কওমি মাদ্রাসায় পড়ছে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী

হেফাজতের কওমী মাদ্রাসার রাজনীতি কতোটা ভয়াবহ ?


প্রকাশিত:
১৭ এপ্রিল ২০২১ ২১:০৮

আপডেট:
১৭ মে ২০২১ ০৭:৩৭

প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী কওমী শিক্ষা নিচ্ছে পরকালের শান্তির জন্য। ইহকালকে তারা কিছুই মনে করে না। তাদের সিলেবাসে শুধুই পরকালের কথা। এ বাস্তব জীবনে কি করে খাবে তারা এর কোনো সদুত্তর নেই তাদের কাছে। তারা মনে করে, হেফাজত নামের সংগঠনটি তাদের ভালো চায়। সত্যের পথে নিতে চায়। তাই হেফাজতের ডাকে নিজের জীবন কোরবানি দিতেও তাদের কুন্ঠা নেই। উল্টোদিকে হেফাজতের বড়ো রাজনৈতিক শক্তি এই ২০ লাখ শিক্ষার্থী। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়বে। কিন্তু দেশ বা সরকারের শ্রমের বাজারে তারা বোঝা নয়কি ?
২০১৩ সালে রাজধানীতে হেফাজতে ইসলাম প্রথম সংঘবদ্ধ শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছিল। তারা জাতীয় মসজিদকে সংঘাত ও নাশকতার কাজে ব্যবহার করেছিল। সরকার প্রথমে পুলিশি শক্তি ব্যবহার করে তাদের দমন করলেও দীর্ঘ মেয়াদে একটি সমঝোতার পথ খুঁজেছিল। হেফাজতের তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একটা আপসেও পৌঁছেছিল। তাতে হেফাজত লাভবান হলেও সমঝোতা টেকসই হয়নি। এ মাসেই হেফাজতের নির্দেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা মোদী বিরোধী আন্দোলন করে জীবন দিল । এতো লাশের কথা কয়েকদিনে ভুলে গিয়েই হেফাজত নেতা মামুনুল রিসোর্টে নারীসহ ধরা পড়লেন অবকাশ যাপনে।
মাদ্রাসা শিক্ষা কেমন ?
সাধারণ শিক্ষার মতো দেশের মাদ্রাসাশিক্ষারও অনেকগুলো ধারা। তবে প্রধান দুটি হলো সরকারি মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন দারুল উলুম বা আলিয়া মাদ্রাসা এবং বেসরকারি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ সংক্ষেপে বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসা। ১৯১৪ সালে নাথান কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কার করে পাঠ্যসূচিতে বাংলা, ইংরেজিসহ বিজ্ঞান ও মানবিক বিদ্যার কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিউ স্কিম নামে পরিচিত এই সংস্কার কেবল প্রথমোক্ত ধারাটিতে কার্যকর হয়। এর ফলেই প্রথম জীবনে মাদ্রাসাশিক্ষা গ্রহণ করেও অনেক বাঙালি মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছিল, যাঁরা বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ জীবনের মূলধারায় অগ্রসরজনরূপে স্বীকৃত হয়েছেন।
কওমি মাদ্রাসা ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারী। ১৮৬৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন উপমহাদেশের বিখ্যাত আলেম মাওলানা মুহম্মদ কাসিম। বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে মাওলানা আশরাফ আলী থানভি ছিলেন এই ধারার প্রভাবশালী আলেম, যাঁর রচিত খুতবা একালেও অনুসৃত হয়। এঁদের চর্চিত ধারাটি রক্ষণশীল ওয়াহাবি পন্থা হিসেবেও পরিচিত। একসময় সুন্নিদের সঙ্গে এদের বিরোধ ছিল তীব্র। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান ঘটতে থাকে এবং সত্তরের দশক থেকে তেলের কারণে আরব বিশ্বের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনগোষ্ঠীর কিছু মহলে বিপ্লবী ইসলাম থেকে ক্রমে জিহাদি ও জঙ্গি ইসলামি রাজনীতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ দেশের সমাজে এর পক্ষে যে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলো তৈরি হয়েছে, তাদের একটি উৎস মাদ্রাসা, বিশেষত কওমি মাদ্রাসা। তবে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল রাজনীতির অবক্ষয় ও সর্বত্র উগ্র সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং ইরাক-আফগানিস্তান হয়ে বিভিন্ন মুসলিম দেশে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী ধ্বংসাত্মক ভূমিকা স্বভাবতই মুসলমানদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। এতে সমাজে ইসলামি কট্টরপন্থী রাজনীতির ঝোঁকও বেড়েছে। এরা প্রকাশ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না। সরকারের আপসনীতির খেসারত হিসেবেও একে দেখছেন অনেকে।
