আনন্দ মজুমদারের একগুচ্ছ কবিতা


প্রকাশিত:
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১২:২৯

আপডেট:
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১২:৩৩

আধুনিকতার আদ্যোপান্ত

আনন্দ মজুমদার


নৌকা তরত্বর

হাঁস চরাচরে, বাঁশির ছেদায় হংসধ্বনি
দুই হাজার দুইশ ত্রিশ ত্রিশ নদীতে শুধু হাঁস আর হাঁস

সাতান্ন ধারার দেশ বাংলাদেশ
দুইশ ত্রিশ ধারা দিয়ে সাতান্ন গুণ
আইকুম বাইকুম বাইগুণ
হাম হুম হাম হুম রাইগুণ

পলির বুকে নদী মানেই স্রোতের বিন্যাস
রাইগুণে শরমিন্দা সকরুণ ধারা
আমার বাঁশীতে দুইশ ত্রিশটি ছেদবিন্দু
সাতান্ন রাগিনী বাজে প্রশস্ত প্রশ্বাসে
সুরের প্রস্বেদনে

নদী মানেই পানিহারা গ্রামের ডাকঘর
নদী মানেই পলির শিরায় ছল ছল রক্ত
নদী মানেই পালে পর্যাপ্ত হাওয়া।।


একশ একষট্টি নম্বর কয়েদি

ছাতিয়ানী ছায়া
রাত; কালো টুপি পরানো হয়েছে
আটকোটি মানুষ বিহিত বিধানের আশায় জলভেরী বাজায়
আটকোটি মানুষ আঙুরলতার মতো ঢেউয়ে ঢাক বাজায়
আটকোটি মানুষ বাড়ি ঘর ছেড়ে বিজোড়ে বিজোড়ে নূহের নৌকায়
পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিস্বর
জঙ্গল মহালে প্রতিকন্ঠ

পিঁপড়াও সোলাইমানের সৈনিক হয়ে যায়
পাখিদের ডানায় ডানায় যুদ্ধ বিমানের গতি

সাড়ে সাতকোটি মানুষ ছিলো ঊনিশশ’ একাত্তরে
ভারতবর্ষের সাড়ে আটকোটি যোগ পঞ্চাশ লক্ষ
বংলাদেশের ষোলকোটি
উত্তর-পূর্বের চার কোটি পাগলপন্থী
চীনে জলশহীদ লক্ষ লক্ষ
ভাটিভূমে আজ নদীও শরণার্থী

মেঘের শিকল তার পায়ে
বেড়িবাধ পরানো হয়েছে হে নদী!
আপনার সিন্ধুসজল চোখে আমারই চোখ দেখি।।

 

ফান্দের বগা

ফান্দের বগার জন্য কান্দন থামে না, জেলখানার বন্দীর জন্য চক্ষে পানি আসে না
হাওরে হাওর ঘুরে হাছনের হাহাকার, জলে আর ফুটে না গানের অঙ্গার
টাঙ্গুয়া হাকালুকি হাহাকার করে_ কতো পাখী ডুবে মরে অস্তিত্বের চিক্কুরে
বন্দে আলীর কথা মনে পড়ে যায়; শাপলাশৈলী তার ছন্দের বয়ান
শুনেছি সঙ্ঘজীবি ডাহুকের শৈশবের সীমানায়
জল ফোটে শাপলায় নাকি জলে শাপলা ফুটে
এই কথা ভেবে ভেবে ডাহুক মরেছে
নাচে নাচে শাপলা নাচে মণিপুরী নাচে
বা’হাল ঠমকে নাচুইন লাইনৃত্য ধাঁচে

গোপন পানির স্রোত মাছের মর্তবায়
দাঁড়পালে বাঁধা জ্ঞান স্রোতের জিজ্ঞাসায়
পানিপূর্ণ হাকালুকি বক পাঠ করে
আপনাদেরই প্রনীত আন্তর্জাতিক রামসাইর কনভেশন

শাইর করে উড়ে যায় জালালি কইতর
তরফ রাজ্যের দিকে শ্রীহট্ট থেকে

পাখিরাও সংবাদ দেয় হানাদার আসে
বগী বলে যায়, ফাঁদ পাতা আছে কোথায় কোথায়
ফাঁদ পাতা আছে, জলের শব্দে বগী কুচকাওয়াজ দেখে
টাঙ্গুয়ার হাওয়ার এসে বগার বগলে
উষ্ণ ক্লান্তি খানিক জিরায় ঠোঁটে

ঠাহর করে দেখো, বন্দী জল কুচকাওয়াজের কুলকুলধ্বনি
ঠাহর করে দেখো, বন্দী জল শ্যাওলা-খাকি আস্তরণে ঢাকা
লক্ষ্য করে দেখো, ছেচল্লিশটা হাওর মহাশোল হয়ে চাঁদনী হাছিন রাতে
হাছনরাজার কাছে প্রাণভিক্ষা করে
প্রতিরক্ষার ঠাহর ঠার আড় ও আড়িপাতা প্রতিবেশে থাকে

যুদ্ধের কোন পরিবেশবাদী তত্ত্ব নাই
ধনুক ত্যাজ্য তীর তূণচ্যূত হয়ে বিঁধারবিধান ধনুকের জ্য্যমিতির কাছে নাই
অস্ত্র স্বয়ং লক্ষ্যস্থির করে

আমি তো পাহাড়ের দ্রবীভূত হয়ে পড়া দেখি
আর দেখি আমার জন্য, আমাকেই নির্বংশ করার জলমঞ্চ দেখছি
আমি তো আগামির যুদ্ধের ফ্রণ্ট দেখছি
আমি সম্পর্ক সমাপিকা একটি ক্রিয়াপদের কুচকাওয়াজ দেখছি।।

আমি তো আগ্নেয়াশ্রু দেখছি
মণিপুর থেকে চীন
নেত্রকোণা থেকে কুড়িগ্রাম

নদীর মতো আর্তনাদ করে উঠতে দেখেছি
আমি দেখছি পাগলপন্থীদের মিছিল

আমি সম্পর্ক আলোচনা করি, পরিবেশ নয়
আমি তীরবিদ্ধ বুনো কাঁঠালকে আমার যুদ্ধের অংশ মনে করি
যুদ্ধ করতে করতে হাকালুকি হাওড়ের সব মাছ খেয়ে ফেলি
আমি ডলফিনের পিঠে চড়ে সাঁতারের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলি
আমি আগামির গজব নয়, এখনই গজব দেখি।।

 

