চ্যাপলিন সেজে সিনেমা হলে গিয়েছিলেন আইনস্টাইন


প্রকাশিত:
২৪ এপ্রিল ২০২১ ১৮:০৬

আপডেট:
১৭ মে ২০২১ ০৬:২৮

সন্দেহাতীতভাবে তিনি আজও রুপোলি পর্দার সর্বকালের অন্যতম সেরা কমেডিয়ান। একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও প্রযোজক। তিনি আর কেউ নন, সবার প্রিয় অভিনেতা চার্লস চ্যাপলিন বা চার্লি চ্যাপলিন। নাকের নীচে একটা ছোট্ট টুথব্রাশ মার্কা গোঁফ, মাথায় টুপি, হাতে ছড়ি, দড়ি দিয়ে বাঁধা বেঢপ রকমের বড় ব্যাগিজ প্যান্ট, বিশাল জুতা পরে পাতিহাঁসের মতো চলাফেরা। তাঁর এমনই মজার ব্যক্তিত্ব, সরল সহজ অভিব্যক্তি আর ম্যাজিকাল কাণ্ডকারখানায় মজেছিল আপামর বিশ্ববাসী।
 
অন্যদিকের মানুষটাও কম জনপ্রিয় নয়! ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করা জার্মান বংশোদ্ভূত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, থিওরি অফ রিলেটিভিটির জন্মদাতা, পরমাণু শক্তি নিয়ে যাবতীয় গবেষণার পথপ্রদর্শক। ১৯২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ঝাঁকড়া চুলের এই বিখ্যাত মানুষটিই শতাব্দীর অন্যতম সেরা পদার্থবিজ্ঞানী স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন।
 
একেবারে ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা, অথচ স্ব স্ব ক্ষেত্রে ভয়ংকর জনপ্রিয় দুটো মানুষ। একজন ডুবে আছেন বিজ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আনন্দে, আর শব্দ খরচ না করেও শুধু অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে জনমানসে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়াই অন্যজনের কাজ। কিন্তু জানেন কি, বর্ণময় অথচ সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের এই দুটো মানুষের মধ্যেই একসময় গড়ে উঠেছিল আশ্চর্য এক বন্ধুত্ব।
 
সেটা ১৯৩০-৩১ সালের কথা। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির আমন্ত্রণে বক্তৃতা দিতে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন আইনস্টাইন। এটা সেই সময়, যখন তাঁর বিজ্ঞানচর্চার স্বীকৃতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা আমেরিকা জুড়ে। খ্যাতির মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। শুধু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, তাঁকে ঘিরে আগ্রহ আর উত্তেজনা তখন বিশ্বজুড়ে। যখন যে দেশে যাচ্ছেন, সেখানেই পাচ্ছেন সম্মান আর ভালোবাসা। তাঁর প্রতিটি সেমিনার, ওয়ার্কশপ ঘিরে চড়ে থাকত কৌতূহলের পারদ। বিজ্ঞানী থেকে সাধারণ মানুষ, রাজনীতির লোকজন থেকে মিডিয়া- উপচে পড়ত ভিড়। তিনি যেখানেই যেতেন, তাঁকে ঘিরে থাকত বিশ্বের তাবড় ফটোগ্রাফার আর সাংবাদিকেরা। এমনই এক সময়ে আইনস্টাইনের সঙ্গে আলাপ হয়ে যায় চার্লি চ্যাপলিনের। নির্বাক চলচ্চিত্রের সেই যুগকে বলা যায় স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিনের স্বর্ণ অধ্যায়। দ্য কিউর (১৯১৭), দ্য অ্যাডভেঞ্চারার (১৯১৭), এ ডগ’স লাইফ (১৯১৮), দ্য কিড (১৯২১), দ্য গোল্ড রাশ (১৯২৫), দ্য সার্কাস (১৯২৮) থেকে শুরু করে সিটি লাইটস (১৯৩১)এর মতো একটার পর একটা চলচ্চিত্রে তাঁর তুখোড় অভিনয় বিশ্বজুড়ে শোরগোল তুলে দিয়েছে তখন।
 
১৯৩০ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকা পৌঁছে প্রথম কয়েকদিন নিউইয়র্কে ছিলেন আইনস্টাইন। তারপর সেখান থেকে তিনি যান ক্যালিফোর্নিয়ায়। এখানেই আইনস্টাইনের সঙ্গে পরিচয় হয় বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা কোম্পানি ‘ইউনিভার্সাল স্টুডিওস’-এর প্রধান কার্ল ল্যামলের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান চলচ্চিত্র স্টুডিও ছিল এই ‘ইউনিভার্সাল স্টুডিওস’। লুইস মাইলস্টোন পরিচালিত যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ চলচ্চিত্রটি দেখার জন্য আইনস্টাইনকে হলিউডে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ল্যামলে। সেই আমন্ত্রণ সাদরে গ্রহণ করেন বিজ্ঞানী।
 
