আমেরিকার ৩১তম প্রেসিডেন্ট

হার্ভাট হোভারের হার না মানার গল্প


প্রকাশিত:
২৩ অক্টোবর ২০২১ ০৮:৩৯

আপডেট:
২৯ নভেম্বর ২০২১ ১১:৫১

হার্ভাট হোভার
১৮৯২ সাল। স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে এক হতদরিদ্র মেধাবী ছাত্র। কোনো রকমে বেচারা এক সেমিস্টার শেষ করেছে। এর মধ্যে খবর এলো মা খুবই অসুস্থ। বাপের দোকান বন্ধ। আঠার বছরের কিশোর ছেলেটির অবস্থা তখন খুবই খারাপ। সে সিদ্ধান্ত নিলো- তার জন্য দুটো পথ খোলা। এক- পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে কামার বাপের দোকান পুনরায় খুলে সংসারে আর্থিক সহযোগিতা করা। দুই-যে ভাবেই হোক পড়ালেখা শেষ করা। কিন্তু সবার আগে জরুরী হলো -মায়ের চিকিৎসা। দ্রুত কিছু অর্থের সংস্থান করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে মাত্র সাত বছর। ছেলেটি এক সপ্তাহ বেশ দৌড়াদৌড়ি করেও কোনো ফাণ্ড যোগাড় করতে পারলোনা।
সে সময় বিখ্যাত পিয়ানিস্ট ইগান্সি জ্যান প্যাডোরস্কি অর্কেস্ট্রা শো করেন। কিশোর ছেলেটিকে কয়েকজন মিলে পরামর্শ দিলো- প্যাডোরস্কিকে দিয়ে একটা শো করতে পারলেই -বিশাল একটা অর্থের সংস্থান হবে। মায়ের চিকিৎসার পাশাপাশি তার টিউশন ফিও যোগাড় হয়ে যাবে। কিন্তু এতো বড় একজন বিখ্যাত মানুষের সাথে সে যোগাযোগটা করবে কিভাবে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মাধ্যমে যোগাযোগটা হলো। তারিখ,স্থান ,অডিটোরিয়াম সব ঠিকঠাক। কিন্তু যে পরিমাণ টিকেট বিক্রি হওয়ার কথা ছিলো তার দশভাগের একভাগও হয়নি। পেডোরস্কিকে দেয়ার কথা ছিলো ২০০০ ডলার।কিন্তু টিকেট বিক্রি হয়েছে মাত্র পনেরশো ডলার। অডিটোরিয়াম ভাড়া সহ অন্যান্য খরচ বাবদ বকেয়া আরো প্রায় সাতশত ডলার ।
অনুষ্ঠান শেষ হলে সে পেডোরস্কির কাছে গিয়ে বললো- এই নিন আপনার পনেরশো ডলার। বাকি পাঁচশত ডলার যেভাবেই হোক ব্যবস্থা করে আমি আপনাকে পাঠাচ্ছি। আমাকে দুসপ্তাহের সময় দিন।
পেডোরস্কি বললেন- কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই এ কাজটি করতে গেলে কেন? ভালো অর্গানাইজার হতে না পারলে -এসব কাজে সম্পৃক্ত না হওয়াই ভালো।
পাশ থেকে হুইল চেয়ারে বসা এক মহিলা বললেন- এ সব করেছে ওর বৃদ্ধা মায়ের চিকিৎসার জন্য।
পেডোরস্কি একটা ডলারও না নিয়ে বিদায় নিলেন।
১৮৯২ সাল থেকে ১৯১৯ সাল। মাঝখানে অনেক বছর চলে গেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধ শুধমাত্র মানুষ হত্যাই করেনা। সাথে একটা সভ্যতা ধ্বংস করে দিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ক্ষুধা, অনাহার, অসুখ, মহামারি, দূর্যোগ সব কিছু রেখে যায়। পুরো ইউরোপ জুড়ে তখন খাদ্য সংকট। কে ,কাকে সাহায্য করবে? এতো বড় জাতি এখন যাবে কই, খাবে কি? খাবার সংকট দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেদিনের সেই পিয়ানিস্ট ইগান্সি জ্যান প্যাডোরস্কি তখন পোলান্ডের প্রধানমন্ত্রী। পিয়ানোর সুর দিয়েতো আর মানুষের ক্ষুধা মিটানো যাবেনা। এই সময় প্রধানমন্ত্রী দফতরে খবর এলো-দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নাই। Gdansk পোর্টে জাহাজ বোঝাই খাবার আসছে। একটি, দুটি নয় পুরো তিনটি জাহাজ। আর, খাবার যিনি পাঠিয়েছেন উনিও এক সপ্তাহের মধ্যে আপনার সাথে দেখা করতে আসছেন।
প্যাডোরস্কি ভাবছেন-আমিতো কারো কাছে খাবার চাইনি। আর এইদুঃসময় কে কাকে সাহায্য করবে? কে আমার সাথে দেখা করতে আসছে। এক সপ্তাহ পর ভদ্রলোক প্রধানমন্ত্রীর দফতরে সাক্ষাৎ করতে এসে পকেট থেকে একটা ছবি বের করে প্রধানমন্ত্রীকে দেখিয়ে বললেন - আপনি আমার অফিসিয়াল পরিচয় নিশ্চয়ই এতোক্ষণে পেয়েছেন। আপনার কি মনে পড়ে, আজ থেকে ২৭ বছর আগে ১৮৯২ সালে এক বৃদ্ধ মহিলার মাথায় হাত রেখে পাঁচশত ডলার দিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য আর নিজের জন্য ১ ডলারও না নিয়ে পনেরশ ডলার দিয়েছিলেন এক কিশোরের পড়ালেখার খরচ বহন করার জন্য। আপনি মন্চ থেকে নেমে গিয়ে বৃদ্ধা মহিলার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।আজ আমি আমেরিকা থেকে পোলান্ডে এসেছি আপনার পাশে দাঁড়াতে। সেদিনের সেই কিশোর ছেলেটিই আমি হার্ভাট হোভার, আমেরিকার ফুড এণ্ড এডমিন বিভাগের প্রধান।আর ছবির এই মহিলা আমার প্রিয়তমা মা।সেদিন একজন অসহায় মায়ের জীবন বাঁচাতে আপনি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আজকে একটা পুরো জাতির জীবন বাঁচাতে আমি আপনার পাশে দাঁড়ালাম।
দূর্ভাগ্য আমাদের । মানুষ খলনায়কদের,গল্প, ঔপন্যাসের নায়কদের যেভাবে চিনে সত্যিকারের জীবন বাঁচানো নায়কদের তেমন চিনেনা।
মিঃ হোভার পরবর্তী সময়ে আমেরিকার ৩১তম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top