অচেনা হাজার জলা

হাওরে হাওরে হাওয়া হাহাকার করে
জলজুড়ি করে হাওয়া শাওনী বাসরে
সাজাও হাওয়ার পাল শাপলা সুন্দর
নকশা খচিত নাও ঘাটেতে নোঙর
বউ সেজে বসে আছে বিকালের বিষাদ
হাওরে হাওরে আজ শুধু মনস্তাপ

হাকালুকি হাওর বলে, মানুষেরা আমাদের প্রতিনিধি নয়, ওরা জলে নামে না, জেলে নয়
টাঙ্গুয়া হাওর বলে, ঢাকার মানুষেরা ঢেঁপ খায় নি, শাপলা রাঁধে, শাপলার শোভা শুভস্য কাব্য করে
টাঙ্গুয়া হাওর বলে, টাঙানো পোস্টারে, প্ল্যাকার্ডে, মিছিলে, ঠাঁয় দাঁড়ানো সমাবেশে, আমারই রুপ রূপকথা মাত্র
টাঙ্গুয়া হাওর কয়

টিপাইমুখীন চলো নিজেরাই যাই। নিজের প্রাণের শর্ত নিকারিরা কাটে
কাটা ধারা রক্তাক্ত ধড়ফড় করে। ইতিহাসের কাটা কল্লা মাথা ছাড়া মাছ
আমারই বুকের খুব কাছাকাছি ফরিয়াদ করে। আমি তো জলের ধারা
নি;শর্তে ভিজাই। ধারার ধড়ফড় যারা প্রসবের কালে দেখে নাই
ম্রৃত্যুর মুখোশ পড়ে বসে আছি স্রোতরিক্ত বুক হাহাকার করে

টগার হাওর কয়, মাঝে মাঝে মেঘনাও ধীরে বয়
অনন্ত অব্যয় কালে পাটায় পুতায়
মরিচের ঝাল যেন নিজেই চমকায়
হাওয়ার হিয়ায় যতোটা ছড়াই আমি বাসন্তি নিদান
আপন অস্তিত্বের বিধান রচে অন্যজনা
আদিগন্ত বিকালের ছায়া সূত্রপাত
আমি চাই আমারই শাপলা ফোটা নিজস্ব প্রভাত

ফুল হয়ে উঠার রাজনীতি করি। প্রস্ফুটনউন্মুখ ইতিহাসের জন্য একসাথে আত্মস্ফুরণ অধীর।

 

লঙ্গাই স্টেশনে কিছুক্ষণ

লঙ্গাই স্টেশনে এসে ঝিরঝির করে সব জিরানীর দায় ভুলে দাঁড়িয়েই থাকলাম।
অবুঝ শিশুর মতো কান্নাকরুণ নয়, চটপটে, জন্ম হলে নাম হয়, নাম হলেই নিন্দা হয়;
বেনামী নিন্দায় কিছু আসে যায় না।

স্রোতদের ভাগ থাকে, থাকে ভাই ভগিনী_ কলস্বর খরতাল কিংবা থাকে সঙ্গীত সাংকেতিক
অপেরা অপর করে যাত্রা। গান হয়ে ভেসে যাই মহিমা আমি কিংবা মনীষা।
জম্পাই থেকে লঙ্গাই কোন রেলপথ নাই। শাশ্বত স্বাধীন নদী অন্তর্গত সংকল্পে জম্পাই পাহাড় থেকে জম্পেশ
জামাই আদরে আসেন নিজেই বাজিয়ে সানাই এইখানে এই লঙ্গাই স্টেশনে

স্টেশনে আচকান পড়ে মৌজ মেহফিল কবি দাঁড়িয়ে আছেন
এতো সুন্দর কবি কেউ দেখেনি আগে কখনো
অবোধ তটিনী জানে এইখানে প্রবাহ অভ্যর্থনা সারাংশ সাধন
অন্য পথ ধরে, প্রবাহ বলেছে, চোখাচোখি হলে হয় ভক্তের বোধন

এই লঙ্গাই স্টেশনে জলঘড়ি হাতে কবি সময় দেখেন
প্রবাহ পরিক্রমণ ঘড়ি
কালের সাঁতারের পাঠ বিদ্যাবিমোহিত কবি
তটিনীকটির খাঁজে আলগোছে জড়ান
অক্ষরের আদি সীমা অতিক্রম করে প্রবাহিনী তোমাকেই দূরে ঠেলে দেয়
এটাকেই আমরা বলি বিদ্যামোহিনী হরফ বিজ্ঞান
ঢেউয়ে ঢেউয়ে উতরোল সাধকের শান
কালের কুজন অনুচ্চারিত সম্পর্কের আজান
প্রতিধ্বনিময় উষালগ্ন উজান আসে একেবারে কবির পাদদেশে

ভাটি ও উজানের প্রতিরক্ষার পয়গাম এই লঙ্গাই স্টেশনে
ভাটি ও উজানের সম্পর্ক বিরচিত এই প্রতিরক্ষার পয়গাম

হাকালুকি হাওরের বুকে রেল ঝকঝক পথে
উড়ে যায় আসমানী জালালী কইতর

লঙ্গাই চলে গেছে হাকালুকি হয়ে জুড়ি নদীর কাছে
জুড়ি জোড়া লাগে ধারার ধর্ম মেনে কুশিয়ারা সমীপে তার বুক সুরমার শান্তি খুঁজে

আমাদের প্রবাহ প্রকৃতি
আমরা উত্তর থেকে দক্ষিণে, পূব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত

হেমন্তে আমারই লহুপয়োধরেম আমারই বুকের ঠিক মাখখানে
জমাট বেঁধেছে আমারই দুখী অশ্রু আকুল জল

সুরমা কুশিয়ারা কালনীর পাড়ে
রাজা হাছন লিখে যান অশ্রুর অক্ষরে

আমি তো একা এক কবি লঙ্গাই স্টেশনে
ইতিহাসের মেইল ট্রেন আমারই অপেক্ষায় থাকে

এই পথ তিনশ কিলোমিটার ঘুরে
বারাকি বারাকির সেই পথ ধরে
উজানের ইঞ্জিনে উজানী ভবিষ্যত ভাটি থেকে তুলে
আমরাই ইতিহাসের আগামী
ভাটিই উজানের সার

কোথাও পঁচানব্বই মাইল জুড়িতে জোড় হয়ে যায় লঙ্গাই
ভাটিতে এসেই ইতিহাসের নতুন আকাকিয়ায় প্রবাহের প্রয়োজনে
আমাদেরই জন্য শান্ত ধীর, নিটোল শৈশবের দুষ্টুমি ছেড়ে
দীর্ঘ পথ পরিক্রমার প্রস্ততি নেয়।
আমরাও স্রোত, তোমারই স্রোতের সমীক্ষায়
ইতিহাসের প্রধান পরীক্ষক