সিনেমা চলাকালীন কোনও এক মুহূর্তে আইনস্টাইন ল্যামলেকে বলেছিলেন, তিনি চার্লি চ্যাপলিনের সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী। এরপর ল্যামলে নিজেই উদ্যোগী হয়ে চ্যাপলিনকে ফোন করেন আর আইনস্টাইনের ইচ্ছের কথা জানান। এই দুই কিংবদন্তির দেখা হয় ইউনিভার্সাল স্টুডিওতেই। স্টুডিও ঘুরেফিরে দেখার ফাঁকে ফাঁকেই চলতে থাকে তাদের আলাপচারিতা, এমনকি দুজনে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়াও সারেন। চার্লি চ্যাপলিনের থেকে প্রায় বছর দশেকের বড় ছিলেন আইনস্টাইন। তবু প্রথম আলাপেই এক আশ্চর্য অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে এই দুজনের মধ্যে।
 
তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী বললেই গোমড়ামুখো, সিরিয়াস চেহারার একজন মানুষের কথা মনে পড়ে, তাই না! কিন্তু আইনস্টাইন মোটেও তেমনটি ছিলেন না। তাঁর রসবোধ ছিল প্রবল। চরিত্রগত ভাবেও বেশ ভুলো মনের লোক ছিলেন আইনস্টাইন। তাঁর এই অন্যমনস্কতা জন্যও নানারকম মজাদার মুহূর্ত তৈরি হত। তেমনই একবার  ট্রেনে চেপে কোথাও একটা যাচ্ছিলেন আইনস্টাইন। চেকার উঠেছে ট্রেনে। সবার টিকিট পরীক্ষা করতে করতে এক পর্যায়ে আইনস্টাইনের কাছে এসেও টিকিট দেখতে চাইলেন চেকার। এদিকে এ-পকেট ও-পকেট হাতড়েও তাঁর টিকিটটি আর খুঁজে পাচ্ছেন না বিজ্ঞানী। ততক্ষণে আইনস্টাইনকে চিনতে পেরেছেন চেকার। প্রাথমিক উত্তেজনার ধাক্কা সামলে তিনি খুব বিনীতভাবে বিজ্ঞানীকে বললেন ‘স্যার আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি। আপনি নিশ্চয়ই টিকিট কেটে উঠেছেন। আপনাকে টিকিট দেখাতে হবে না।’
তখনও কোটের পকেট হাতড়ে চলেছেন আইনস্টাইন। চেকারের কথার জবাবে কিছুটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, ‘আরেহ না, না, টিকিটটা আমাকে খুঁজে বের করতেই হবে। না হলে জানব কী করে যে আমি কোথায় যাচ্ছিলাম!’
 
প্রথম দেখায় আইনস্টাইনকে কেমন মনে হয়েছিল চ্যাপলিনের? এই বিষয়ে আত্মজীবনীতে চ্যাপলিন লিখেছেন, আইনস্টাইনকে তাঁর ঘরোয়া ‘আলপাইন জার্মান’দের মতোই লেগেছিল। তবে চমৎকার অনুভূতিসম্পন্ন, হাসিখুশি আর বন্ধু্ভাবাপন্ন ছিলেন আলবার্ট। খুব শান্ত আর ভদ্রও। তবে এসব ছাপিয়ে ফুটে উঠেছিল আইনস্টাইনের গভীর ও অনন্য সংবেদনশীল মনের পরিচয়। চ্যাপলিন বিশ্বাস করতেন, এই সংবেদনশীল মনই আইনস্টাইনের অনন্যসাধারণ পাণ্ডিত্যের আধার।
 
অসমবয়সী, দুই আলাদা জগতের বাসিন্দা, তবু প্রায় প্রথম দিন থেকেই জমে যায় আইনস্টাইন আর চ্যাপলিনের বন্ধুত্ব। আইনস্টাইন নিজের বাড়িতে বেশ কয়েকবার আমন্ত্রণ করেন চ্যাপলিনকে। চ্যাপলিনও সে সময় তাঁর সদ্য মুক্তি চলচ্চিত্র ‘সিটি লাইটস (১৯৩১)’-এর প্রথম শো দেখতে আইনস্টাইনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ছবিটি দেখতে আইনস্টাইন নিজে নাকি টুপি পরে হাতে ছড়ি নিয়ে একেবারে চ্যাপলিন সাজে হাজির হয়েছিলেন প্রেক্ষাগৃহে।
 