সংস্কারের যত চেষ্টাই হোক না কেন, দেওবন্দে আধুনিক সমকালীন বিদ্যা সংযোজনে আগ্রহী হননি এর পরিচালকেরা। দেওবন্দের পাঠ্যতালিকা কোরআন, হাদিস, তফসির, ফিকহ্, কালামে সীমাবদ্ধ, যা এ দেশের কওমি মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও সত্য। ১৯৩৮ সালে গঠিত মওলা বকস্ কমিটি মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কারে যে প্রতিবেদন দেন, তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে মাওলানা মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, শত বছরের চেষ্টাতেও মাদ্রাসাশিক্ষায় কোনো পরিবর্তন আনা যায়নি, এগুলো চলছে বাদশাহ আলমগীরের আমলের শিক্ষাব্যবস্থায়। একই রকম হতাশা ব্যক্ত করেছেন নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, ড. মাহমুদ হাসান প্রমুখ উপমহাদেশের প্রথম প্রজন্মের মুসলিম বিদ্বজ্জন।
সরকারের সঙ্গে বারবার আপসের পরও বিরোধ কেন হচ্ছে ?
আদতে সংবিধান, গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, জাতীয় শিক্ষানীতি, বাঙালির সামাজিক রুচি-রীতি অর্থাৎ এ জাতি দীর্ঘ সংগ্রাম করে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক জীবনের জন্য যা কিছু অর্জন করেছিল, তার অনেক কিছুই এরা মানে না। এ যেন রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র। আর এই কওমী মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে হেফাজতে ইসলাম নামের সংগঠনটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তারা ‘কওমী জননী’ উপাধি দিয়েছে আবার সরকারের বিরুদ্ধেই হুশিয়ারি দিচ্ছে।এদিকে শেখ হাসিনার সরকার কওমী শিক্ষাকে অন্যান্য শিক্ষামানের সমান অধিকার দিলেও কওমীতে পড়ে কেউই বাস্তব জীবনে চাকরি করতে পারবে না। কারণ এদের সিলেবাস ধর্মীয়।জামায়াতের রাজনীতি কিছুটা আড়ালে চলে গেলে হেফাজত এসেছে নতুন রুপে। গুঞ্জন রয়েছে নেপথ্যে হেফাজতকে সরকারবিরোধী মদদ দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।
কওমী মাদ্রাসায় পড়ছে কারা?
বিবিসির একটি রিপোর্টে জানা যায়, ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা হাসিনার আক্তার। তাঁর তিন সন্তানের সবাই কওমী মাদ্রাসায় পড়াশুনা করছে।
হাসিনা আক্তার হিসেব করে দেখেছেন, স্কুলে সবার জন্য প্রতি মাসে খরচ হতো কমপক্ষে দশ হাজার টাকা।
কিন্তু মাদ্রাসায় তিনজনের জন্য তাঁর খরচ হচ্ছে দুই হাজার টাকার মতো।
স্কুলে ভর্তির সময় ডোনেশনের মতো মাদ্রাসায় সে ঝামেলা তো নেই, কোন বাধ্যতামূলকভাবে কোচিংও করতে হয়নি।
হাসিনা আক্তার বলছিলেন, এক দিকে ধর্মীয় চিন্তাধারা এবং অন্যদিকে কম খরচ - এ দুটি কারণে তিনি সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছেন।
"আমি আমার বাচ্চাকে হাই লেভেলে দিতে চেয়েছি। কিন্তু ৪০ হাজার টাকা অ্যাডভানস করতে হবে। আমার পক্ষে সেটা সম্ভব না। এখানে তেমন একটা ব্যয় করতে হয়না। দ্বিতীয় হচ্ছে, মুসলিম হিসেবে আমার বাচ্চাকে এমন শিক্ষাই দিতে হবে যার মাধ্যমে তার ঈমান-আকিদা এবং দুনিয়াবি জিন্দেগিটা কোরআন এবং সুন্নাহর আলোকে হয়," বলছিলেন হাসিনা আক্তার।
ঢাকার বেশ কিছু মাদ্রাসা ঘুরে দেখা গেল এসব জায়গায় ছাত্র-ছাত্রীরা এসেছেন মূলত পরিবারের ইচ্ছায়।
তবে সাথে-সাথে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাও ছিল কিছুটা।
মাদ্রাসা ছাত্রী শিফা আক্তার ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনার পর কওমী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু এর কারণ কী?
শিফা আক্তার বলেন, " আমার আব্বু আগে স্কুল টিচার ছিলেন। তারপর ইসলামের দিকে ধাবিত হয়ে মাদ্রাসার শিক্ষকতায় যোগ দিলেন। আমার আব্বু চাইতেছিলেন যে আমি মাদ্রাসায় পড়বো। আর আমারও ইচ্ছা ছিল মাদ্রাসায় পড়ার।"
এসব মাদ্রাসায় এতিম কিংবা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আধিক্য যেমন আছে তেমনি সমাজে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও আছে, যারা চাইলে নিজের সন্তানকে ব্যয়বহুল শিক্ষা দিতে পারেন।
অন্যদিকে সমাজে আরেকটি অংশ আছে যারা সাধারণ শিক্ষার খরচ বহর করতে পারেন না।
ফলে কওমী মাদ্রাসা হয়ে উঠে তাদের জন্য একটি ভরসার জায়গা।তবে উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মীয় প্রভাব একটি বড় কারণ হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।
সে কথাই বলছিলেন একজন অভিভাবক শহিদুল্লাহ ভুঁইয়া।
মি: ভুঁইয়ার চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে এক ছেলে ফ্যাশন ডিজাইনার, এক মেয়ে ডাক্তার এবং আরেক মেয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন। ছোট ছেলে তিনি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছেন।
তিনি বলেন, "আমি চাই যে আমার একটা ছেলে হাফেজ হোক। আমি একজন হাফেজের বাপ হতে পারবো। তাছাড়া আমার ছেলে ইসলামের খেদমত করতে পারবে। এটাই হলো উদ্দেশ্য।"