এই লঙ্গাই থেকে আমি যাবো বিপন্ন সুরমার কাছে
এই লঙ্গাই থেকে আমি যাবো আমাদের আগামীর ইতিহাসের কাছে।। ( অসমাপ্ত)

 

টিপাইমুখ গ্রামে প্রমীলাবিহার

চার সহস্র বছর একটু একটু করে কাঁদছি
পাহাড়িকা চোখ ফাটে নাই তখনো
অশ্রুকন্যারা তখন মাত্র ছুটে ছুটে খুঁজে হয়রান নদী
সাগর গর্ভবতী হলো
পলিপ্রকরণে এক বিমূর্ত রেখারুমঝুম, নাচুনিনাব্যতায়
উদাসী উৎসর্গ করে বুকের মিহিন পলি
চারপাশে চোখ ফুটে প্রাণপ্রকৃতির

প্রমীলাকে বলছি, মনে পড়ে জৈন্তার দরবারে ছিলাম একমাত্র চারণ কবি
আমার চারুবাক, অক্ষরের জন্য হাহাকার করে উঠা পদ্যময় চারু সুরমাখচিত চোখ
আমি লাই নাচে লাস্যময়ী পদ্য হয়ে নিজেই কাব্যময়

এমন সময় কবিতাকালকন্ঠ আমি আপনারই প্রেমে
গ্রেফতার করি যজ্ঞের ঘোড়া
সে-ই ঘোড়া ফিরে পেতে কুরুক্ষেত্র থেকে অর্জুন ছুটে আসে

আমি আপনারই প্রেমে বার বার ফিরে যাই টিপাইমুখে
মনে পড়ে, দুরন্ত ঘোড়ার মতো
বরাকের ঝরণার মতো
আমারই কটিদেশে আপনারই হাত আমাকে পাহাড়ি লতার মতো হিয়াহিন্দোল অঙ্গবিনোদিনী

জৈন্তার পাহাড় থেকে সেই যজ্ঞের ঘোড়া হিঁয়া হিঁয়ো, তাকালাম নীচে
অই তো সাগর, আমাদের আগর কাঠের নাও
অই তো দেখা যায়, অর্জুনের দূরাপেক্ষিক দূরে অর্জুনের নাও
যুধিষ্ঠির সত্য হারায় জৈন্তায়
বাংলার ভূমিষ্ঠ হবার সেই সব মুহুর্ত আমরা দেখেছি প্রমীলা একসাথে

না, এটা অর্জুনের নাও নয়
গোষ্ঠ জ্ঞানহীন গোপিনী সংস্রবহীন অর্জুন জৈন্তার উপকূলে
নাওনিনাদিত ঢেউয়ে আসে নাই আগে
চারটি ঘোটক আর চার সেনা পিঠে
তার তীর তণূচ্যূত ধনুক বেশী বাঁকে
সশস্ত্র সাধনায় তার কেটে গেছে কাল
তপোবনে তপস্যার সহস্র বিকাল

সত্য শরমে মুখ ঢেকেছে গোষ্ঠ ঘুম ঘুম পশ্চিমের আকাশ

আমিও যজ্ঞের ঘোড়া নিয়ে ঠিক দাঁড়িয়েছি টিপাইমুখে
এসো অর্জুন, পাহাড়ি লতার মতো বহমান ধারায়
প্রমীলার সাথে দেখা ভাটিভূমে প্রতিদিন নদীর জনম
সাগরের নীরব প্রসব, বাংলার প্রসার, আমরা নেমে গেছি প্রতিটি জন্মের ক্ষণে
স্রোতধারা হয়ে
নদীর জন্ম হয় ভাটিভূমে
ভাটি যতো ভাটি হয় নদী হয় ততো
উজানে পাহাড়িকা অশ্রু সদা শাশ্বত।।

 

শরাবতী নদী

করাতের কীর্তনে করাতির সুখ, বৃক্ষের তাজা গুড়া, কোষ
করাতসঙ্গত আর্তনাদ, মাঁচায় শায়িত তার কাষ্ঠতণু
আমি কাঁদি

আর্তনাদ উতরোল সময় এখন
যতো মেঘ চোখের কোণে এই বৃষ্টিবৎসল অসমে
গীতল গেরিলা মন শিস দিয়ে যায়
মায়াবী কামরুপ-কামাখ্যায়

আমার বাংলার নারী
প্রমীলা বিহারের আগে বলেছিলো, যেয়ো জৈন্তিয়ায়
যাদুর বাক্স আছে কামাখ্যায়

কুহকী মেঘের ছায়ায় আসাম ঘুমায়
ঠাডা পড়া বাজ বাজে কিরাতিয়ায়

স্রোতের করাত কাটে ফুলের তোল
পুরা ফুলেরতোল জলের তলে
মিজোরাম –মনিপুর জলের তলে

আসমান থেকে ঘুড়ি বেয়ে বিদ্যুত নামে
নৌ গেরিলারা সব বাঁধ কেটে দেয়

রুখে দাঁড়াও আন্তর্জাতিক বাঁধ ব্যবসায়ীদের
টিপাইমুখের নীচে ফুলেরতলে ব্যরেজ কেটে দাও
আটচিল্লিশ বিলিয়ন কিঊবিক মিটার পানি চাই
সিলেট, নেত্রকোণা, মৈমনসিঙ্গহের পাঁচ কোটি মানুষ জেগে উঠো
এক শত আটচল্লিশ প্রজাতির মাছ বিদ্যুতের টারবাইনে খুন করা হবে
পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া ইলিশ আর ফিরে আসবে না

ব্রক্ষ্মপুত্রের উপর একশ আটচল্লিশটি বাঁধ নির্মিত হচ্ছে

সাবধান!! এখনই কুচকাওয়াজের সময়
এখনই হরিণের সাথে কুচকাওয়াজ করো
এখনই বাঘের সাথে হামাগুড়ি শিখো
এখনই হে গেরিলাগণ! পুরাতন ইশ্তেহার আবার লিখে ফেলো
এক প্রাণ প্রকৃতির সম্মিলিত কংগ্রেসে

এখন একা হওয়ার সময় নয়, ঐক্যের সময়
এখন কান্নার সময়, অগ্নি অশ্রু কাল, বয়ে যায়