একই ফ্রেমে চ্যাপলিন আর আইনস্টাইন, সেদিন সন্ধ্যায় এটাই ছিল প্রেক্ষাগৃহের প্রধান আকর্ষণ। তাঁদের দুজনকে দেখতে ভিড় উপচে পরে প্রেক্ষাগৃহে।
 
শো মিটে যাওয়ার পর পথে নামেন দুজনে। এ কথা ও-কথার ফাঁকে চ্যাপলিনের অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন আইনস্টাইন। বলেন, ‘তোমার অভিনয়ের সারল্যই তোমার শক্তি। পর্দায় তুমি একটাও কথা বলনি। অথচ দেখ সবাই কত সহজে বুঝতে পেরেছে তোমায়! তাই তো এত জনপ্রিয় তুমি।’
সামান্য হেসে চ্যাপলিন সেদিন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ঠিকই বলেছেন। তবে আপনার জনপ্রিয়তা এ সবের ঊর্ধ্বে। দেখুন না, সারা পৃথিবী আপনাকে সম্মান করে। কিন্তু বোঝে ক’জন! কিচ্ছু না বুঝেও আপনাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা নেই বিশ্বের।’
 
পরের বছর অর্থাৎ ১৯৩২ -৩৩ সালে কাজের সুত্রে আরও একবার যুক্তরাষ্ট্রে আসেন আইনস্টাইন। সেবার তাঁর সম্মানে একটা ডিনার পার্টির আয়োজন করেন চ্যাপলিন। ডিনারে আইনস্টাইন ছাড়াও আমন্ত্রিত ছিলেন উইলিয়াম র‌্যানডলফ হার্স্টে। হার্স্ট কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম র‌্যানডলফ হার্স্টে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক গণমাধ্যম ব্যবসার পথিকৃৎদের একজন। চ্যাপলিনের ইচ্ছে ছিল র‌্যানডলফ হার্স্টের সঙ্গে আইনস্টাইনের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার। হার্স্টেও মনে মনে সেই ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন। দুজনেরই রসবোধ প্রবল, তাই হয়তো চ্যাপলিন আশা করেছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত আর অন্যরকম হতে চলেছে সেই আলাপচারিতা। কিন্তু কোনওকারণে সেদিনই অন্য কোনও চিন্তায় মগ্ন ছিলেন আইনস্টাইন। অন্যমনস্ক বিজ্ঞানী ডিনার টেবিলে একটা কথাও বলেননি সেদিন। স্বভাবতই চুপ থাকেন র‌্যানডলফ হার্স্টেও। সবমিলিয়ে ডিনার টেবিলে এক অদ্ভুত নিঃশব্দতা নেমে আসে। সেদিনের এই ঘটনায় বেশ কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন চ্যাপলিন।
 
এরপরই বিশ্ব জুড়ে নেমে আসে এক ঘোর অন্ধকার সময়। জার্মানি থেকে ইহুদি বিতাড়ন শুরু হলে আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন সময় আসন্ন। মানবতার শত্রুরা তাঁকেও রেয়াত করবে না। দেশের মায়া ত্যাগ করে পথে নামেন তিনি। প্রথমে যান ইংল্যন্ডে। সেখান থেকে ১৯৩৪ সালের ৭ই জুলাই রওনা হন আমেরিকার উদ্দেশ্যে। তখন তাঁর বয়স ৫৫। প্রিন্সটনের কর্তৃপক্ষ আইনস্টাইনের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন সেসময়। গুপ্তঘাতকের দল যে সাগর পেরিয়ে আমেরিকায় এসে পোঁছবে না, তাই বা কে বলতে পারে। তাই আইনস্টাইনকে গোপন জায়গায় রাখা হল। ফলে সেসময় আইনস্টাইনের সাথে সবারই যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।  আইনস্টাইন আর চ্যাপলাইনর সম্পর্ক নিয়েও এরপর আর কিছু প্রকাশ্যে আসেনি। চার্লি চ্যাপলিনের সঙ্গে বিজ্ঞানীর পরে আর কোনও যোগাযোগ হয়েছিল কিনা তাও আর জানা যায়নি। তবে ক্ষণস্থায়ী হলেও, বিপরীত মেরুর এই দুই কিংবদন্তির মধ্যে যে অসাধারণ শ্রদ্ধা আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top