পেশাগত জীবনে খুব সফল একজন মানুষ। এমন নয় আমি শুধু লিখে গেছি। আপনি যে প্রতিষ্ঠানে বসে আছেন সেটা অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। ছোটোখাটো না। ফলে আমাকে বিশাল একটা প্রতিষ্ঠান চালাতে হয়েছে। আমার ব্যবস্থাপনা গুণেরও যথেষ্ট খ্যাতি আছে। ফলে এগুলো তো অপ্রাসঙ্গিক আমার জন্যে। আমার জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটাই যখন কোনো তরুণ সাবস্টেনটিভ কোনো পর্যালোচনা করে বা অবজার্ভেশন দেয় এইটা আমার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। সে যতই ছোট বা ক্ষুদ্র হোক না কেন। ফলে খেয়াল করলে দেখবেন ফেসবুকের একটা ক্ষুদ্র আলোচনার উত্তর দেই আমি। যত ব্যস্ততাই থাকুক, কোন তরুণের প্রশ্নকে যদি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি কিংবা ওর আকুতি, জানার আগ্রহটুকু আমি জেনুইন মনে করি, আমি উত্তর দিতে কক্ষনো দ্বিধা করি না। আমার ইনবক্সে প্রচুর পরিমাণে সারাক্ষণ এগুলা আসতে থাকে।

প্রশ্ন: বাংলায় দার্শনিক শব্দটা আগে কেমন ছিলো, এখন কেমন আছে আর ভবিষ্যতে কেমন থাকবে? শব্দটা এই মুহূর্তে কী মিন করে এই বাংলাদেশে?

বাংলায় দার্শনিক টার্মটা সংস্কৃত থেকে তৈরি শব্দ। বাংলায় এই শব্দ নাই। পাশ্চাত্যে ফিলোসফি মানে ‘ফিলো’ মানে ‘সোফিয়া’ বা জ্ঞানের জন্য ভালোবাসা। এর সঙ্গে কিন্তু ভালোবাসার সম্পর্ক, শত্রুর সম্পর্ক নাই। আর এখানে আমাদের পুরোনো যারা ভারতীয় দার্শনিক তাদের কাছে দর্শন কথাটার মানে হলো সত্য দর্শন করা। সত্য দেখা। এখন সত্য যখন আপনি প্রত্যক্ষ করছেন তাকে ডেমোনস্ট্রেট করতে হচ্ছে। সত্য 'প্রমাণ' করতে হচ্ছে আপনাকে। কীভাবে প্রমাণ করতে হচ্ছে? আপনাকে লিখে, যুক্তি দিয়ে দেখাতে হচ্ছে যে সত্য এই।

বাংলার ভাব শব্দ এসেছে ‘ভূ’ থেকে। ‘ভূ’ মানে হওয়া। অর্থাৎ সত্য আপনার বাইরের কিছু না। আপনাকেই সত্য হয়ে ঊঠতে হয়। আপনি যখন চিন্তার চর্চা করেন, আপনি নিজেই সত্য হয়ে ওঠেন। সত্য বলে আলাদা কিছু নাই। সত্য বলে এমন কিছু নাই যা জগতে আপনাকে আপনার বাইরে সন্ধান করতে হচ্ছে। সত্য হচ্ছে জীবন যাপন, জীবন চর্চা সমস্ত কিছুর সঙ্গে যুক্ত যেখানে আপনি স্বয়ং সত্য হয়ে ওঠেন। বাংলার ভাবজগতে একে ফকর লালন শাহের ভাষায় বলা হয় 'সচিদানন্দ রূপে পূর্ণব্রহ্ম' হওয়া। ইসলামি পরিভাষায় আমলের মধ্য দিয়ে আল্লার 'সিফাত' বা গুণাবলীর অধিকারী হয়ে ওঠা।