এই সব বাঁধ সমুদ্রের ফাঁস
এই সব বাঁধ সমুদ্র মন্থনের বাসরঘরের দেয়াল নয়
এই সব বাঁধ রাজনীতির বন্ধ্যাত্ব
এই সব বাঁধ বিকাশের বিনাশ
এই সব বাঁধের বেড়ি পরে মরে যাবে সে-ই পাখী, হরিণের কুচকাওয়াজে মুখর বনজোড়া
প্রাণী ও প্রকৃতির পরাণ সুদূর আশ্রমে যাওয়াও আগে, বঙ্গীয় শরণার্থী শিবিরে আসার আগেই
আহা! শেষ! আহা! নাই

এই বাঁধ প্রাণের মহাশ্মশান
এই বাঁধ তা-ই সমরতান্ত্রিক

উজানে ষোলটি গ্রাম পানির তলায় যাবে
মণিপুরে
ছিয়ানব্বই গ্রাম বন্যার কবলে
কোথায় তোমরা!! আসামে- মনিপুরে-মিজোরামে-সিলেটে-নেত্রকোণার গেরিলা ও পাগলপন্থিরা
এসো!! ধনুকের মতো বাঁকানো ভূগোলে
কর্পোরেট মণিপুর-মিজোরাম- বাঙ্গালায় ভূ-বিভাগ বিভঙ্গের

আমার জন্ম কোষ পলি চাই
আমার পলিপাগল বাংলার প্রাণ চাই।।
করাতিয়া রাজ্যে সুরমাও ছিলো শরাবতী
শরাফত স্রোত আজ শুকায় যদি
তবে আমি প্রাণ দেবো
আমি জানি, জানে সবাই, নদী পূণ্যবতী।।


কিরাতিয়া

স্বাস্থ্যসুন্দর রোদ, ঘোড় দৌড়, আকাশে
তপ্তকুন্ড প্রস্রবণে গোধূলির গোসল, স্নান যদি সত্য হয় দেহ সত্য নয়
স্রোতেরা স্নাত হয় ধারার সত্তায়
আকাশের পাহারায় বিজলি আচমকা চমকায়
ডানা কাটা সুরে আজ সন্মিলিত সীমানায়
কিরাতিয়া রাজ্য জোড়া কুহক কনকনে শীতল মেঘ জালারির ডানায়
বরফকুচির কান্না_
এমন ঊড়াউড়া, এমন উড়ন্ত উদাস কাল উজানিয়া হাওয়া
নিঃসঙ্গ নিস্তরঙ্গ ডানায় হাওয়া নাই, হিন্দোল নাই, হাহাকারময়
আমি এক জালালী কইতর

তপ্তকুন্ডের স্নান আবেশ আভায়
কিছুটা বাষ্পছিটায় এক প্রাগৈতিহাসিক পূর্ণিমায় ইতিহাস ফরজ গোসল সারে

এখন ঘুমের সময় নয়, এখন ওজুর সময়
মোনাজাত মহব্বতে ডানার দুন্দভি যেন বাজে
যেন ঊড়াল উদ্দাম কাল স্বয়ম্ভু কায়ায় ডানায় ঠিকরায়

এমন রুপরসায়ন দেখিনি কতোকাল
তপ্তকুন্ড প্রস্রবণে গিয়ে আমিই অন্তর্গত অগ্নিকুণ্ড।।

 

কিরাতিয়া

টেডিটনটনে প্যণ্টালুনের আগে চল ছিলো না
দুইবার দেখা গেলো
বেলবটমের আগে ও পড়ে, গোড়ালির কাছে থলথলে পেট।

 

শিবের পঞ্চম সংস্করণ

গ্রীবাপিঠে হে মহামতি শিব! আমি সতী সাহর্চযেই আছি। সাঁতারকূলে জন্ম আমার। শরাবতী সুরমার পানি ধুয়ে দেয় পাপ। আমি পবিত্র হয়ে পৃথিবীর গ্রীবাপিঠে তিল হয়ে থাকি। অমর নিয়েছে স্বাদ মরণের। একান্ন পীঠের পাঠে মনোযোগী আমি। গ্রীবাপিঠে হে মহামতি শিব, আমি প্রাণ প্রদায়ক হয়ে আপনারই মতো ঘোর ঘোর ঘুমঘুম। একটিই নাচ আমায় শিখিয়েছেন। প্রলয়প্লাবনিকা নাচ যবনিকাহীন। সিলট’র গ্রীবাপীঠে আজ আবারো একান্ন খন্ড সিতার সংসার। আবারো বিষ্ণুচক্র তান্ডব তল্লাটে আমাদের উত্থিত হাতেরই অপেক্ষায় থাকে।

গ্রীবা পড়েছিলো খাদিম নগরে
বাম জঙ্ঘা পড়েছিলো জৈন্তায়

অমর আরণ্যক ভাটিভূমে স্রোত হয়ে বঙ্গজ পংকজ পদ্ম হয়ে নিজেরে ভাসায়
হায়! আমি তো আছি গ্রীবাপীঠে ইতিহাসের খাদিম

মনুর হাওয়ায় জালালি কইতর উড়ে
প্রবাহ পবিত্র হয় কুসুমিত ঊর্মির ঊর্ণি খসে গেলে
শিবানীসত্য নাচে প্রাণপুষ্ট হলে
মাছের মন্দিরে
সাক্ষীর সন্মানে অতলে অটল শৈল বিছানায়
স্রোতের সাথে একপশলা গড়াগড়ি খেলে

হে মহামতি শিব! সাঁতারকূলে জন্ম আমার। গাঙকূলে বাড়ি। কলসকলকল জল আর নদীর কংকালে নাই। সতী ও সঙ্গগোপনে আমারই সতীর্থ। অভাগার রাই। হরিপুর। মনু। জাহ্নবী জলান্ধ হলে নদী একা কাঁদে। আমি তো পুরাদস্তর মোহনার সঞ্চয়িতা। কখনো মাটির কলসি, কখনো আকাশী আগুন।


সিলেট

আধুনিকতার আদ্যপান্ত

“তৃণ লতার রাজনীতি আর রাজনীতিকে তৃণলতায় পর্যবসিত করা এক জিনিস না…”

এক বিঘত ও এক বিঘা জমি আছিল
পাশে আমার পাহাড় ছিলো
আমি সে-ই পাহাড়ে বউন্যা ভুত হয়ে ঘুরে বেড়াতাম
একদিন পাহাড় দখল হয়ে গেলো
কোনটা আমার রাজনীতি, পাহাড় না দখল!