কওমী মাদ্রাসাগুলোর কার্যক্রম সরকারী তদারকির বাইরে
এসব প্রতিষ্ঠানে কী পড়ানো হবে সে বিষয়য়ে সরকারের কোন নজরদারি নেই।
কিন্তু তারপরেও বিভিন্ন কওমী মাদ্রাসা ঘুরে দেখা গেল এসব জায়গায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছেই।
কওমী মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোর্ড বেফাকের হিসেব অনুযায়ী ২০১৩ সালে বিভিন্ন শ্রেণিতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা যেখানে প্রায় ৫৫ হাজার ছিল, ২০১৮ সালে সেটি দ্বিগুণ হয়েছে।
ঢাকার গাবতলি এলাকায় মেয়েদের একটি কওমী মাদ্রাসা শামসুল উলুম মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৩ সালে।
শুরুতে এখানে ৩৫জন ছাত্রী থাকলেও পাঁচ বছরের ব্যবধানে এখানে ছাত্রী সংখ্যা এখন প্রায় ৩০০।
শিক্ষা বিষয়ক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলছেন, অভিভাবকরা যে সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন, এর পেছনে শুধু ধর্মীয় কারণ নয় অর্থনৈতিক কারণও জড়িত।
রাশেদা চৌধুরী বলেন, মূল ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে-ধীরে ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে পরিবারগুলোর জন্য। প্রাথমিক শিক্ষায় সরকার ব্যয় করার পরেও ছাত্র-ছাত্রীদের পেছনে বহু টাকা ব্যয় করতে হয় অভিভাবকদের।
"আমরা গবেষণায় দেখেছি, প্রাথমিক শিক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার যে টাকা ব্যয় করে, তার দ্বিগুণ কখনো-কখনো তিনগুণ ব্যয় করতে হয় পরিবারগুলোকে। যেখানে মাদ্রাসাগুলোতে, বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসাগুলোতে, কোন ধরনের ব্যয় বহন করতে হয় না। বিশেষ করে বিত্তহীন বা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো পছন্দ করেন বা বেছে নেন। বাধ্য হয়ে বলা যেতে পারে। "বলছিলেন রাশেদা কে চৌধুরী।
তবে বাংলাদেশের সমাজে অনেকেই আছেন যারা মনে করেন, তাঁর তিনটি সন্তান হলে একজনকে মাদ্রাসায় দেবেন।
এ ধরনের চিন্তাধারা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত- সবার মাঝেই দেখা যায় বলে উল্লেখ করেন রাশেদা চৌধুরী।
কওমী মাদ্রাসায় টাকা আসে কোথা থেকে?
কওমী মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পায়। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষই তাদের থাকা-খাওয়া এবং পড়াশোনার খরচ বহন করে।
অনেক মাদ্রাসা আছে যেখানে নির্ধারিত কোন বেতন নেই। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সচ্ছলতার উপর নির্ভর করে বেতন নেয়া হয়।
এতো বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের ব্যয় বহন করছে কারা? কোত্থেকে আসছে এতো টাকা?
কওমী মাদ্রাসার যারা সমালোচক তাদের মনে এসব নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে।
এসব মাদ্রাসা বিদেশী সহায়তা পায় কিনা সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কেউ-কেউ।
কিন্তু এসব মাদ্রাসার সাথে সম্পৃক্তরা বলছেন, কোন বিদেশী সহায়তা নয়, সমাজের ভেতর থেকেই টাকার জোগান আনে।

