আনন্দ মজুমদারের এক গুচ্ছ কবিতা


প্রকাশিত:
৯ জুন ২০২২ ১৬:৫৫

আপডেট:
২ জুলাই ২০২২ ১৩:৫০

পাগলা জ্যোতি

এ কোন জ্যোতি আজকে আমায় পাগল করে
এ কোন জ্বালায় আজকে আমার রোদন ঝরে।

আমার জন্ম খড়-বিচালির ঘরে
আমার ভেতর খানায় বসো তুমি, ঘরকে আলো করে

আজকে আমার মন চলে যায় উড়াল বাস্তবতায়

একতারা ফল আমি খাবো কাউকে দেবো না
প্রেমানলে পুড়বো আমি কাউকে ছোঁব না ...

আমি দিশা হারার মতো
আমি লাশের গাড়ি টানছি একা
শহর আমার পেটের ক্ষুধা
ভূখা-নাঙা মানুষ আমি, মানুষ নামের লাশ যেটানি
আমার শ্রমের শ্রাবণ ধারা এই দুপুরে ভিজায় শহর
টপটপিয়ে জল পড়ে যে, টলমলিয়ে অশ্রু
তোমার গতি আমার শ্রমে, রোদটা যেন বিচ্ছু।_ আমার সাগর শুকায় যখন

তোমার নদী চিলতে ধারার তটিনি
আমার নাটক রাতদুপুরে দেখতে আসে নটিনী
তারে আমি বসাই যখন, দূর পালেও হাওয়া লাগে
সাগর তখন কী উচ্ছাসে মাসুম পলির বুকে নাচে _

নিজেই লুকাই, নিজের ক্ষত, কেউ তা জানে না

কত পত্র দিলাম তোমায় ক্ষত শুকায় না

আমার একতারা ফল আমি খাবি কাউকে দেবো না
আজকে আমার মন যে বাজে তোমার তারে ......
তাইতো বুঝি সুর হয়ে যাই আমি
আমার আপন তোমার ঘরে পাতে বিছানা

সাঁই যে আমায় সঙ্গে নিলেল না, ছয় লতিফার পথ ধরে যে গেলেন চলে
তার পথ খুঁজিলে তারে পাবে, নিভৃতের চরাচরে মানুষ যখন চিনে তারে

আমি তারে চিনি না

আমার আপন হারাই যখন তারে চিনি না
একতারা ফল আমি খাবো কাউকে দেবো না

আজ বহ্নিরাগের চলনে এক বাসন্তী স্বাদ পাই

আজ বাজখাই এই মরার শ্রাবণ, সঙ্গী সাথী নাই

আঁধারে অরণ্য মাঝে হারায়েছি পথ
অনাথ একাকি আমি জোছনা কোমল শিখা
আমরা আজিকে ধ্বংস করিব পৃথিবীর সব বিভীষিকা
আমার আজিকে ধারন করিব রিক্তের সব বেদন

আমি আজ আমাদেরই বঙ্গের সব রক্তাক্ত প্রান্তরে

তোমাকে খুঁজি, আসলে আমাকে খুঁজি ।।

 

মাংস

কারো কিছুটা মাংস দরকার হলো
ঘচাং করে আমার ঘাড়ের মাংস কেটে নিয়ে গেলো

কারো মাথায় যৌনতা চড়াও হলো
আমার তিন বছরের মেয়েটিকে জীবন্ত সেক্সটয় ভাবলো

পশ্চিমে যা বিক্রি হয় দোকানে দস্তুর মত ।।

যৌনতা কোনো অঙ্গের কারবার নয়

যৌনতা জীবনের অন্যপাঠ। অন্য বোধিনি বিজ্ঞান ।।
দলনে -মর্দনে, কামনা-কুলাঙ্গারযৌনতারবিরুদ্ধেআমরা

মানুষের শরীর বেচার পুঁজিতন্ত্র চীন কিংবা আমেরিকায় দেখতে পাবেন
জীবন্ত মানুষের সকল প্রত্যঙ্গও বিচিত্র বিপণিবিতানে_