পাহাড়ে পানির বেড়া দেয়া হলো
নদী নাচতো
উপরের নাচ নিম্নগামী হয়
আমার রাজনীতি দখলদারদের চিনে রাখে
গাছের কান্ডে রাজনীতির ফুল ফোটানো এতো সহজ নয়

পাহাড়ে পাহাড়ে ভূমিকম্প
গজব বেশী আসে
গজব মানেই বিপ্লবের বৈষয়িক পরিস্থিতি
ইতিহাসের চোখ ঠার, ইংগিত

এই যে দেখো, পরিবেশবাদ পুঁজিতন্ত্রের পোষা মানবতা
গোলাপি নক্ষত্র, ফুল ফুটেছিলো
জঙ্গলের প্রাণ বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে
দখলদার আড়াল করো।।

বার্মাফ্রন্টে আজাদ হিন্দ লং মার্চ করছে
আমাদের বাড়ির কাছেই নিলয় ঘাঁটি
আমরা ভাবছি এই যুদ্ধে হরিণের গর্ভধারণে কতোটা ব্যাঘাত ঘটায়

আম্বিয়ার মায়ের কথা ভুলে গেছি
এই বছর তার পুত্র সন্তান দেবার শেষ সুযোগ
প্রাণ নিয়ে ভাবতে ভাবতে ফুলের জান চলে যায়
ফুল বাঁচাবার যুদ্ধ
ফুল বাঁচাবার প্রসূনবিজ্ঞান
আলাদা জানা, এক সাথে জানা, আলাদা
রণধ্বনি শুনি আমি, জংগ জংলায়
প্রাণ দখলের যুদ্ধে আমি জিরাই পত্রছায়ায়
ফুল ফসল আর নদী আমার হয়ে উঠে ঘাঁটি ……

দখলদাররা মানুষের কাছ থেকে নদীর কাকুতি মিনতি শোনে না
নদীর নিজস্ব প্রতিরোধের ভাষা মানুষের কাছেই থাকে
এক সামরিকতান্ত্রিক লড়াই হয়েছিলো
সেই লড়াই পলাশীর
তীরবিদ্ধ আম নিয়ে যারা ভেবেছিলো, তারাই সুশীল পরিবেশবাদী

এই সময় পুরা প্রকৃতি হয়ে উঠবে যুদ্ধেরই অংশ
এমনকি লাল পিঁপড়া পর্যন্ত
এখন হানাদার হটাবার সময়।।

বরাক নদীর বাঁকে
আমরা প্রস্তাব করছি যে বরাক নদীর বাঁকে যাবো;
দীনহীন সুরমার পাড়ে বরাকি বিকালে
রক্তের বরফির মধ্যে দানা দানা ইতিহাস বইবে
টিপাইমুখ টান টান উত্তেজনায় খাসিয়া খাসা তীরের মতো

আমরা প্রস্তাব করছি
যে গর্ভে নদী হয়ে উঠার কারণ ধারণ করে সেই মূলের আবেদন উশুল হয় ধারা যতো ভাটি ভাঙে। আগায়। ভাটি ও উজানের সম্পর্ক সমুদ্রে বিলীন হয় না। ধারার ধারাবাহিক সম্পর্কই নদী। ফলে নদীর জন্মস্থান নাই।
আমরা একশ আশি মাইল বেগে মনিপুরের দিকে যাবো
লাই নাচে লাস্যময়ী হয়ে উঠছে নদী
আমার চোখে সুরমা, তোমার চোখে পাহাড়ি শিশির কণা
আমরা সেই দূর গহীন বনের অন্তস্থলে হাছন রাজার সাথে মণিপুরী নাচি

আমরা প্রস্তাব করছি
কালনিরবধি প্রবাহমান ধারা শৃঙ্খলিত করে বাঁধ। সাপের মুখ থেকে পানি পড়ছে। একটা অজগর পাহাড়ে পাহাড়ে হিস হিস করছে। তিপান্ন অভিন্ন নদীর উপর প্রতিটি বাঁধই আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। কোন কোন হুকুমত, বিধি বিধান হুমকি হয়ে ঘাড়ের উপর থাকে। টিপাইমুখের দিকে যেতে হবে।

তোমাকে দেখে মনে হলো বৈষ্ণবী
কিছুটা বিষ্ণুপ্রিয়ার মতো, কিছুটা আমারই অন্য অধ্যায়
আমরা সে-ই ধরে ধরে হাঁটি
মানুষ দেখি, খাসিয়া খাসা তীর মনিপুরী নাচের মতো এই মাত্র ধনুক ছেড়েছে
আমরা যাবই, যাবে যদি, যাও না ক্যানে, আগুন নিভে গেলে আগুনই তো নিভে।।

২।

ভাটির ভূগোল নদী দিয়ে গেছে কবলামূলে
পঞ্চ মৌলিক দশায় জঙ্গের শর্ত দালিলিক অক্ষরের জংগলে নির্ভুল জ্বলজ্বলে
নিজের নির্বাণ দশায় নির্ঝর খোঁজে
নিজের আগুন অন্যে ন ছড়ায়
আপন আগুনকুন্তলে ন যদি বাঁধে বিকালের সমস্ত খোঁপা

দোল
রাধে উতরোল
রাধে রাধে রোল
প্রণয়নী গো, ইশকে ইলাহির বেশে রাহে রাহে রূপ রূপ
ভাবভোগিনী গো, মগনমমজ্জুব কাল, হায় হায়, রোদসী,” প্রণয় বিকার-স্বরূপ”
জলদাসী চোখ, তামাম দুনিয়ার পেয়ারের ভারে রোদসী, রোদসী
আহালিদা হ্ললাদি দেহধরা মর্দামি, চঞ্চলা কামিনী কান্তি
আপন দ্বিজ রূপে, নানা বীজে, নানাহ শস্যসংকল্পসম ফুটে আছি দৃশ্যের খাতিরে
আলিদা চিম্ময়, আলিদা আদরিণী, নিগুমে নিশ্চিন্তে জানি তুমিই আমি
আজ দোল
দোলন দুল, আজ দোল, দোলন ছলন, মিলনকোল
আজ দোল
আজ চোখাচোখি
আজ দোল
অদ্বৈত তবু দ্বিত্ব বোল
আজ বোল গৌর গোপন কথা
যিনি রাধা তিনিই শ্যাম
শ্যামাঙ্গে রাধা, রাধা অঙ্গে শ্যাম
আজ ই ঈশ্বর মানুষ হয়ে উঠেন
আজ দোল, আজ দ্বৈতদ্বিভাগবিলীন, মিলনকোলে, মিলনেই মহব্বত মহামমিম
রাধে রাধে উতরোল
আজ দোল, দোল, আজ দোল।।