ভক্তি আন্দোলনটা ভাবের সঙ্গে যুক্ত, ‘ভূ’ বা সত্য হয়ে ওঠা। কারণ ভক্তি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আপনার আমল, আপনার ‘রুহানিয়াত’ বা চূড়ান্ত পরমা্র্থিক বিকাশের পথ ভক্তি। নদীয়ার ফকিরদের ভাষায় ‘দেল-কোরআন’ এর পাঠের মধ্য দিয়েই মানুষ সত্য হয়ে ওঠেন। হৃদয়বান মানুষের হৃদয়ের বাইরে সত্য বলে কিছু নাই।

‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’, অর্থাৎ সত্য কাজ আছে, কিন্তু সত্য পথ বলে কোনো পথ নাই। তো সত্য কাজ করতে কেউ রাজি না। কিন্তু সত্য পথ নিয়ে মারপিট করতে সবাই রাজি। আমি হিন্দু আমারটা সত্য, আমি মুসলমান আমারটা সত্য। এটা নিয়ে মারপিট করে মাথা ফাটাই দিচ্ছেন আপনি। কিন্তু মানুষ হিশাবে নিজের কাজটা ঠিক মতো করেন না।

'তুমি আমার গুরু তুমি লালন ফকির/এবং আমি লালন করছি তোমার দেহ/ পুষছি তোমার দৃষ্টি, তোমার দেহতত্ত্ব/অচিন পাখি, নভোজাহাজ/নিখিল/থেকে নিচ্ছি তুকে দেহের খাতায়/চারটে সময় চারটে ঘড়ির/যেন সময় ফস্কে না যায়/যেন আমি কাঁটায় কাঁটায় বলতে পারি- ‘আমিই হচ্ছি লালন ফকির।'- কতটুকু হৃদয়ে ধারণ করলে কেউ নিজেকে লালন ফকির বলতে পারেন? ফরহাদ মজহার লালন সাঁইকে কীভাবে ধারণ করেছেন কর্মে ও হৃদয়ে?

অনেক গভীর প্রশ্ন, দীর্ঘ উত্তর দাবি করে। লালন ও ভাবান্দোলন নিয়ে আমার লেখালিখিতে কিছু বুঝবেন। সংক্ষেপে এখানে ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করছি।

যখন এই পদ্যটি লিখছি তখন লালন আমার কাছে প্রধানত কবি, তখনও বাংলার ভাবান্দোলনের দার্শনিক ও রাজনৈতিক গভীরতা আমি টের পাই নি, লালনের গান টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যখন নদীয়ার ফকিরদের সঙ্গে মধ্যবিত্তসুলভ দ্বিধা, কুসংস্কার ও চাতুরি বাদ দিয়ে মেশামিশি শুরু করলাম, তখন ভাব, কাব্য এবং ‘করণ’ কিম্বা কর্মরূপের এক বিশাল জগতে্র সন্ধান পেয়ে ডুবে গেলাম। যিনি পথ দেখালেন তিনি একজন নিরক্ষর অতি সাধারণ মানুষ, আমার গুরু, ফকির লবান শাহ। তিনি ফকির কোকিল শাহের শিষ্য এবং কোকিল শাহ ছিলেন লালনের পালক পুত্র ভোলাই শাহের শিষ্য। এই হোল সিলসিলা। আমি লালনের ঘরের সন্তান হয়ে গেলাম। আমার নবজন্ম ঘটল।

ফকির লবান শাহ বলতেন লালনের ভাব, করণ ও রাজনীতি হীরার খণ্ডের মতো কিন্তু সেটা এক হাজামজা নোংরা গুয়ের পুকুরে ডুবে গিয়েছে। গাঁজা, সিদ্ধি নানান অনাচারের মধ্যে খাবি খাচ্ছে। লবান শাহ নিজেই আবার স্বীকার করে বলতেন, হীরার খণ্ড আছে, কিন্তু সেটা আসলে বা আদৌ আছে কিনা ময়লা পুকুরে ডুবুরি হয়ে খোঁজ করি নি, স্রেফ গুরুবাক্য শিরোধার্য গণ্য করে গুরুকর্তব্য করে যাচ্ছি।