ঢাকার একটি অন্যতম বড় কওমী মাদ্রাসা জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামি আরজাবাদে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় ১২০০ ছাত্র পড়াশোনা করছে, যাদের অধিকাংশই সেখানে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার সুবিধা পায়। মাদ্রাসায় দুটি ভবন রয়েছে। একেকটি চারতলা করে।
এ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া বলেন, " আমাদের যে ছাত্র সংখ্যা আছে তার দুভাগ হলো দরিদ্র ফ্যামিলির ছেলে। এ দেশের যে মুসলিম জনসাধারণ আছে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অনুদানে মাদ্রাসা পরিচালিত হয়। তেমন একটা সমস্যায় পড়তে হয় না আমাদের। একজন দিনমজুরও এখানে অনুদান প্রদান করেন তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী।"
বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা ঘুরে দেখা গেল, অর্থের উৎস সম্পর্কে এসব মাদ্রাসা পরিচালনাকারীরা একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন।
ইসলাম বিষয়ক লেখক এবং গবেষক মাওলানা শরিফ মোহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের সবগুলো কওমী মাদ্রাসা সমাজের ভেতর থেকে অনুদান নিয়ে পরিচালিত হয়।
"জুম্মার নামাজে অংশগ্রহণ করে এমন কোন ধার্মিক মুসলমান আপনি পাবেন না যার কওমী মাদ্রাসায় ১০ টাকার অংশগ্রহণ নেই। ১০ টাকা থেকে এক কোটি টাকা অনুদান দেবার মতো মানুষ এ সমাজে আছে," বলছিলেন শরীফ মোহাম্মদ।
কওমী মাদ্রাসা বোর্ডে এতো বিভক্তি কেন?
২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স-এর সমান মর্যাদা দিয়ে ঘোষণা দিলেন, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা ব্যাপক সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন।
কথা ছিল স্বীকৃতির পর থেকে সবগুলো কওমী মাদ্রাসা একটি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা নেবে।
কারণ বর্তমানে কওমী মাদ্রাসাগুলোর ছয়টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবং সেখানে সরকারি কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।
ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসার শিক্ষক আহলালুল্লাহ ওয়াসেল বলছেন, স্বীকৃতির পর থেকে দাওরায়ে হাদিস অর্থাৎ সর্বোচ্চ স্তরের পরীক্ষা একটি সম্মিলিত বোর্ডের অধীনেই হচ্ছে।
দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা একটি সম্মিলিত বোর্ডের অধীনে হলেও নিচের স্তরের পরীক্ষাগুলো এখনো ছয়টি আলাদা বোর্ডের অধীনেই হচ্ছে।
সম্মিলিত বোর্ডের গঠন কাঠামো নিয়ে মনক্ষুন্নতা আছে বিভিন্ন পক্ষের মাঝে। হাটহাজারি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আহম্মদ শফি মারা যাওয়ার আগে তার নেতৃত্বাধীন বেফাকের আধিপত্য রয়েছিল এ বোর্ডে। এখন বাবুনগরী নিয়ন্ত্রণ নিতে চান।
তাঁদের অনুসারী মাদ্রাসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়ার কারণে এ বোর্ডে তাদের প্রাধান্য বেশি।
কওমি মাদ্রাসার একজন পর্যবেক্ষক রোকন রায়হান, যিনি নিজেও কওমি মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেছেন।
তিনি বলেন, সম্মিলিত বোর্ডে আহমদ শফির নেতৃত্বাধীন বেফাকের আধিপত্য নিয়ে অন্যদের মাঝে অসন্তুষ্টি ছিল।