শ্রীচরণে নিবেদন
চরণ কমলে চিহ্নের মূল চিনি, গৌরগোপন গোপিনীরা সব ভাবে ধরা পড়ে ধরা
শচী শুভ ধারা, শুচি শোভা তারা, উদয়ন হায় হয়
গর্ভসিন্ধু উছলিয়া উঠে, লীলা সহচর, নিজের আকর গর্ভবিন্দুতে পায় আশকারা
আহা, ধরা পড়েছি
আহা, ধরায় পড়েছি
কী রূপে মজনুমগন,কী সোয়াদে কতো ঝাল, ভাঁড়ারে মিষ্টান্ন রূপে তার ভান্ডে কেমনে আছি
কী ভাবে হয় দুইয়ের মিলন
কোন ভাবে হয় শ্রী আস্বাদন
জানিতে চাই
আহা, কী সুখ যে পান তার সন্ধান মাধুরিমার মোহন ক্ষণে
যাই পেয়ে যাই
আমি কী সুখ যে চাই, তুমি যেমন আমার সুখে বিভোর, তা-ই
সে মধুর গোপন চাকে
আগমনীর আবির্ভাবে
মন থেকে আজ দুই উঠে যায়, দুই উঠে যায়
আমি তো সোয়াদপাগল, আমারে আস্বাদন করো, কেমন করে
আবির্ভাবের মন অধীরা, তোমার ভেতর অস্থিমজ্জা, আমার শিরা, আমার চলাচল
আমি তোমার স্বাদের সোয়াদ সোহাগ, আমি আস্বাদিত হই ।।
২।
আমারে দেখিবে না, আমি তো প্রকাশ নই, আমি অভ্যন্তর মূল
আমারে দেখিবে না, আমি ভেতরেই আছি, আমি ভেতরের মূল
আমি তো কাঠামো নই, আমি লীন, লিপ্ত তোমায়
সাধু সঙ্গে কাটে বেলা, যেরূপ করি অবহেলা
আমি তার ভেতরের সুর উতালা,বাজনদারের সাথে আমি সঙ্গতের চেলা
আমি মিশে যেতে চাই রূপে ও মরমে
মরমী ধরেছে কী রূপ, প্রাণধর্মে জেনে যাই তারে
আমি সাধুসঙ্গে কাটাই বেলা
ভান্ডতে ভাব করে খেলা
মিস্টান্নের লোভ কেমনে সামলাই
আমারে দেখিবে না, আমি আছির ভেতর লুকিয়ে আছি
আমি আশেপাশেই আছি
আমি আছের কারণ হয়ে চাই
মাঝে মাঝে পড়ি ধরা
তবু আমি অনন্ত অধরা
সাধুসঙ্গে কাটাই বেলা, আমিও অনন্তের চেলা, সঙ্গতের নাদ গীতে ধরা
“ভাব ধরিছেন সাধু, আমি আছের কারণ খুঁজে মরি, আমি আছির কারণ হয়ে আছি”

ডিম কিছুটা গোল
ভোগের শেষে পরে থাকে শুধূ ডিম্বখোল
ডিম আগে না মুরগী আগে দ্বিত্বে নিত্য অদ্বৈত
একের প্রাণে অন্য পরাণ তাতে ভোগের কী আসে!!
ডিম ও মুরগী এক প্রাণের বহু প্রকাশ বিহুর টান
কোন গহীনের কোন মগডাল ডিম ফোটানো পাখীর আশ
প্রশ্নখানা প্রশ্নময়, উত্তরে হায় কবির লড়াই
প্রাণে প্রাণে লাগলে নাড়াই
চৈতন্য শিঙ ডিম ভেঙ্গেছে, পালক খসা বন মোরগের এই যৌবনে
ছানা-পোনা সব দেখেছে মা মুরগী এক ডিম পেড়েছে
কোন শিয়াল সে ডিম খেয়েছে
প্রতিরক্ষা চাইলে তুমি সার্বভৌম ডিম আগে
ডিমের প্রকাশ অন্য রকম, বিহুর সুরে, সাঁওতালী নাচ নাচি সবাই মিলে
ছানা পোনা ছাওয়ালে।।

ডিম কুসুমে রোদ মাখানো, কাকের বাসায় আলসে কোকিল
ডিম পেড়েছে কবির মতো
কবি জানে বিয়ানকাল।।

এক বিয়ানে তিনশ ডিম, কে পেড়েছে কোনখানে!
বিহান বেলার রোদের মতো বিয়ানো কাল রোদ বিয়ায়
কিছুটা প্রাণ অবশিষ্ট ভোগের পরে ডিমের খোসায়

ডিম আগে না মুরগি আগে……। হায় হায়

ঘুমের আড়ালে না ঢাকা স্বপ্ন
সংঘবদ্ধ ঘুম, একসাথে স্বপ্ন দেখে
একসাথে বিছানাকে দেবো আমি শরীরের স্বাদ
সদা স্বপ্ন জাগ্রত, কখনো কখনো ঘুম বড়োই বিস্বাদ
ঘুমান!! শুভ হোক ঘুম

বাঁকে বাঁকে দুর্ঘটনা লুকিয়ে থাকে; বুকে বুকে বিঁধা শেল; পথে পথে এই খেলা; আত্মহননময় মগ্ন দণ্ডায়মানতা; তবুও ব্রেক; বাঁচার আবার স্বাদ;


হেমলক
শহরের যে রেস্তোরায় হেমলক বেচে, কিছুটা কাঁচা লংকা
সেইখানে বসে আছি, দুনিয়ার কুফরী কর্ণারে_ লকলকে অনল শিখা
ঊষাঊর্বর নিউরোন কোষ, বিজ্ঞান সমাহিত করে_ ভালোবাসতে চায় কবিতা
জগদীশ সম্ভাবনায় আমার মগজমজ্জায় বৃক্ষাঙ্গ সংস্থাপিত

পৃথিবীর যেখানেই যাই, আমার প্রস্বেদন আস্বাদন ক্ষেত্র আমারই মাতৃভূমি
অলস অন্ধকার যেখানে যেখানে অভিজাত ছায়া, আমি সেই সব ছায়া অতিক্রম করি
আমার কোন ছায়া নাই; শহরের হেমলক রেস্তোরায় বসে কোন দর্শন নয়,
শুধু পঞ্চম বেদ পাঠ করি;
আমার স্নায়ুরজ্জু ধরে বিদেশে প্রলম্বিত শৈশব এই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্ধায় দোল খায়
আমি ছটফট করি, হেমলক গ্লাস হাত থেকে খসে যায়, মৃত্যু নক্ষত্রের মতো খসে গেলো।

