শিল্পী ছত্তার পাগলা স্মরণ


প্রকাশিত:
৮ জানুয়ারী ২০২২ ২২:৫২

আপডেট:
৮ জানুয়ারী ২০২২ ২৩:০১

শাপলা বাণু শাপলা বাণু ওই দেখ কামধেণু দুধের গাই।।
বালতি লইয়া খাটে বইয়া বাছুর ছাড়াই দুধ খিরাই।।
- ছত্তার পাগলা।

বিখ্যাত বাউলশিল্পী সিরাজউদ্দীন খান পাঠান চৌধুরী, বাউলশিল্পী ওলিদ মিয়াসহ স্থানীয় শিল্পীরা সশ্রদ্ধায় স্মরণ করলেন বাউলশিল্পী ছত্তার পাগলাকে। শিল্পী ছত্তার পাগলার দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে ৭ জানুয়ারি ২০১৬ সালে মোহনগঞ্জের নলুয়ার চরের নিজ বাড়িতে আয়োজন করা হয়ছিল মিলাদ মাহফিল ও পালা গানের।

গানের একটা রেওয়াজ আছে। এর মুখ আছে। সেই মুখ বন্দনার। নবীরাসুল পীর মুর্শিদ আউলিয়া থেকে শুরু করে শিল্পীদের স্ব স্ব ওস্তাদদের, মা বাবা ও উপস্থিত দর্শকশ্রোতাদের শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে কথা ও গান শুরু হয়। কবিতা গল্প পাঠের কোনো রেওয়াজ আছে ওই রকম? নাই। কেন? বাংলার ভাব ও মরমের সাধনার যদি মুখ থাকে তাইলে বাংলার কবিতা গল্পের কোন মুখ থাকবে না? না, কথিত ইউরোপিয় আধুনিকতার মুখোশ এখানকার কবিসাহিত্যিকদের মুখে বসে গেছে বলে! হতে পারে।

ডান থেকে ছত্তার পাগলার ছেলে পারভেজ, ছত্তার পাগলার স্ত্রী, মেয়ে কল্পনা, আমি ও কবি রইস মনরম।

ছত্তার পাগলাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কথা বলছিলেন, কবি ও গীতিকার রইস মনরম, যার কাছে ছত্তার পাগলার বহু গান ও সুর সংরক্ষিত আছে। শিল্পীর জীবনের মহিমা ছড়িয়ে দিতে স্থানীয় জনগণ ও তার ভক্তরাই ভূমিকা রাখতে পারে।

আদম শয়তানের পালাগান শুরুর আগে বাউলশিল্পী অন্ধ ওলিদ মিয়া বলছিলেন যে, ছত্তার পাগলার গানের রীতি এখানকার বাউলগানের রীতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি গান করছেন খঞ্জরী বাজিয়ে। কিন্তু যারা বাউল গান করেন তাদের যন্ত্রপাতি আলাদা, রীতিও আলাদা। তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি ছত্তার পাগলার গানের অংশ গাইলেন:

হারভেচ্চ্যাইর মায় ক্ষেত বেইচ্যা করে মাতবরী
আমি ছত্তার ভিক্ষা করি।
ছত্তার পাগলা গান করতেন হাটে বাজারে মাঠে ঘাটে। তিনি কম অবহেলার শিকার হন নি! স্থানীয় শিল্পীরা তাকে অনেকসময় গ্রহণ করতে পারতেন না। অথচ ছত্তার পাগলার মূল বৈশিষ্ট্য জীবনঅভিজ্ঞতাকে আঞ্চলিক ভাষায় গানে তুলে ধরা। নেত্রকোনার আঞ্চলিক ভাষার ইউনিক গান এটি; বিখ্যাত গান,

‘হারভেইচ্চ্যারে বল খেলাডা তউবা কইরা ছাড়
আমি তরে না করতাছি ফাগল (পাগল) ছত্তার।।’ বাংলার দর্শক শ্রোতাদের কম আনন্দ দেয় নাই!
‘কে দিল পিরিতের বেড়া লিচুয়ার বাগানে...’।। বিখ্যাত গান। রইস মনরম বলছিলেন, এই গানটি সংগৃহীত। কিন্তু শিল্পী ছত্তার এটিকে মহিমা দিয়েছেন। এই গানের শেষের কয়েকটি লাইনও ছত্তার সাহেবের।

এমন আরো অনেক বিখ্যাত গান আছে, যেমন:
লুঙির নিচে ট্রাউজার পিইন্দা ঢাকার শহর যাই
ইলসা মাছের কিতা অ্ইলো জাইন্যা বুইজ্যা আই।।