আমি তখন বিদেশ থেকে ফিরে এসে, দর্শন বা ভাবুকতার নানান জিজ্ঞাসার ভারে কাতর। এই হীরারখণ্ডটা কেমন তার দ্যুতি একটু হলেও দেখতে ও বুঝতে হবে। সন্ধান করছিলাম পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের বাইরে চিন্তার এমন কোন রূপ আছে কিনা যা আমাদের নতুন ভাবে দুনিয়া গড়বার উপাদান জোগাতে সক্ষম, পাশ্চাত্য চিন্তার বাইরে দাঁড়িয়ে ভিন্ন অনুমান ও পাটাতন থেকে নতুন ভাবে ভাববার সক্ষমতা আমরা অর্জন করতে পারি কিনা, নতুন রাজনৈতিক দিশা নির্মাণ সম্ভব কিনা, ইত্যাদি। ফলে লালন ও নদিয়ার ফকিরী বা ভাবান্দোলন আমার কাছে নতুন চিন্তা ও রাজনীতি অনুসন্ধানের ক্ষেত্র হয়ে উঠল। লালনকে ‘হৃদয়ে ধারণ করা’ বলতে যে প্রশ্ন করেছেন, সেটা হয়ে উঠল পাশ্চাত্য চিন্তায় শিক্ষিত এক তরুণ এতোদিন যা শিখেছে তাকে প্রশ্ন করতে শেখা। পাশ্চাত্যই আমাদের একমাত্র পথ ও নিয়তি নয়, লালন আমাকে সেটা ভাবতে শিখিয়েছে।

একই সঙ্গে প্রাচ্য চিন্তার সব কিছু নির্বিচারে গ্রহণ করা যাবে না সেটাও শিখিয়েছেন। কেন? কারণ, ‘কর্তারূপের নাই অন্বেষণ, আত্মারে কি হয় নিরূপন, আত্মতত্ত্বে পায় শতধন সহজ সাধক জনে’। প্রাচ্য আমি কে? আমি কী? এই প্রকার আত্মতাত্ত্বিক জিজ্ঞাসার মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছে। আত্মতত্ত্ব জানতে গিয়ে অনেক সাধক অনেক ধন পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আসল কথা হচ্ছে সমাজে ও ইতিহাসে আমাদের নিজ নিজ কর্তারূপ নির্ণয় করা। কর্তারূপের অন্বেষণ বাদ দিয়ে 'আত্মারূপ' নিয়ে মগ্ন থাকলে মানবেতিহাস থমকে থাকবে। বিকশিত হবে না। নিত্যদিন নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, ‘মানবজন্মে এসে তুমি কী করিলে, কী করিলে কী করিলে?’

‘ভুলো নারে মন-রসনা
সমঝে করো বেচাকেনা
লালন বলে কুল পাবা না
এবার ঠকে গেলে’।।

তো আমার ঠকে যাবার কোন ইচ্ছা নাই।

লালন তাহলে একদমই নতুন কথা বলছেন, যাকে প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের বিভাজন দিয়ে বোঝা যাবে না। আমাদের প্রচলিত অনুমান ও ধ্যানধারণা মাথায় রেখে লালন একদমই বোঝা যাবে না। বাউলদের ডুগডুগি ও একতারার মধুর কোলাহল শোনা যাবে হয়তো, কিন্তু গুপি যন্ত্রের গবগবানি ছাড়া আর কিছুই কানে ঢুকবে না। অতএব ফাতরা বা বালখিল্য বাউলগিরি ছাড়তে হবে। গুরুর কাছ থেকে এই মোমের আলোটুকু পেয়ে আমি ঘোর অমানিশার মধ্যে হাঁটছি। পথের সন্ধানে। লালনকে এইভাবে আমি হৃদয়ে ধারণ করি। হীরার খণ্ডের একটুকরা আলো হৃদপিণ্ডে জ্বালিয়ে রাখি।

আপনি তো তরুণসম, মানে নিজেকে সমসাময়িক দেখতেই তো ভালোবাসেন। সমকালীন বাংলা সাহিত্য বা সাহিত্য যারা রচনা করেন (আপনিও এখনো এর মধ্যেই পড়েন) তাদের সম্পর্কে আপনার ধারণা বা অভিমত কী?

