বাসমালিকদের হাফ ভাড়ায় বাধ্য করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে হয় না: হাদিউজ্জমান


প্রকাশিত:
২৮ নভেম্বর ২০২১ ১৩:০২

আপডেট:
২৯ জানুয়ারী ২০২২ ০২:০৫

গণপরিবহনে হাফ ভাড়া এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আবার আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। পরপর দুই দিন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় গেছে দুটি প্রাণ। সড়কের নিরাপত্তা, দেশের যানবাহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের ও অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন পার্থ শঙ্কর সাহা।

প্রথম আলো: ২০১৮ সালের পর এবার শিক্ষার্থীরা ভিন্ন দাবি নিয়ে আবার রাস্তায়। এবার নিরাপদ সড়কের সঙ্গে বড় দাবিটি হলো গণপরিবহনে হাফ ভাড়া। এ আন্দোলনের যৌক্তিকতা কোথায়? দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বলুন।

মো. হাদিউজ্জামান: ২০১৮ সালে রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুজন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর সড়ককে নিরাপদ করার জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিল। সেখান থেকে নয়টি দাবি ওঠে। দাবিগুলোর মধ্যে একটি দাবি ছিল ঢাকাসহ পুরো বাংলাদেশে গণপরিবহনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ভাড়ায় ছাড় দিতে হবে। পাশাপাশি নগরীতে যে সিটিং বাসগুলো চলছে, সেগুলো শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী অবশ্যই থামাতে হবে এবং তাদের নিতে হবে। অতএব, এই দাবি নতুন নয়। বরং এখানে সুস্পষ্ট করা হয়েছে কর্তৃপক্ষ সিটিং বাসের যে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, তার অর্ধেক পরিমাণ ভাড়ায় যাতায়াতের সুবিধা দিতে হবে। আমি মনে করি, এই দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। এটা তাদের অধিকারও বটে। ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশে শিক্ষার্থীদের ভাড়ায় একটা ছাড় দেওয়ার রীতি আছে।

প্রথম আলো: বেসরকারি গণপরিবহনে তাহলে ব্যবস্থাপনা কেমন হবে? বাসের মালিকেরা তো কোথাও অর্ধেক দামে কিছু পাচ্ছেন না। তাঁরা কেন এ দায় নেবেন? তাহলে সরকার কি ভর্তুকি দিয়ে এ দাবি মেটাতে পারবে? কোন পন্থা নেওয়া যায়?

মো. হাদিউজ্জামান: দেখুন, বিআরটিসির কাছে আমরা অধিকারবলে হাফ ভাড়া চাইতে পারি। কারণ, বিআরটিসি মূলত জনগণের করের টাকায় চলে। শহরে বিআরটিসির যে বাসগুলো চলাচল করছে, সেগুলো সরকারের কাছে অথবা বিদেশি দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কেনা। এই ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও আমাদের সবার অবদান আছে। যদিও বিআরটিসি ১৯৬৪ সাল থেকে এই সুবিধা দিয়ে আসছিল। কিন্তু এটা শুধু অলিখিত একটা রেওয়াজ বা প্রচলন ছিল। এ ক্ষেত্রে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতে চাই, কারণ, তিনি বিআরটিসির ভাড়া অর্ধেক করার একটা নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু প্রাইভেট বাসগুলোর ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত জটিল। কারণ, তারা বাস কেনা থেকে শুরু করে পরিচালনা এবং মেরামতের যাবতীয় ব্যয় বহন করে নিজেরাই। পাশাপাশি তারা সরকারকে ট্যাক্স দিচ্ছে। তাই তাদের হাফ ভাড়ার বিষয়টিতে বাধ্য করার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে সরকার ভর্তুকি দিলে তারা এই সুবিধা দিতে রাজি হবে বলে আমার মনে হয়। তবে বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থায় এটা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট সঠিক বিজনেস মডেল (ব্যবসায়িক নীতি)। সেখানে সরকার এবং প্রাইভেট অপারেটরদের কার্যপরিধি ঠিক করতে হবে। কে রাজস্বের ঝুঁকি নেবে, সেটাও ঠিক করতে হবে।

প্রথম আলো: চলমান এই আন্দোলনের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারালেন দুজন। এর মধ্যে প্রথম দিন একজন কলেজছাত্র ছিলেন। দেখা গেছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা গাড়ি চালাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় এসব প্রতিষ্ঠানের যানবাহনগুলোর এই অব্যবস্থাপনার কারণ কী?

মো. হাদিউজ্জামান: ঢাকা মহানগরীতে ময়লার গাড়িগুলো নয়া ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বিগত চার বছরে ময়লার গাড়িগুলোর বেপরোয়া গতির কবলে প্রাণ হারিয়েছে সাতজন। আবার সরকারি সংস্থার গাড়িগুলোর কিছু অংশ দেখা যায় নিবন্ধন না করেই চলছে। অনেক সময় তাদের ফিটনেস থাকে না। যেখানে ঢাকা শহরে সড়ক ব্যবস্থাপনায় একটা বিশৃঙ্খলা আছে, সেখানে সরকারি সংস্থার এই গাড়িগুলো নিয়ম না মানার বিষয়ে প্রাইভেট অপারেটরদের উৎসাহ দিচ্ছে। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে আইনের প্রয়োজনীয় প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের ময়লা ব্যবস্থাপনায় আউটসোর্সিং করলে অবশ্যই চুক্তিতে এমন রাখতে হবে যেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটা দায়বদ্ধতার মধ্যে রাখা যায়।

প্রথম আলো: নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সড়ক আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এটি এখনো কার্যকর হয়নি। এতে বেশ কিছু ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কী বলবেন এ বিষয়ে?