ও সেক্সটয় নয়, ও আমার মেয়ে
ওর জন্য আসুন যার যার মতো কিছু করি ।
একা কিংবা সবাই ।।

কিছু চকলেট, কিছু খেলনা_ কিছু চিকিৎসা খরচ

 

এবং কিছু মানুষের মুখ

যদিও ওর চিকিৎসার আগে আমাদের দরকার ।।

একটি অবরুদ্ধ নিজের সকালঃ খেলনা

হে আমার পরম প্রাণের স্রোত, আমার গানের দূত। আজকে আমি শিখি পরিবিজ্ঞান, ও আমার প্রাণের স্রোত, আমার নিজের অরুণ- দ্যুতি।

আমায় চিনি আমি, আমি নিজের ভূত। আমার তিন বছরের শিশু

যেনো মায়ের কোলে মেরি
সে যে আমার এক আগামীর ভেরি,

আমার বাবা রিকশা চালায়, আমার মা যে কাজের বুয়া
আমার দুঃখের আছে সাগর, কারো আছে ব্যথার কুয়া

কোন মিছিল হুক্কাহুয়া, কোন মিছিল আজ আগামীর
আমার জন্য মিছিল করো, যেন আমি চিনি মানুষ

আমার উপর চড়াও হলো, আমার ছিলো মায়া বিমুখ
সেটাই দুঃখ_ আমার মুখে সকল শিশুর মুখের ছাঁদের ছিলো যে মিল
আমার ভেতর প্রবেশ করায় মারণাস্ত্র_ যা চিনি না _

আমার মতো কোমল ফুলে এমন আঘাত করলে তুমি
আমি এখন শুয়ে আছি, আমার কান্না শোন তোমরা

আমার আদর গড়িয়ে পড়ে মায়ের চোখের কান্না হয়ে_ রোদনবারি আমার পাশে।।


জন্মদানের সকল শর্ত ছিন্ন হলো এই সকালে


পশু কখনো আপানকে যৌনতার জন্য আবেদন করেনি...।

পশুরা যৌন-নীপিড়ক নয় ....


ওর জন্য আসুন আমরা কিছু করি

অন্তত কিছু চকোলেট নিয়ে ওর পাশযাই।।

আমরা অন্তহীন সোন্দর্য্যের কান্না থামাই।।


ওর জন্য কিছু করি
আমাদের মানস-মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলি :

কুসুম ছিঁড়ে যারা কলি ও মুকুলে
কিংবা ফুটিলে নিজেরই আকালে
যারাই ছিঁড়িবে, এইভূঁই-কূলে

নাহি ঠাঁই, নাহি ঠাঁই।।

আসুন ওর জন্য আমরা কিছু করি

অন্তত একটা খেলনা নিয়ে গিয়ে ওর হাতধরি

মা ও বাবা ছাড়া যদিও মানুষের সব হাত ও প্রত্যাখান করছে

আসুন ওকে হাত চেনাই, মানুষের হাত।।
আহারে আমার ধর্ষিতা তিন বছরের শিশু।।

শিশু যখন নিরাশ্রয়, আমিকার আশ্রয়ে বাঁচি বলুন।

আজ মন ভার হয়ে আছে
নিষ্ঠুর এই শহরে আর থাকবো না
আমি জঙ্গলে চলে যাবো
গাছ অনেক নিরাপদ

আলোক- সালোক তার ভাব, মানুষের সব ভাব বৃক্ষে নিহিত, নাকি প্রকাশিত।

আজ আমি কাঁদছি, তিন বছরের ধর্ষিতা শিশুটির জন্য আমার অবিরল রোদন, আমার বিলাপ আপনাদের কাছে পৌঁছে যাক।।

