অসুস্থ বুলবুল চৌধুরীর ছবি দিবেন না প্লিজ

‘এই ভাবে দিন যাবে না’


প্রকাশিত:
৫ মে ২০২১ ১৪:১১

আপডেট:
২০ জুন ২০২১ ১২:৩৩

এক)

দেখলাম লেখক বুলবুল চৌধুরী অসুস্থ এবং তার ওই অসুস্থ হওয়ার ছবি দিয়ে অনেকে তার হয়ে ভিক্ষা চাওয়া শুরু করে দিয়েছেন। দয়া করে থামুন, দয়া করে, দয়া করে, দয়া...থামুন।

যদি কেউ তার হয়ে ভিক্ষা করেন, দয়া করে তার ওই ভিক্ষায় সম্মতি আছে এমন স্বাক্ষর সহ ওই ভিক্ষা যেন করা হয়। না হয় তাকে এমন গরীব বা অসহায় উপস্থাপন করে সামাজিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করবার আপনার অধিকার নেই জনাব।এই বোধ হতে বিরতি নেন যে লেখক মানে অন্যদের দয়া ও করুনা নির্ভর চলতে হবে। বিশ কোটি মানুষের দেশে এমন বহু কোটি মানুষ অসহায়। কেনোনা আমাদের জানামতে তিনি কখনও ভিক্ষা করেননি। যদি কেউ তাকে সাহায্য করতে চান দয়া করে তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখুন; পাবলিক ফোরামে নয় এবং তার অসুস্থ কোনও ছবি দিয়ে তাকে সামাজিক ভাবে হেয় করবার অধিকার তিনি দিয়েছেন বলে আমাদের মনে হয়না। তার অসুস্থ ছবি ফেসবুকে পাবলিক ফোরামে দয়া করে দিবেন না।

দুই)

আমি আজকাল খুব আধুনিক, যাকে কিনা বলে থাকা হয় স্মার্ট, তা হওয়া শুরু করেছি !! অর্থাৎ কিনা অন্তত হাইটেক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আধুনিক ! আমার এই সর্বশেষ উন্নতির পেছনের কারণ হলও আসলে আমার মা কুট্টিবড়ু ! তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই আমার আধুনিক হওয়া ! যেহেতু আমি খুব ব্যাক ডেটেট ! [ চোখে ডজন খানেক টিপ! ] ব্যাক ডেটেড এর বাংলা কী হবে? !

আমার অনাধুনিকতাঃ যেমন, আমি জীবনে কারো ভিডিও কল গ্রহণ করিনি কোনোদিন ! কিন্তু আমাদের গ্রামের বাড়ীর উত্তর-ধারের দরজার বেড়ের-দোন খালে উপর সিমেন্টের কালভার্টের উপরে বসে বাংলাদেশের প্রতি শুক্রবার সকালে আমার মা কুট্টিবড়ু; আমার নানার বড় মেয়ে 'বড়ুয়া' যখন ভিডিও কল করে তখন আমাকে দুনিয়ার সকল ব্যাক ডেটেড ইগো সমূহ কম্প্রোমাইজ ( এর বাংলা কী?) আধুনিক হতে হয় হাইটেকের সঙ্গে !

কাল মায়ের ভিডিও ফোন ধরে বলি "মা এরপরের বার গ্রামে আইলে তুমি কিন্তু আমার জইন্যে মাইট্টা আলূ রাইন্দো"। মা আমার সুচিত্রা বা নার্গিস কী মধুবালাদের মতন করে তার পান খাওয়া মুখমণ্ডলের সৌন্দর্যে মাথা দুলিয়ে নিশ্চিত করেন যে এরপর আমি যখন গ্রামে যাবো মা তখন আমার জন্য শৌল মাছ দিয়ে মাইট্টা আলু ভাজবে। আমি তখন আমার বাবার ঘরের দক্ষিণের বারান্দায় আমেনার খাদেমে [ আথিয়েতায় ] সেইসব খাবার খাবো !

আমাদের শৈশব হলও-- আমাদের ঘরের পেছনের সুরুফল গাছ, বেল গাছ আর মাইট্রা আলু যা কিনা চৈত্র বৈশাখে ( মাস ভুল হতে পারে ) আমাদের জন্য মা রাঁধতেন । আমি মাইট্টা আলুর কথা তুললে নাবিলা, মায়ের নাতী ( আমার ছোট ভাই খোকন আমেনার মেয়ে ) বলে "এইতো বড়াব্বু কবে যেন খেলাম"। আমি বলি "তোমরা মাইট্টা আলু পাইছো কই ? " নাবিলা বলে "আমাদের ঘরের পেছনে"। আমি বলি "ও মা সেই মাইট্টা আলু গাছ কী এখনও আছে ?"। মা বলে, " না এ হবে নতুন গাছ, কেনোনা মাইট্টা আলু হতে লাগে "আঙ্গার মাটি""। ফলে আমাদের ঘরের পেছনে যেখানে ছাই ফেলা হয় সেখানেই যে মাইট্টা আলু লতাগাছ পুততে হয় সে আমার জানা ছিল না ঠিক গতকালের আগ পর্যন্ত। ভাবি এই জইন্যে যে একটা মানুষের জীবনে তাদের মা কী জরুরী জ্ঞানের জন্য ! আহ ! কালও মা আমাকে আলোকিত করলেন মাইট্টা আলুর জীবনের বেড়ে ওঠার শর্ত কী তা বর্ণনা করে।