কিংবা
রেডিওতে হুনছি আমি টেলি‘শনে দেখছি আমি
কেউ নাই আপন মোর।।
কাঙাল মাইরা জাঙাল দিলে গুনাহ অইবো তর।।
লালচাপুরের ছত্তার পাগলা বাড়ি নল্যুয়ার চর।।

আরো আরো বিখ্যাত গান:
শাপলা বাণু শাপলা বাণু ওই দেখ কামধেণু দুধের গাই।।
বালতি লইয়া খাটে বইয়া বাছুর ছাড়াই দুধ খিরাই।।

কিংবা
কেশরী লো কেশরী পাইকুড়া তর খালার বাড়ি
মোহনগঞ্জে উঠবে গাড়িত সেকেণ্ড কেলাসে।।

তার এই রীতি ও বয়ান বাংলা গানে কিছুমাত্রায় হলেও নতুনতার স্বাদ যোগ করেছে, সন্দেহ নাই।

সিরাজউদ্দীন সাহেব ১৯৭৭ সালের কথা উল্লেখ করে জানাচ্ছিলেন, ছত্তার পাগলার সাথে তার প্রথম সাক্ষাতের কথা। নেত্রকোনায় শিল্পীদের প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সেখানে ৪২ জন শিল্পী ছিলেন। ছত্তার পাগলা দুই মেয়েসহ বসেছিলেন অন্যান্য শিল্পীদের মাঝে। সেদিন একজনের অনুরোধে ছত্তার পাগলার যে গানটি করেছিলেন,

নবী মোর পরশমণি নবী মোর সোনারখনি...

এই গানের রচয়িতা সিরাজুল ইসলাম। বিখ্যাত বাউলশিল্পী চাঁন মিয়ার শিষ্য সিরাজ উদ্দীন সাহেবের ভাষায়, তা আবদুল আলীমের কণ্ঠের চেয়েও মধুর ছিল। নিশ্চয়ই এমন প্রশংসা ছত্তার পাগলার জীবন ও কর্মকে অনেক মহিমা দেয়। ছত্তার পাগলাকে অনেক ছোট-মাঝারি শিল্পীরা হয়ত হেলা অবহেলা করেছে, কিন্তু মনে করি, গুণী শিল্পীরা ছত্তার পাগলাকে ঠিকই চিনেছিলেন।

আদম শয়তানের পালা শুরু হলো। অনেক দিন পর, বলা যায় ১৯৮৩ এর পরে কোনো পালা গান শুনি নাই। শীতের কুয়াশার আচ্ছন্নতার মতন আমাদের মনও আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলো আদম শয়তানের নাম ভূমিকায় সিরাজউদ্দীন এবং ওলিদের যুক্তি ও খণ্ডানোর তর্কাতর্কে।

যে পরভেজকে নিয়ে গান লিখেছেন ছত্তার পাগলা তার সাথে কথা হলো। বিদায়ের সময় আবেগে কাঁদছিলেন তিনি। পারভেজ একজন স্বচ্ছল ব্যবসায়ী। দেখা হলো ছত্তার পাগলার স্ত্রীর সাথে। তার মেয়ে কল্পনার সাথে, যে ছোটবেলায় তার বাবার সাথে ঘুরে ঘুরে গান করত। বড় মেয়ে পারভীন আসতে পারে নাই। সেই মূলত বাবার গানগুলো করতে জানে। অন্য শিল্পীরা কেউ ছত্তার পাগলার গান করে না। ছত্তার পাগলাও অনের গান কম করেছেন। মনে করি, নিকট ভবিষ্যতে ছত্তার পাগলা আরো গরিমা নিয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।

আমরা বিদায় নিয়ে আসছি। আমাদের কথা দিলেন শিল্পীর মেয়ে কল্পনা, তার বাবার প্রয়াণ দিবসে এমন উৎসব ভবিষ্যতে আরো সুন্দর হবে। রইস মনরম, মোহাম্মদ আকবর, আব্দুল হালিম আর আমি কুয়াশা ভেদ করে করে নিজের মর্ম ও ভাবের কাছে মিলিয়ে যাচ্ছিলাম; পেছনে শত শত মানুষ আর ছত্তার সাহেবের ছেলে পারভেজ, ছত্তার সাহেবের স্ত্রী ও তার মেয়ে কল্পনার মুখ ও মায়া রেখে।।

আহমেদ স্বপন মাহমুদ
কবি, সমালোচক ও গবেষক।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top