'তরুণসম’ না। আমি তরুণই বটে। আমি তো আমার চারপাশে তরুণ কম দেখি। ব্যাতিক্রম আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু চারদিকে যাদের দেখি এরা তো সব বৃদ্ধ। তারা তাদের সময়ে বাস করে না। বাস করতে শেখে নি।

‘সমকালীনতা’, ‘আধুনিকতা’ ইত্যাদিতে আমার আস্থা কম। বলতে পারেন আমি ভবিষ্যতবাদী। বর্তমানের মধ্যে অতীতকে নতুন করে আবিষ্কার করা, বোঝা এবং বর্তমানের মধ্যে ভবিষ্যতকে দেখাই আমার অগ্রাধিকার। লেখালিখি করছে যারা তাদের মধ্যে আমাদের জেনারেশানের মত বিপ্লবী সাহসের অভাব দেখি। নতুন ভাবে লিখবার, নতুন ভাবে চিন্তা করবার দুর্ধর্ষ সংকল্প নাই। মাঝে মধ্যে ফসফরাসের মতো ঝিলিক দিয়ে ওঠা আছে, কিন্তু স্থায়িত্ব নাই। এই অভাবের মধ্যেও তরুণদের মধ্যে যারা পাণ্ডিতের গাম্ভীর্য, তর্ক দ্বারা সত্য নির্ণয়ের চাতুরি, শ্লীলতা-নৈতিকতা-ভালোত্বের বাহাদুরিকে বোঝা গণ্য করে, এর বিরুদ্ধে যারা নিজেদের মতো লেখে তাদের ভালো লাগে। এদের কোন প্রকার ভাণ নাই। ভালো লাগে তাদের সরলতার জন্য।

ধরুন, ব্রাত্য রাইসু। বুঝতে পারি রাইসুর কুতর্ক কোত্থাও আমাদের নিচ্ছে না কিম্বা আদৌ নেবে কিনা জানি না। হয়তো আমরা কোথাও আসলে যাই না, এটাই রাইসু প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু বুঝতে পারি এই সময়ে প্রথাগত চিন্তার ব্যাকরণ ভেঙে ফেলা জরুরি কাজ। এর দরকার আছে।

কবিতার উদাহরণ দিলে সৈয়দ জামিল। অন্য আরও কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণ আছেন। কিন্তু জামিলের কথা আগে আসবে। জামিল শ্লীলতা-নৈতিকতা-ভালোত্বকে বুড়া আঙ্গুল দেখিয়ে চলেছে। জামিলের মতো ঝুঁকি নেবার হিম্মত কারো দেখি না। দর্শনের দিক থেকে দেখলে এটা জরুরি কাজও বটে। ও আগামিতে শুধু এই জায়গায় আবদ্ধ থাকবে আমি মনে করি না। কিন্তু ওর কবিতা পড়লেই প্রায়ই নীটশের On the Geneology of Morality বইয়ের পাতা আমার আবার উল্টিয়ে পড়বার সাধ হয়। আরও প্রতিভাবান অনেকেই আছে। অনেকের কবিতা আমি ভালবাসি।

প্রশ্ন: ‘আমার ঘরের একপাশে আয়তক্ষেত্র হইয়া বিছানাটি কী সুন্দর অঙ্কিত হইয়া আছে/বিছানা অবধি পোঁছাইতে সভ্যতাকে কত পথ পাড়ি দিতে হইয়াছিল একবার ভাবিয়া দেখো’ - এখনো কী সভ্যতা পাড়ি দিতে পেরেছি আমরা? কিংবা যেই অপেক্ষার কথা বলেছেন, সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে? মানে বিছানা বলেন,কিংবা ঘর,এখানে কি নিজস্বতা থাকে মানুষের? মানুষ কি পৃথিবীর কোনো বিছানা বা ঘরকেই নিজের একান্ত ব্যক্তিগত বলতে পারে?