মো. হাদিউজ্জামান: এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের ১৯৭৩ সালের যে আইনটি ছিল, সেটা আধুনিক পরিবহনব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ২০১৮ সালের আইন তৈরির পর আমরা আশা দেখেছিলাম, সড়ক পরিবহনব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসবে। কিন্তু আইনটা প্রয়োগ না করেই এর ভালো-মন্দ, প্রায়োগিক দিক না বুঝে, কোথায় সীমাবদ্ধতা আছে, তা অনুধাবন না করে এটা পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেওয়া হলো। ফলে এই আইন প্রয়োগে কতটুকু শৃঙ্খলা ফিরে আসবে, সেটা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। আমি বলব, এই আইনের ধারা-উপধারা পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের ক্ষেত্রে পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত যেন নেওয়া হয়।

প্রথম আলো: সড়ক উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনা, অব্যবস্থাপনাও কম নয়। পরিবর্তনের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার?

মো. হাদিউজ্জামান: সড়কে দুর্ঘটনা কমানো বা শৃঙ্খলা জোরদার করা কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল অর্জনের মতো বিষয় নয়। বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এটা জিপিএ-৫ পাওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। আমরা দেখি, যখনই কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তখন জনগণের পাশে একটা অন্তর্বর্তী সমাধান করা হয়। এ ক্ষেত্রে আমাকে অবশ্যই বলতে হবে, সরকার কিন্তু সড়কে বিনিয়োগ করছে। নতুন নতুন অবকাঠামো হচ্ছে। কিন্তু পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত আমরা যারা আছি, আমাদের দায়বদ্ধতার একটা ঘাটতি আছে। পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবস্থাপনায় দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ভার কার ওপর বর্তায়, সেটিও সঠিকভাবে উঠে আসে না। ফলে সিস্টেমের ফাঁক দিয়ে অনেকেই বেরিয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তন আসছে না। আমি মনে করি, সরকারকে সঠিক ব্যবস্থাপনার, অর্থাৎ স্টিয়ারিংয়ের দায়িত্ব নিতে হবে। বেসরকারি খাতে যাঁরা আছেন, তাঁদের দায়িত্ব থাকবে শুধু গণপরিবহন পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা। তাঁদের কার্যক্রমের ওপর পুরস্কার দেওয়া হবে। উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগ দিতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যমান সিস্টেমকে ঢেলে সাজাতে হবে। পাশাপাশি সড়কের ব্যাকরণ ঠিক করতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে লেনভিত্তিক গাড়ি কোনো শহরে পরিচালিত হয় না—এটা অনুধাবন করা অনেকের পক্ষে দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। এটা বাস্তবায়ন করা কঠিন কিছু নয়। মনে রাখতে হবে, ব্যাকরণগত ভুল থাকলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে না। দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ঢাকার সব ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকর করতে হবে এবং কর্তৃপক্ষকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী হতে হবে। ট্রাফিক পুলিশকে তার সঠিক দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে। যেভাবে হাতের ইশারায় গাড়ি পরিচালিত হয়, সেটা একবিংশ শতাব্দীতে মেনে নেওয়া যায় না।

প্রথম আলো: সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংসহ নগর পরিবহনগুলো এখনো নাগরিকবান্ধব হয়নি। রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের অনেকে ঢাকা শহরই চেনেন না। নগর যানবাহনের পরিস্থিতি নিয়ে আপনাদের মূল্যায়ন কী?

মো. হাদিউজ্জামান: ঢাকা মহানগরীতে যে পরিমাণ সড়ক আছে, আমরা সেটা সঠিক ব্যবহার করতে পারলে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে। সে জন্য ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং পথচারীদের জন্য পথচারীবান্ধব ফুটপাত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা দরকার। বিআরটিএর পরিসংখ্যান দেখলে আমার ভয় হয়। যেখানে দেখা যায়, নিবন্ধিত যানবাহনের প্রায় ৭০ শতাংশ হলো মোটরসাইকেল। দেখুন, উন্নত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও যেখানে পুরো আমেরিকায় আট লাখ মোটরসাইকেল চলে, সেখানে শুধু ঢাকায় আট লাখ মোটরসাইকেল চলছে। মূলত উবার-পাঠাওসহ বিভিন্ন অ্যাপস চালু হওয়ার পর মোটরসাইকেলের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এসব আসার ফলে যদিও অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে, কিন্তু এই সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, যা নগরীর যানজট বা দুর্ঘটনার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি মনে করি, শক্তিশালী নীতির মাধ্যমে এই সংখ্যা কমিয়ে আনা উচিত। বিশ্বের অনেক দেশই এই ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্য দিয়ে দুর্ঘটনা ও যানজট অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে। এ ক্ষেত্রে আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং ছোট গাড়ির সংখ্যাও নিয়ন্ত্রণ খুবই দরকার। তবে এটাও সত্যি, নগরবাসীর জন্য এগুলোর বিকল্প হিসেবে গণপরিবহনকে শক্তিশালী করতে হবে। মেট্রোরেল-বিআরটিসহ কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তার সঠিক বাস্তবায়নই সড়ক ও পরিবহন খাতে যে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য আছে, তা কমিয়ে নগরবাসীকে অনেকটা স্বস্তি দিতে পারে।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top