শিশু যখন নিরাশ্রয়, আমিকার আশ্রয়ে বাঁচি বলুন।

আজ আমি প্রাণের তাবেদার, আমার জীবন দেবো, প্রাণপ্রতিজ্ঞা _

মানুষের রূপ হরণ করেছে যারা

কি ক্লেদে বাস, নাহি বিশ্বাস, মানুষ আত্মহারা
কেবলি আপনে ডুবিলে মরণ, জীবের সেবার ধারা
ভুলিলে সমাজ খানখান হবে, বাস্তু-ভূগোলে হবে আগাছার ঠাঁই

ছোট মনিটির স্মৃতির (ভাইসব, তিনবছরের আমার মায়ের কথা বলছি)
ভাঁড়ারে এই স্মৃতি খানা অনাদরে পড়ে রয়

পাষণ্ড এই স্মৃতি_ কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে আগামী দিনের সব প্রীতিময়কাল
এখন তোমার কষ্ট মাগো! আমার বেদন হয়, আমার রোদন হয়

[প্রাণ প্রজনন এতো সহজ নয়] _ তুমি আমার মেয়ে_

আমার "সকলপুরুষ" আজ দিলাম বিসর্জন
প্রাণস্বরুপে থাকি যেনো প্রাণের ভাগিদার
আমার খুবই কান্না পাচ্ছে , আমার খুবই কষ্ট মাগো তোমার জন্য
তুমি ব্যথা বলতে পারো না, তুমি বল ‘‘বেতা’’

ফুলের মউৎকালে আমি যেমন করে কাঁদি
তোমার ব্যথায় নীল হয়ে যাই, আমার সকল কষ্ট

দংশন-দরদি নয় এই সমাজ

আমার নজরুলের রিক্তের বেদন যারা না বোঝে
যে সমাজ শিশু-দরদীনয়
যেখানে সংগ্রামীরাও ঘরে ঢুকে গেছে

শুধু বেঁচে আছে অর্থহীন বক্তব্যের ভীড়ে

এতিমের মতো ইতিহাসের লাস্ট বেন্ঞ্চে বসে ঝিমায়
আসুন আমরা ধর্ষিতা অই শিশুটিকে নিয়ে এই সমাজ ভেঙে ফেলি

একাত্তরে যারা হানাদার মোকাবেলা করেছেন, সেই সব মা ও বোনেরা
আসুন অই শিশুটির পাশে দাঁড়িয়ে বলুন, আমরা আছি।।


ক্লিনিক্যালি বেঁচে আছে এই সমাজ
মানবিক সম্পর্ক রহিত নির্মম এই সমাজ, আসুন আছাড় মেরে ভাঙি

আমি আর জন্মের কারণ হবো না _
যদিও তোমার মা-ই জনমদাত্রী

তিনিই সব, আমি তার ভেতরের খেদমতগার মাত্র
আমার আম্মা! আপনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে!

আপনি আমার বুকের ভেতর থাকার কথা

আপনার জন্য সারা বাংলাদেশ অস্থির
আমার সব মায়েরা আপনার জন্য কাঁদছে
বোনেরা চুল খুলে রোদন করছে

 

মগ্ন চৈতন্যের হাহাকার

১।

হাশর-নসর খোয়াই আমি ঘর ছাড়ি
দেওয়ানা বন্দের বাড়ি সাত তাড়াতাড়ি।।
অভাগার ঠাঁই যদি ন’ থাকে নসিবে
বঁধুভাবে বারামে ঠাকুর বসিবে।।
জিন্দেগি বরবাদ হয় ন’ থাকিলে প্রেম
জীবনে পরম মিশে হয় রাধা-শ্যাম।।
আমি বন্ধু ভাবে ভাবে স্মরণে ত্বরণ
কাল কেটে গেলো দোস্ত ন’ পাই নিরজন।।
ভ্রমর-বিজনক্ষণে গুঞ্জনের গুঞ্জায়েশ
আতপ উত্তাপ বন্ধু হৃদয় বিদেশ।।