সভ্য/অসভ্য বাইনারি মাথায় রেখে এই পদ্গুলো ব্যাখ্যা না করলেই ভালো। বাইনারি আমার চিন্তার অভ্যাস বা ব্যাকরণ না। নিজেকে সভ্য গণ্য করে অন্যকে অসভ্য বলার পেছনে আধিপত্য বিস্তার, এমনকি অপরকে নির্মূলের বাসনা কাজ করে।

‘অপেক্ষা’ খুবই মধুর একটি ধারণা। আমি তো অপেক্ষার অবসান হোক চাই না। মৃত্যু বা মৃত্যুর পর মাটির বিছানা মানুষের একান্তই ব্যাক্তিগত বিছানা।

‘কোথায় রবে এ ভাই বন্ধু পড়বে যেদিন কালের হাতে
কে তোমার আর যাবে সাথে”

আপনার ঘুম আপনাকেই ঘুমাতে হবে। আপনার সঙ্গে আর কেউই ঘুমাতে যাবে না। মৃত্যু একান্তই ব্যক্তিগত ঘটনা। আমার মৃত্যু অন্যে মরতে পারে না। যে কারণে মানুষের অস্তিত্বের তর্ক বারবারই মৃত্যুর বিপরীতে দাঁড়িয়ে তোলা হয়। একই সঙ্গে মৃত্যু ‘কাল’ বা সময় সংক্রান্ত তর্কের অন্তর্গত। সেটা আমাদের মুর্শিদী কিম্বা বাউল ফকিরদের গানে যেমন, তেমনি জর্মন দার্শনিক হেইডেগারের চিন্তাতেও।

ঘর? আপনি তো নিজের ঘরেই বাস করেন। সেটা আপনার নিজের শরীর। আপনি নিজেকে যখন ‘আমি’ বলেন, সেই ‘আমি’র বাস তো আপনার একান্তই ব্যক্তিগত শরীরে। তাই দেহকে জানা আমাদের প্রথম কর্তব্য। কিন্তু ঘরের খবর তো আমরা নেই না। দেহতত্ত্বের চর্চাকে আমরা বাউল ফকির তান্ত্রিকদের ব্যাপার মনে করি। তাই না? তাছাড়া 'দেহ'কে নেতিবাচক ভাবেও দেখি। জানি না কখন আমামদের হুঁশ হবে

প্রশ্ন: আমাদের সাহিত্য জগতে পুরুষ লেখক বা কবির তুলনায় নারীরা কেন সেভাবে দ্যূতি ছড়াতে পারছেন না? এর কারণ কী বলে আপনার মনে হয়? নারীকে সাহিত্যিক বা কবি ভাবতে না পারার অভ্যস্ততা? নাকি অন্য কোনো কারণ?

দ্যুতি ছড়াতে পারছে না কি আসলে? পারছে তো। ঠিক যে সামগ্রিক ভাবে পুরুষতন্ত্র নারীকে দাবিয়ে রাখতে চায়। ফলে নারীর দ্যুতিও আড়াল হয়ে যায়। সামাজিক শ্রম বিভাগও নারীদের পক্ষে না। কিন্তু সেইসব বাধা অতিক্রম করে নারী যখন কবি বা লেখক হবার সাধনা করে তার মধ্যে দ্যুতি তো দেখা যায়। পুরুষের তুলনায় নারীর লেখালিখি সহজ না। সমাজ নারীর জন্য অনুকুল পরিবেশ তৈরি করে না। সহজ কথাই ধরুন, পুরুষ যেখানে সেখানে যখন তখন সাহিত্যের আড্ডা জমাতে পারছে। নারী কি পারবে? পারবে না, কিম্বা তাকে করতে দেওয়াও হবে না।