দিওয়ানা

এই সময় অল্প আঁচে উনুন উদ্ভিন্না আমারই শরীর
উতরায় উত্তরণে; আমি নিরলে নির্গলিত, কেউ দক্ষ আংগুলের ডগায় ডলে
বলে, এখন নামাও, হয়ে গেছে; এই সময় আমি আমি তোমাদের গরম গরম ভোগ_

এই সময় অতিক্রান্ত শৈশবের শব্দের ধ্বনি
আগন্তুক হাওয়া, আগুন জেব্রাজিহ্বায় নিদাঘ-নির্দিষ্ট জ্বালাপোড়া
এতো পোড়ালে আগুনও পুড়ে ছাই হয়ে যায়!

আমি আগুন পাখীদের কথা শুনেছি
শুনেছি ডাইনী আগুন কেবল দগ্ধ করে অন্তঃপুর

আমি পুরবালিকার মতো একবারই সূর্য দেখেছিলাম
বলেছিলাম, আগুন।।

এই সময় আমি ঠান্ডা হয়ে যাই, অন্যপূর্বা কিংবা অনন্ত আমার নাম
বলি, অনন্ত বৈশাখের ঝড়ে কালের ঘুড়ি উড়াবো নিশ্চয়ই

এই সময় অগ্নি অরিত্র বৈঠায় হাল ধরি, জলেও আগুন লাগে
তবে সেই জল, বাষ্পের বিপন্ন বিশ্বাসে আমাকে শুধু তরঙ্গে ঝাঁপ দিতে বলে
আমার অতলবাসে জলাগ্নি জ্বলবে

হাড় থেকে, অস্থি থেকে আগামীর মাছ পুচ্ছ প্রদক্ষিণ করেই যাবে
এই মাছ জেলেদের নয়, এই মাছ ভোগ ও দক্ষিণা নয়
এই মাছ ভরা আষাঢ় পূর্ণিমায় পূর্ণাঙ্গ আমি ।।

জমজ দিগন্ত
তাকাতে বলেছিলে, গাছের পাতা নড়েছে চোখের পাতা নয়
আসমানী অভ্যুদয়ময়_ একটা সম্বন্ধ অঙ্গুরীয় (এঙ্গেজমেণ্ট রিং) খেলছে
অখন্ড নয়নে দ্বিখন্ড দেখছি, সকল কাল্পনিক রেখা দশম শ্রেণীর জ্যামিতি

তাকাতে বলেছিলে, অস্থির জলও কিছুটা শান্ত হয়, আমি তো ঊর্মি বিলাসী
নয়ন জানে, সে আমার নজরনজরানা দিতে ভুলে না কখনো
মেদিনীমণ্ডলে আমার নজর লেগেছে, খুকী দুনিয়ার কপালের বাম পাশে মুখলাগানিবারণী কাজলচিহ্ন;

কিছুটা আলো ছটফট করলো; কিছুটা সৃষ্ট ওম দেয়া আছে; সোহাগি ডিমের ফাঁকে জীবন ঊঁকি দেয়; পাখনা আপনাআপনি আদর আদ্র নিরাপত্তায় প্রাণ ঢেকে রাখে

সবকিছুই শেষ পর্যন্ত সত্যাগ্রহীর কাছে জাহির; বার বার মুছি পারদ চালতা ওঠা আয়না
দেখি আমি দশখন্ড; নাকি আমি নিজেই অখন্ডের সীমায় টেরি কাটা বাবু
জলেও দেখেছি আমি আমারই ছুরুত_ মোরগ যখন ডাকে কুক্কুরুৎ
আমিও নিশিনিষিক্ত কষ নিজেরই বাকলে আবার ফের শুষে নেই , কেউ যাতে নাই দেখে অশ্রুর রকমফের!
তা’হলে তো প্রণয়ও রোদন হবে
মানুষেয়া জেনে যাবে কান্নাই আসল
আমি তখনই কালের কুঠার দিয়ে অখন্ড দিগন্ত চিড়ে ফেলি, দুইভাগ… হা!!

কালের কুঠার
শরবত ও বিজ্ঞাপন
মেঘের ঘাড়ে চড়ে বসেছি
নীলকুড়ানি নীলকুড়ানি, নীলনিচয়ের কান্না শুনি নাই
নীলকে আমি হামানদস্তায় চুড়েছি

মেঘ গেলাসে ঢেলে ঢেলে দলে দলে খাই
তোকমা দিয়ে চিনি গুলে শরবত বানাই।।
নীল চিরুণির ফোকলা দাঁতে মাথার বেণী করেছি
নীলকে আমি নীলা বলে ডেকেছি
মেঘের ঘাড়ে মেঘা বসেছে
প্রাণধড়ফড় তখন মেঘের শুরু হয়েছে
মেঘমুকুলে আকাশ নুয়ে থাক
কাল গর্জন হয়েছে সবাক

বোবারা সব মুখ খুলেছে, বাক্যে তারা বিধান বানায়
ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছে
মেঘ ধরেছে, মেঘ পেড়েছি
মেঘ চূড়েছি, নীলে মেঘে তোকমা শীতল প্রাণ জুড়ানো শরবত খেয়েছি;

আখের রস ও কৈশোরে দেখা কুইশার মেশিন
একটা রসকদম গাছ ছিলো
মিঠালিয়া আমগাছ আর নারকোলে আমগাছের মধ্যে চুকাচুনা প্রাকৃতিকতা
দুধেল (দুধাইলিয়া) আমগাছ আমাদের স্মৃতিসারে আছে
ইশারামায় দুধ, মাটির গভীরে থাকা নারিকেল;
এইসব কথা জগদীশকে জিজ্ঞাসা করবো

এই সব আম্রকন্যাদের আমদুলালীরা আমাদের বাড়িতেই আছে
বীজের বিশ্বাসে খেয়ে দেখেছি, না মাতৃস্বাদ নাই _ আমার জিহ্বা ও জবান সাক্ষি_
কিন্তু ভাই, রসকদমের গাছগুলো শ্যামবহুরুপী, রাধারিক্ত করে না তার সৌরভ কখনো

আমি এখনো স্তন্যপায়ী, আমার দুধ ছাড়াতে পারেনি কেঊ
আমি ভাবের আবেশে নদীয়ায় থাকি, কষ্টে কাটাই কুষ্টিয়ায়
চেতনা চড়েছে চড়ক গাছে, লালন সদা আমার সহায়।।

কিন্ত যে গাছগুলোর কথা ভুলতে পারি না, সেগুলো অতি চেনা, খেজুর
একান্তই বঙ্গীয় খেজুর; বৃক্ষ ও বীজে প্রকৃতি সদা পরিভ্রমণরত
আদি বেদেদের মতো নিজেকে বয়ে নিয়ে যায়
যেখানে যে বাঁচে, তাকে কে মারে, প্রকৃতি তা-ই তো শেখায়!!