যদিও ৮০ শতাংশ কওমি মাদ্রাসা বেফাকের অধীনে এবং কওমী মাদ্রাসাকে প্রতিনিধিত্ব করে বেফাক নামের বোর্ডটি। এমনটাই বলছেন মি: রায়হান।
অনেকে বলেন কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে প্রতিন্দন্দ্বিতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে নিচের স্তরসহ সবগুলো মাদ্রাসাকে একটি বোর্ডের আওতায় একটি বোর্ডের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

১৪ হাজার কওমি মাদ্রাসায় পড়ছে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী
২০১৫ সালে সারা দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি মাদ্রাসা, ৪ হাজার ৫৯৯টি। সবচেয়ে কম বরিশালে, ১ হাজার ৪০টি। বেশির ভাগ মাদ্রাসাই মফস্বল এলাকায় অবস্থিত।
প্রথমবারের মতো কওমি মাদ্রাসা বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ এ তথ্য সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে এই তথ্যের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিল ব্যানবেইস।
কিন্তু এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি বলে জানান ব্যানবেইসের এক অফিসার।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ।
ব্যানবেইসের তথ্য বলছে, সংখ্যার দিক দিয়ে ঢাকার পরেই চট্টগ্রামে মাদ্রাসা বেশি, ২ হাজার ৯৮৪টি। এর পরে রাজশাহীতে ১ হাজার ৭০২টি, সিলেটে ১ হাজার ২৪৬টি, রংপুরে ১ হাজার ১৭৬টি, খুলনায় ১ হাজার ১৫৫টি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, কওমি শিক্ষাকে সরকারের আওতায় এনে সংস্কার করে যুগোপযোগী করা উচিত। ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ইহজাগতিক শিক্ষা দেওয়া উচিত। কারণ বিদ্যমান অবস্থায় তারা দুনিয়ার শিক্ষা কম পাচ্ছে। ফলে চাকরিতে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। তাই কওমি শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করা উচিত।
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) যুগ্ম মহাসচিব মাহফুজুল হক বলেন, তাঁরা শুধু কওমি শিক্ষার স্বীকৃতি চান। তাঁরা সরকারের কোনো অনুদান, নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপ চান না।