তবে নারীদের লেখা পুরুষ লেখকদের মতো হলে আমাকে তা আকৃষ্ট করে না। পুরুষতন্ত্রেরই দাপট মনে হয়। নারীর অভিজ্ঞতা বুঝতে চাই আমি, যে অভিজ্ঞতা পুরুষের নাই, সেখানেই নারী দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তার দ্যুতি ঠিকরে পড়ে। অতএব নারীর নিজস্বতা ও দীপ্তি নারী হিশাবে তার বর্তমান থাকার মধ্যে। সেটা যখন সাহিত্যে আসে সেটা দ্যুতি ছড়ায়।

আমি নারীকে নারী হিশাবে দেখতে চাই, তা কিন্তু না, বরং পুরুষতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা ও চিন্তার রূপান্তর নারীর কাছ থেকেই আসবে মনে করি। নারীকে পুরুষ হয়ে উঠলে হবে না। সেটা পুরুষতান্ত্রিক হবে। অন্যদিকে পুরুষের বরং শ্রীচৈতন্যের মতো দরকার ‘রাধা ভাবে উপাসনা’, পুরুষের নারী হয়ে ওঠা। সেই উপাসনায় নারীকেই সাহিত্যের কর্তা হতে হবে, পুরুষকে অনুকরণ করলে কোন ফায়দা হবে না। বাংলার ভাবচর্চার সার কথাও হচ্ছে 'রাধা ভাবে উপাসনা' -- অর্থাৎ রাই বিনোদিনী শ্রীমতি রাধিকার মতো হওয়া, যাতে খোদ ঈশ্বর আবার গৌরাঙ্গ হয়ে আবার বঙ্গে মানুষের সঙ্গে 'লীলা' করতে আসেন। বাংলা দারুন। 'সংক্ষেপে সব বলিতে হয় ভাবনগরে'। পাশ্চাত্য একটি কথা বলতে লাইব্রেরির পর লাইব্রেরি লিখেছে। বাংলা একটা গানের কলির মধ্য দিয়ে কয়েক হাজার লাইব্রেরি এঁটে দিয়েছে।

প্রশ্ন: শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামির ঘটনার পেছনে আপনার ভূমিকা কী ছিল? লোকে কী বলে, সেগুলো উল্লেখ না করে সরাসরিই জানতে চাইলাম।

সরাসরি জানতে চাওয়া দোষের না, তবে মনে হয় আপনি কিছু প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। ধরে নিয়েছেন আমার বোধহয় কিছু ভূমিকা আছে। না আমার কোন ভূমিকা নাই। আমি অতিশয় ক্ষুদ্র মানুষ। এতো বড় ঘটনাকে প্রভাবিত করবার সামর্থ আমার কোথায়?

তবে ভূমিকা আছে বললে আমার খারাপ লাগে না। কারণ আমি তো রাজনীতিতে আমার চিন্তা ও বিশ্লেষণ দ্বারা ভূমিকা রাখতেই চাই। ভুমিকা রাখবার জন্য আমি ঘটনা ঘটাই না। আমার ঘটনা ঘটানোর প্রয়োজন পড়ে না। ঘটনা ঘটানো আমার কাজ না। ঘটনা তো ঘটছেই। ঘটবেই। বরং ঘটনাকে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিমুখে নিয়ে যাওয়াই আমার কাজ, ইতিহাস নির্মাণ আমার কাজ। সমাজের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে যা ঘটছে তার ইতিবাচক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোই লেখক হিশাবে আমার পেশা।

