১১ কবিতা

ফিরোজ এহতেশামের কবিতাগুচ্ছ


প্রকাশিত:
৯ এপ্রিল ২০২১ ২০:২৭

আপডেট:
১০ এপ্রিল ২০২১ ১৯:৪১

ফিরোজ এহতেশাম

সূত্র

 

তোমার পিছে পিছে কবিতা চলে গেছে
আমাকে ফেলে রেখে শূন্যতায়
তবুও নদীতীরে সতত হাওয়া বয়
হাওয়া তো নয় যেন সান্ত্বনা

ওই তো পশ্চিমে কিংবা নৈঋতে
চকিত মনে পড়ে বিদ্যুতের
আলোক সম্পাতে ব্যক্ত হতে হতে
অর্ধ নিরাকার গল্পটা

কোথায় যেন সব সূত্র ছিঁড়ে গেছে
কোথাও যেন কোনো ছন্দ নাই
মূলত চেপে রাখা আর্তনাদটিকে
কী করে প্রকাশিব বর্ণনায়!

 

চোরাগোপ্তা হাসি

 

জটিল আর কলহপ্রবণ মানুষের থেকে
শিশুর সান্নিধ্যে এলে যেমন আরাম বোধ হয়
তেমনই শান্তিতে আছি তোমার সকাশে আমি
তোমারই শুশ্রূষায়
ত্বক আর হৃদয়ের ক্ষত মুছে গেছে
হে চিকিৎসক, তোমাকেই আমি ভালোবাসি।
তবু,
তোমার মুখের ’পরে ঝুলে আছে কেন
ক্ষতসৃষ্টিকারীনির চোরাগোপ্তা হাসি!

 

রাতে

‘এখানে দাঁড়ানো নিধেষ। দাঁড়ালেই দণ্ড।’
এই নিষেধাজ্ঞাকে হেডলাইট দেখিয়ে
দণ্ডিত হয়ে আছে বাসগুলা।
রাতে, একটু দূরে এক অকেজো রে-কার,
তাকে দণ্ডযোগে টেনে নিয়ে যাচ্ছে একটা ‘মহিলা বাস’
সংস্কার বা গন্তব্যের দিকে।

 

অর্থহীন যত ঘূণির্পাক

সহ্য করি আমি আত্মপ্রকাশের
তীব্রতর বোবা আর্তনাদ…
এমন বেদনার অর্থ নাই?

যে রূপ নিতে নিতে অরূপ হয়ে যাও
সে রূপ প্রকাশের ব্যঞ্জনা
ভাষার পরিধিতে আটছে না

কাঠামো ভেঙে পড়ে ভিত্তি ধসে যায়
সংজ্ঞাতীত কোনো বর্ণনে
সুপ্ত থেকে যাওয়া বর্ণতে

জোড়া ও তালি দিয়ে বাতাস বয়ে আসে
দেহের চারপাশে উন্মাতাল
অর্থহীন যত ঘূণির্পাক

 

রূপরেখা

তোমার তো ভাবমূর্তি দেখেই বোঝা যাচ্ছে
কোনো রূপরেখা নাই
রংতুলি হাতে নিয়ে বসে আছ
চিত্রগুপ্তের মতো
এদিকে নৌকা ছেড়ে দিচ্ছে মাঝি
জলতরঙ্গে
শিমুলকে বলতে হবে অন্য কোনো
রং নিয়ে আসতে
ঘাস থেকে ফড়িংটা উড়ে এসে বসল
বিদ্যুতের তারে
আজ সারাদিন সূর্যের দিন আজ
রবিবার
দাওয়া হতে ধীরেসুস্থে নেমে এলেন
নহিরুদ্দিন ফকির
তবুও কূটাভাসের মতো দুইটা সাদা বক নড়াচড়া করে
ধানক্ষেতে
তার তো কোনোদিন যাওয়া হলো না
কুড়িগ্রাম
সম্পূর্ণভাবে ধসে যাওয়ার আগে একবার
মনে পড়ল তাকে

 

ওগো বিগ বস

টের পাচ্ছি মর্মমূলে নিরন্তর ধস
ধসে যাচ্ছে বিদ্যুতের খুটি, সরল বিশ্বাস
ধসে যাচ্ছে ভিত্তিমূল, ভাব আর মূর্তি আমাদের
অক্ষরগুলো ধসে যাচ্ছে পাতায় পাতায়
ধসে যাচ্ছে সম্পর্ক, প্রথা, বহুতল ভবনের মিথ্যা আশ্বাস…

ওগো বিগ বস
ক্যামনে ঠেকাব এই ধস?