কওমী শিক্ষা শেষে তারা কি করবেন ?
কওমি মাদ্রাসার বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই বিশ্বাস করেন, তাদের অর্জিত শিক্ষা ইহকালের জন্য নয়, পরকালের জন্য। তাদের কর্মজীব্ন তাই ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মপ্রচার ও ধর্মীয় আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
২০১১ সালে অধ্যাপক আবুল বারকাতের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, এদের পাঠ্যপুস্তকও নিজস্ব। এগুলোর সরকারি স্বীকৃতি নেই। এসব মাদ্রাসার বিভিন্ন ডিগ্রির মধ্যে ‘দাওরায়ে হাদিস’ ছাড়া অন্য কোনও ডিগ্রিরও সরকারি স্বীকৃতি নেই। স্নাতকোত্তর সমমান ‘দাওরায়ে হাদিসে’র সরকারি স্বীকৃতিও মিলেছে সম্প্রতি।
এর আগে, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পর্যায়ে আলিয়া মাদ্রাসা বা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হয়ে আসতে পারত, যেন চাকরির বাজারে তারা সুযোগ পায়। তবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট বা জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট পরীক্ষা চালুর হওয়ায় পঞ্চম শ্রেণির পর থেকে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আলিয়া মাদ্রাসা বা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল কাদির বলেন, কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যসূচি সময়োপযোগী হয়ে উঠতে পারেনি। বেসরকারিভাবে পরিচালিত এসব মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ তাদের পাঠ্যসূচিতে সংস্কার চায়নি অথবা নিজেদের পাঠ্যসূচিতে সরকারের হস্তক্ষেপ চায়নি বলেই এই সংস্কার হয়নি বলে মনে করছেন তিনি।