কিন্তু আমি তো আখচূড়া মেশিনে কথা বলতে চেয়েছি
না, আমি রস সন্দীপন, বলতে চেয়েছি;
হোক, আখ দিয়েই খেজুরের কাছে যাবো……

কড়কড়া বালু দিয়ে শানানো ছেণীতে আমার গলা কাটা হলো
গলাকাটা রাজনীতিতেও কিছুটা রস ঝরে, কিন্ত গূঢ় গুড়ের সোয়াদ থাকে না
(পরের অংশ আমি আন্তরিকভাবে নিবেদন করছি)

আখের রস ও কৈশোরে দেখা কুইশার মেশিন (পরের অংশ)

সেদিন দেখলাম, না প্রায়ই তো দেখি, অনেক রস বার করা হচ্ছে রাস্তার পাশে
ক্লান্ত কেরাণিরা খাচ্ছে, জন্ডিস রোগী, পাণ্ডুর কিংবা হলদে হয়ে পরপারের গায়ে হলুদের আগে গলা ভিজায়;

আমাদের অনেকবার গায়ে হলুদ হয়
নেলসন ম্যন্ডেলা বলেছেন, হলুদে কালো উজ্জ্বল হয়;
কালা ও সুন্দর কালা কেউ কারো মিত্র নয়_

সেদিন দেখেছি,ইতিহাসের মাড়াইকল, একটা কালো কুচকুচে রসমাড়াইকল

গার্গী দিদির জন্য

সর্বাংগে বংগ আমার ঝুমুর ঝুমুর নাচি, পলিপ্রধান তামাবরণ কৃষ্ণছায়ায় বাঁচি
আমি হরিহরণ চাষী, আমি ফসলপ্রকাশ করি, আমি আপন হরি,নিত্য দয়াল যাচি
আমি নিজের গলায় কলস বাঁধি রসসাগরের গাছি;
আমি হরিধানে ধানসোনারঙ, স্বয়ম্ভু ঢঙ আচারি-বিচারি, আমি কালকুঠারে ছায়া কাটি, ছায়া
সারা দেহে উঠলে নাচন আমি সব্যসাচী;

সর্বাংগে বংগ আমার ঝুমুর ঝুমুর নাচি,তোমার জন্য দিদি আমি হলাম দ্বীন ভিখারি
আমি আমার ঘরচাতালে অনেক অনেক তুলসীতলায় জায়নামাজে বসি,কেমনে থাকি তোমায় ছাড়ি; তুলসীতলায় বসে আমি দিদির জন্য দোয়া করি, আমি পাগল আপন হরি_
কী আচারে মুক্তি আসে, কী বিশ্বাসের অপরুপা অন্য সাধন সাধতে গেলাম
মুক্তি আসে মনে মনে মনে, মনমরমে তোমায় খুঁজি;বিরহ বাঁধন আমি ইতিহাসের মাঝেই পেলাম; তা-ই তো আমি চোখ মুছে যাই, ইতিহাসের কাছে, তার সাথেই ঘরবসতি তার কাছেই শিখি; আমরা সবাই চলে গেলেও একসাথেই আছি; তুলসীতলায় সন্ধ্যাবেলায় জায়নামাজে বসি; যে-ই এবাদত কেবল রোদন, অধিষ্ঠানের অন্য বোধন, তার মায়ায়
এই বিরহকাল ফিরে ফিরে আসে; আমরা সবাই কার কাছে যাই, কোন সে স্বদেশে!!
সর্বাংগে বংগ আমার ঝুমুর ঝুমুর নাচি, পলিপ্রধান তামাবরণ কৃষ্ণছায়ায় বাঁচি

ভাগে ভাগ হই না

উপেক্ষারও আছে সাতরঙ; মেঘাঞ্জন বিভূতির অদৃশ্যের খেলা দৃশ্যমান করে তোলা
এই যে বাড়ি ফেলে গেছি তোমার ছত্রছায়ায়, সে-ই বাড়িটা কই। আমার ছাড়া বাড়ি
আমায় দিও না, তবু আমায় ছেড়ে তোমায় যেয়ো না; আমি তোমাকে চাই।। _

উপেক্ষারও আছে বিবিধ বচন; মেদিনীমন্ডলে আজ ভাষাহীন বিমূর্ত রোদন রোল
হাউ মাউ করে কাঁদি, আমার স্মৃতির পাহারাদার, আমারই প্রতিবেশী, কথা দাও
ছায়াকে পাঠাবে না আর পরবাসে; জেনে রেখো, রসুইঘরের কাছে, বাতাবী লেবুর গাছটাও
আমার বড়ো প্রিয়জন; লেবুর গন্ধে আউশ চালের ভাত মৌ মৌ করুক তোমার;

আমরা কেউ কোথাও যাই নি, আমরা সবাই একসাথেই আছি।।


অনুকূল ঠাকুর

কি শান শওকত, পা ছড়িয়ে বসে আছেন চাঁদনি
দিগন্তের জোড়া খাটে দিনমণি, আপনি এবার যান;
শ্রীশরিফ দেহখানা যুগী বাড়ি যায়
নিজের শাস্তি সাধু অপরে বিলায়।।

সাগর সংক্রমণে চোখে আসে জল
মনুষ্যবিহিন সাধন হবে নিস্ফল;

কি দেমাগ, রগচটা রোদ, ছায়াকে করেছে অবরোধ

সুজন বহে না কোনো অকল্যাণ বাণী
তিনি তো সমস্ত পাখির ডানার আগামী
ছায়াবাণী হলাম আমি কন্ঠের কারণ
বাক্য পিপাসা আমার আছে আমরণ
আয়াতের তিয়াস আমার হায়াত জোড়া
নাজেল করুন মাবুদ আয়াত আনকোরা।।
কবি তো নবীর বংশ, কাল বাঁশুরিয়া
নিত্য বিজয় করে নব নব হিয়া।।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top