যে ঘটনা ঘটা অনিবার্য সেটা আমি আগাম বুঝতে পারি। কারণ আমি সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করি। আমি ভবিষ্যৎ টের পাই। ইন্টারনেট, ব্লগ, ফেইসবুক শাহবাগ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যে নতুন শহুরে পেটি বুর্জোয়া গড়ে উঠেছে সেটা বোঝা কঠিন কিছু ছিল না। প্রকট ধর্ম বিদ্বেষকে এরা ‘প্রগতিশীলতা’ গণ্য করে, বাঙালি জাতিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মিশ্রণ যে মূলত ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ সেটা জানে না, কিম্বা জানলেও অস্বীকার করে। ভূয়া ও বিমূর্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে এরা ‘প্রক্লেমেশান অব ইন্ডিপেন্ডেন্সে’র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এরা বিচারকে কোন বৈচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া অভিযুক্তকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া বোঝে। এরা ন্যায়বিচার চায় না, ফাঁসি চায়। ধর্ম নিরপেক্ষতাকে এরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত চরিত্র হিশাবে বোঝে না, বোঝে ইসলাম নির্মূলের মতাদর্শিক ঝাণ্ডা বা অস্ত্র হিশাবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানেই ধর্ম নিরপেক্ষ, তাকে আলাদা করে ধর্ম নিরপেক্ষ হতে হয় না। পাশ্চাত্যের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের স্থানীয় বরকন্দাজ ছাড়া তারা আর কোন ভূমিকাই রাখতে পারে না।

ফলে শহুরে পেটি বুর্জোয়া তরুণ বা ‘তরুণ প্রজন্ম’ নামক এই জিনিস জ্ঞানে বা অজ্ঞানে ফ্যাসিস্ট এবং বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের সেপাহি সেটা আমাকে সাহস করে, দুই হাজার তেরো সালের আগে থাকতেই বিভিন্ন সময়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে বলতে হয়েছে। ফলে আমি ‘মৌলবাদি’, ‘জামাতি’, ‘হেফাজতি’ ইত্যাদি হয়েছি। টুপিকোর্তা পরা মাদ্রাসার ছেলেদের ‘জঙ্গি’, ‘সন্ত্রাসি’ প্রচারের আমি বিরোধিতা করেছি। বুর্জোয়া গণতন্ত্রে ধর্ম প্রচার ও ধর্ম শিক্ষা দেবার অধিকার স্বীকৃত, তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে মাদ্রাসার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডার বিরোধিতা করতে হয়েছে আমাকে। আমার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা তীব্র ও কুৎসিত হয়েছে।

ধর্ম বিদ্বেষী কর্মকাণ্ডে অতীষ্ঠ হয়ে হেফাজতের নেতৃত্বে যখন লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ ঢাকায় চলে আসলো তখন তারা ধরে নিলো এর পেছনে ফরহাদ মজহারের হাত আছে। অথচ মাদ্রাসার ছাত্রদের কয়জনই বা আমাকে চেনে। আমি তাদের ঢাকায় বিক্ষোভ জানাবার জন্য জমায়েত হওয়াকে সমর্থন করেছি। কারণ প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও নিজেদের কথা বলা গণতান্ত্রিক অধিকার। ওদের ওপর নির্দয় পুলিশি জুলুম ও হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছি। গণতন্ত্র বিরোধী, গণবিরোধী, ফ্যাসিস্টরা প্রমাণ করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল যে এইসব ঘটনাঘটনে নিশ্চয়ই আমার হাত আছে। আমি হেসেছি। এখনও হাসছি।

ঘটনাঘটনের মধ্য দিয়েই ইতিহাস নির্মাণের কাজ আমি করি, ইতিহাসের সম্ভাব্য ইতিবাচক অভিমুখ সম্পর্কে ইঙ্গিত দেবার চেষ্টা করি। সেটা করি আমার লেখালিখির মধ্য দিয়ে। সর্বোপরি আমি লেখক। লেখালিখিই আমার কাজ। এখন আপনি নিজেই বুঝে নিন, আমার কোন ভূমিকা ছিল, নাকি ছিল না?