চাকরির ক্ষেত্র সীমিত
কওমি মাদ্রাসাগুলোর দর্শনের লক্ষ্য পরকাল। তাদের কোরান ও হাদিস সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ালেখা করতে হয়, যেন তারা এই শিক্ষা দিয়ে ধর্মীয় বিধান মেনে জীবনযাপন করতে পারে এবং পরকালে জান্নাতবাসী হয়। তারা পৃথিবীর বুকে খুব সহজ-সরল জীবনযাপনে বিশ্বাসী। ফলে পৃথিবীতে সাধারণ জীবনযাপনের জন্য যে শিক্ষা ও দক্ষতা প্রয়োজন, সেগুলো কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থায় অবহেলিত।
গাজীপুরের মুন্সিপাড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার অধ্যক্ষ মওলানা রফিকুল আলম বলেন, কওমি মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। যারা আল্লাহ’র কাজ করতে চায়, তারা মাদ্রাসায় পড়তে আসে।’ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার নিয়ম-কানুন কিংবা কোরান শরিফ পড়তে জানা নেই যাদের, তাদের বাসায় গিয়ে এসব বিষয় শেখানোর মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন বলে জানান তিনি।
একসময় কওমি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছেন আব্দুল্লাহ। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বলেন, ‘তারা (কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা) ইসলামের সেবা করতে চায় এবং ইসলামি পন্থায় জীবনযাপন করতে চায়। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তারা মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, ধর্মপ্রচারের কাজ করেন অথবা বিভিন্ন মসজিদে নামাজ পড়িয়ে থাকেন।’ কওমি মাদ্রাসায় থাকাকালে সেখানকার খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই আলিয়া মাদ্রাসায় যেতে চাইত বলে জানান তিনি।
কওমি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, কওমি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন মসজিদে ইমাম, মুয়াজ্জিম বা খাদেম হিসেবে কিংবা বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কাজ করার উদাহরণই বেশি। তবে ধর্মভিত্তিক এসব কাজে বেতন-ভাতা অত্যন্ত কম হওয়ায় তাদের অনেকেই আর্থিক নিশ্চয়তার জন্য ছোটখাট ব্যবসা করে থাকেন।
যেমন, একজন ইমামের কাজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ানো এবং মুয়াজ্জিনের কাজ পাঁচ ওয়াক্তের নামাজের সময় আজান দেওয়া। কেবল পেশাগত নয়, ধর্মীয় দায়িত্বশীলতা থেকেও তারা এসব করে থাকেন। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয় মূলত মসজিদের তহবিল থেকে, যা সংগৃহীত হয় স্থানীয় ধার্মিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দান থেকে।
শহর এলাকায় মসজিদের ইমাম ও খতিবের মাসিক সম্মানী সাধারণত ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে হয়। এসব এলাকায় একজন মুয়াজ্জিনের সম্মানী মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা, খাদেমের জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, মসজিদের তহবিলে অল্প টাকা থাকে বলে গ্রাম এলাকায় ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী আরও কম হয়ে থাকে।
তবে কবি ও বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহারের মতে, শিক্ষা মানুষের জন্য। মানুষ সম্পর্কে প্রাথমিক কোন অনুমান ছাড়া কোন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব। কওমি মাদ্রাসার অনুমান হচ্ছে মানুষ জীবজন্তু নয়। অতএব জীবের বৃত্তিসম্পন্ন ভোগী মানুষ তৈরি শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে না। ইসলাম যেহেতু মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব গণ্য করে এবং মানুষ আল্লাহর খলিফা হিশাবেই ইহলৌকিক জগতে হাজির, অতএব প্রতিটি মানুষের এমন কিছু আধ্যাত্মিক বা দিব্যগুণ রয়েছে যার বিকাশ ঘটানোই শিক্ষার কাজ। এটা অনস্বীকার্য যে সমাজে বৃত্তিমূলক দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন আছে, যাকে আমরা সাধারণ ভাবে বলি -- সমাজে কিছু একটা করে খাবার শিক্ষা। কওমি মাদ্রাসা সামাজিক মানুষের এই চাহিদাকে মোটেও অস্বীকার করে না, কিন্তু মাদ্রাসার দায়িত্ব নয় কলকারখানা অফিস আদালতের জন্য শিক্ষার নামে শ্রমিক সরবরাহ করবার কারখানা চালানো। অথচ আধুনিক বা পুঁজিবাদী শিক্ষার এটাই প্রধান উদ্দেশ্য। ইসলামি তালিমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সাচ্চা মানুষ তৈরি করা যার মধ্যে সর্বোচ্চ নৈতিক গুণাবলির সন্নিবেশ ঘটবে। এই নৈতিকতার আদর্শ হচ্ছে নবীজীর অনুসৃত সুন্নাহ। এই দিক থেকে মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণ কথাটার কোন অর্থ হয় না। কারণ আধুনিক শিক্ষার ধারণা ও উদ্দেশ্য আর শিক্ষা সম্পর্কে কওমি মাদ্রাসার ধারণা ও উদ্দেশ্যের মধ্যে ফারাক আকাশ আর পাতালের মতো। আধুনিক শিক্ষা মানুষকে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার গোলামে পরিণত করে। শুধু শ্রমিক তৈরি হবার দিক থেকে নয়, মানুষকে নীতিনৈতিকতাবর্জিত ভোগী হিশাবে তৈরি না করলে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না।

 

 

 



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top