২।

ফুলের বাগানে দেখি মজনু বসে আছে
তার পাশে বকুলে রাঝড়ে ঝরেছে।।
সারাটা শরীর তার ফুলের ফুলকি
অঙ্কিত সারাটা দেহে ফুলেল উল্কি।।
এসব খচিত চিহ্ন ছাড়াও চিনি
চোখ তার ছায়াময় [চিরচেনা] দিব্যজ্ঞানী।।

৩।

ব্যাধির দিকে তীর তাক করে হাসে ব্যাজ, নিজ পরিবেশ
আমি তো জপে ধ্যান স্নিগ্ধ নিস্তেজ, [তবু] ভূষণে বিশেষ।।
কোন ভাবে কোন মতি, কারক তোতেজ; পাগলা জ্যোতি
আমি যে শৈশবে ছিলো আমার, এখন আমি আত্মআরতি।।
সব জেনেছি, হয়ে ভাবভোলা, শুধু চারচোখা চুলা
আগুনে উতালা, আজি শাদি হবে, শিখা আর দুলা।।
গুণধর স্বামী! ছিনাল চিহ্ন খোঁজে দেহের অরণ্যে
আমি তো বৈতাল কালে সর্পমন্থনে, নিজে সদা ভিন্ন অভিন্নে।।
আমি আবিয়াতা নারী [অবিবাহিত] দাহ্য অপ্সরী
ছিনাল বাতাসে আমি অনন্ত বৈশাখের ঘুড়ি।।

৪।

মেঘের বোঁটা পুষ্ট হলে মেঘা তলব করি, আমি ভাবের ব্রাত্যক্ষণ [কোন কালে যে কাল নাই]
কোলাহলে ফের পেয়ে যাই; কালকাকলি, আমার জনম দুখী মন।।
আমার রসের ধারা খেঁজুর গাছে, উচ কপালে আকাশ নাচে
আমার রসের ধারা, গাড়িয়ালের গামছা ভরা স্মৃতির ঘামের সুবাস ধাঁচে… [নাচে এবং শীতল যে হই উষ্ণ নিঃশ্বাসে]
আমার কাছে তত্ত্ব তালাশ, আমার আছে ব্যাধির বিলাস
জানা যে হয় প্রাণের অন্তকরণ, আমার আছে সাধের নিবাস
গোলাপ ফুটে, গোলাপ ফুটে, আভায় আভায় গোলাপি গাল
ক্ষেতের ফসল বিনাশ মূর্খ গোঁত পয়মাল।।

গোত্র ছেড়ে স্বাধীন হলে চক্রে পড়তে হয়
এই দুনিয়া এখন তো আর বাসের জন্যনয়।।

৫।

আমার গাঁয়ের দুরকী বনে খুনরা এসে প্রথম থামে
সব খুনিরা খুনের পরে জীবন যাত্রার কোন জংগমে।।
তার দেখা পাই জংশনে, খুন করে নাই জ্যোৎস্না রাতে…।।

৬।

হুইসাল, টংঘরে, পয়মাল তাড়াবো
বিনষ্ট ফসলের জন্য বিনিদ্র…
ড্রাম, ট্রাম্প্যাট বাজে, সবাই সেজেছে নানা সাজে
যেখানে যেখানে সব রাজন বিরাজে
বাজে অন্তকরণে, সেখানে বিধবা ঢোল কী বোল দেবে, স্বামী তার রক্ষিতা
কামশ্রীর প্রেমে।।

হুইসাল অন্ধকারে, খেদাবো খেদাবো
হাতীবান্ধা এতো সহজ নয়, আছে মাহুতের ভয়
দুনিয়া দুনিয়া, তুমি আমারই বাল্যপ্রেম, তুমি তো কেবলই নও মৃম্ময়

প্রতিমা গড়ানো হয়, চিন্ময়-মৃম্ময়, প্রাণ ও শিল্প প্রতিবেশী
প্রাণ যদি পর হয়, আমার অলীক ভয়, নিজের রাজ্যে আমি পরদেশী।।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top