প্রশ্ন: এই ফ্যাসিজম কি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বিদ্যমান? নাকি ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটেছে?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি নির্দিষ্ট ঘোষিত আদর্শের ভিত্তিতে হয়েছিল। যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হিশাবে সেই আদর্শ কায়েমের প্রতিশ্রুতি ছিল। সেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা ছিল না। ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ। এই তিন আদর্শিক ইচ্ছার বাস্তবায়নের জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, আওয়ামি লীগের দলীয় আদর্শ কায়েম করবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয় নি। খোদ যুদ্ধই এই তিন আদর্শকে ঐতিহাসিক ন্যায্যতা দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত এই তিন আদর্শিক ঘোষণা একই সঙ্গে আইনী দলিল। যুদ্ধের মধ্যে নব গঠিত বাংলাদেশ সরকারই তা ঘোষণা করেছে। অতএব সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচারের আইনী ন্যায্যতাও ছিল। বাংলাদেশে জনগণ তিন আদর্শ কায়েমের জন্য লড়ছে বলেই তার ভিত্তিতেই আমরা অন্যান্য রাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছিলাম।

কিন্তু আওয়ামি লীগ স্বাধীন হবার পর তা বদলে দিয়ে ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ দ্বারা সংবিধান প্রণয়ন করলো। তাদের দলীয় মতাদর্শ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা কায়েম করলো। এটা জনগণের গণতান্ত্রিক বাসনাকে বাদ দিয়ে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র কায়েম করা। অতএব বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা কায়েম হয়ে রয়েছে।

প্রশ্ন: আপনার বন্ধু, কুসুমিত ইস্পাতের কবি হুমায়ূন কবীরকে নিয়ে কিছু বলতে চান?

খুব বেশিদিন সাহিত্য বা কাব্যচর্চা করতে পারে নি হুমায়ুন। কতো দিন? ১৯৬৫ থেকে ১৯৭২। ব্যস। কিন্তু এলো একটা ঝড়ের মতো, চলেও গেল ঝড়ের মতোই। হুমায়ূন বাকি জীবন আমাদের মধ্যে বেঁচে রইল। বেঁচে আছে। বিশেষত আহমদ ছফা ও আমার মধ্যে। কারণ শুধু সাহিত্য নয়, ওর প্রবল আগ্রহ ছিল সমাজ ও ইতিহাসে।

‘কুসুমিত ইস্পাত’ ওর বইয়ের নাম। কিন্তু প্রথম যে নাম নির্বাচন করেছিল সেটা ছিল ‘ইস্পাতের সঙ্গে কুসুমের ভালবাসা’। আমার ভাল লেগেছিল। ও ছিল রোমান্টিক, আবেগী এবং প্রেমিক। সর্বোপরি বিপ্লবী। কাব্যগ্রন্থের নাম ‘কুসুম’ দেওয়ার মধ্যে ওকে যারা চেনে, তারা খানিক হদিস করতে পারবে। বিপ্লব ওর কাছে ছিল ফুল ফোটার ঋতু। কিন্তু ফুল ফুটিয়ে বিপ্লব হয় না। তার জন্য যে সংকল্প দরকার তাকে ইস্পাতের মতো দৃঢ় হওয়া চাই। কিন্তু দুইয়ের ভালবাসায়, কুসুম ও ইস্পাতের, তার মন ভরল না। বিপ্লবের জন্য ইস্পাত হওয়াটাই আসল কথা। কিন্তু এমন এক প্রকার ইস্পাত যার মধ্যে ফুলের স্বভাব আছে। তাই ‘কুসুমিত ইস্পাত’। আমার কথা শুনল না, নাম বদলালো।

ওর সঙ্গে আমার প্রতিদিনই কথা হয়। যে স্বপ্ন আমরা দেখেছি তাকে প্রতিদিন আবাহনের মধ্য দিয়েই আমরা বেঁচে থাকি। হুমায়ুনও বেঁচে থাকে।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top