 

আমাদের চারপাশে

আমাদের চারপাশে
দৈত্যের মতো বিল্ডিংগুলা মাথা উঁচু করে আছে
সতত যে ভয় হয়
এখনও কেন যে ধসে পড়ছে না সেটাই তো বিস্ময়
এরই ফাঁক গলে হাঁটি
মাটিতে পড়ে না পাগুলা কখনও, জুতাটা তো পরিপাটি।
মাটিই-বা কোথা পাব?
কংক্রিটে মোড়া শহর আমার ‘বেঁচে আছে’ তুমি ভাবো।
বেঁচে থাক বাবা তবে
ক্রমশ কমতে থাকা যত গাছ, পাতা আর পল্লবে।

 

তুই কেন এমন রে

তোর জন্য কান্দি আবার
তোর জন্য হাসি
ও জীবন রে
তোরে আমি কতই ভালোবাসি।

ও জীবন রে
তুই কেন এমন রে
তোর বিরহে আমি একদিন
মইরা যাব রে...

 

ভোর

উৎস একটাই তবু
দ্বান্দ্বিক ব্যঞ্জনা নিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে
ধাতব আর শিশিরের আলো

যেন সারা রাত কুয়াশা-বৃষ্টির পর আমাদের চোখে
ধীরে ধীরে জেগে উঠছে
শুভ্র নিষ্কাম এক ভোরবেলা

সদ্য লেখা তরতাজা একটা কবিতার মতো

 

বন্ধু আমার সেই নদীতে

ওই উথাল পাথাল ঢেউ উঠেছে পারদ-নদীতে
ওকি হায় রে হায়
বন্ধু আমার সেই নদীতে গোসল করতে যায়।।

তামাটে আকাশে অ্যালুমিনিয়াম পাখি
উড়ছে বিরাট শিশুর হাতের রিমোটকন্ট্রলে
হঠাৎ একটা মৎস্য লাফিয়ে উঠে
পাখিকেই গিলে খায়
ওকি হায় রে হায়
আমার বন্ধু সেই নদীতে গোসল করতে যায়।।

ধাতবের জং কুয়াশার মতো ঝরে
সে বিক্রিয়ায় তোলপাড় করে ঢেউ
একা একা কোনো বস্তুর মতো
কেউ কি সেখানে ছিল তথাগত
কেউ নাই মোহনায়
ওকি হায় রে হায়
বন্ধু আমার সেই নদীতে গোসল করতে যায়।।

চুম্বক থেকে তরঙ্গ ভেসে আসে
পরাণ বন্ধু তোমার আকর্ষণে
কে সেই বন্ধু কেমন আদল গোসল কী প্রকার
তা তড়িৎ বোঝা দায়
ওকি হায় রে হায়
বন্ধু আমার সেই নদীতে গোসল করতে যায়।।

 

না ভিজে চলে যায়

যেনবা ঝাঁকে ঝাঁক বর্শাফলা রূপে
গাঁথছে পৃথিবীকে বর্ষাকাল

আকাশে তড়পায় বজ্র-বিদ্যুৎ
রক্তজবা যার রক্তে লাল

নানান অক্ষরে ধরতে চাই তাকে
তবুও থেকে যায় বিমূর্ত

বৃষ্টি, ফাঁক গলে, না ভিজে চলে যায়
কেমনতর সে যে, কী ধূর্ত!

 

 

কবি পরিচিতি: জন্ম ২৪ মে ১৯৭৭। বেড়ে ওঠা রংপুরে। পড়াশুনা করেছেন কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে। ১৯৯৪ সাল থেকে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও দৈনিক পত্রিকায় লেখালেখি শুরু। কবিতা, গল্প, মঞ্চ নাটক, প্রবন্ধ, ছড়াসহ নানান শাখায় তিনি লেখালেখি করেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১টি-অস্ত্রে মাখিয়ে রাখো মধু (সংবেদ, ফেব্রুয়ারি ২০১০)। বাউল সাধকদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সাধুকথা’। সহ-সম্পাদক হিসেবে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করছেন।

 



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top