ভারতীয় রাগ শুনছি। ঠিক এই মুহূর্তে সুভা মুদ্গালের ভীমপলাশি; জানি এরপর আসছে ইউটিউব আল্গারিদম নিয়মে কৌশিকী চক্রবর্তী [ একই রাগ } এবং সঙ্গে হলো

আমার প্রিয় ১২ বছরের পুরনো বুখানন ব্লেন্ডেড স্কচ হুইস্কির প্লাবন বসিয়েছি আমার বরফ ঘেরা গেলাসে... জীবন হচ্ছে অনভিযোগে মরে না যাওয়াকে উদযাপন করা আর ওইসব রাগে অরাগে... হাঃ হাঃ হাঃ ! চিয়ার্স!

তিন )

"The man has fallen". এই বাক্যের সরল অনুবাদ বাংলায় কী হবে ভেবে পাইনি। অনুবাদ করলেও তার কোনও অর্থ দাঁড়াবে তেমন মনে হয়নি। তাও করে দেখি-- " মানুষটির পতন ঘটেছে" ! যদিও 'ম্যান' এখানে কেবল 'মানুষ' অর্থে ব্যবহার করা হয়নি বরং ব্যক্তি অর্থে "... ম্যান হ্যাজ ফলেন"। কাহিনীর আগামাথা জানা না থাকলে এই 'ম্যান ফলেন' বাক্যের অনুবাদ কোনও অর্থ করবে না। অনেক বছর আগে একটা গল্পে পড়েছিলামঃ বরিশালের নাজিরের পোলের উপরে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালে এক আধাপাগল মতন লোক আব্দুর রহমান আকাশের দিকে মুখ করে বাতাসে ঠিক এমনই একটা কথা উচ্চস্বরে চিৎকার দিয়ে ছেড়ে দিত যে "এই ভাবে দিন যাবেনা"। তখন পাকিস্তান পন্থী লোকেরা কী রাজাকারেরা মনে করত আব্দুর রহমান আসলে ওই কথা ইয়াহিয়াকে বা পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে বলে থাকত "এই ভাবে দিন যাবে না"। অনুরূপ ঘটেছিল বহু বছরে আগে প্যারিসের ল্যাটিন কোয়ার্টার এলাকায়, হিস্প্যানিক অধ্যুষিত এক ভবনে একটি কক্ষের জানালা হতে আকাশের দিকে বাতাসে ছুড়ে দেয়া তেমন বাক্য; "দ্যা ম্যান হ্যাজ ফলেন"। সেটা বরিশালে ঘটবার ঠিক ১৬ বছর আগে, ১৯৫৫ সালে। যিনি ল্যাটিন কোয়ার্টারে এমন ডাক পেরেছিলেন তিনি কিউবান কবি নিকোলাস জিলিয়ান। তার অভ্যাস ছিল আদি কিউবানদের মতন অর্থাৎ মোরগের ডাকের সঙ্গে বা তার আগে ঘুম থেকে জেগে ওঠা। ঠিক তেমনই এক মোরগের ডাকের সকালে তিনি তার প্যারিসের আবাসিক ভবনের কক্ষের জানাল খুলে চিৎকার দিয়ে একটি মাত্র খণ্ড সংবাদ পাড়লেন স্প্যানিশে যার ইংরেজি হচ্ছে "The man has fallen"! এই চিৎকারের সামান্য সংবাদে ঘুমিয়ে থাকা প্যারিসের গোটা ল্যাটিন কোয়ার্টারে এক তোলপাড় বয়ে গেল। কারণ প্রায় প্রতিটি ব্যক্তিই মনে করলঃ যে ব্যক্তির পতন ঘটল সেটা তাদের "একনায়ক ব্যক্তিটি"! আর্জেন্টেনিয়ান ভাবল এটা তাদের জুয়ান ডোমিংগো পেরন, প্যারাগুয়েইয়ান ভাবল এটা তাদের একনায়ক আলফ্রেডো স্ট্রোসনার, গুয়াতেমালায়ান ভাবল এটা তাদের ক্যাস্টিলো আরমাস, ডোমিনিক্যান ভাবল এটা রাফায়েল লিওনিডাস ট্রোহিলো, কিউবান ভাবল এটা তাদের নিজস্ব বাতিস্তা! যদিও আসলে সেটা ছিল পেরনের অপসারণ (১৯৫৫)। কিউবান কবি নিকোলাসের এই চিৎকারের কাহিনী বর্ণনা করেন এর আবার অনেক বছর পর গার্সিয়া মার্কেজ। তিনি (মার্কেস) ও নিকোলাস তখন প্যারিসের ওই একই আবাসিক হোটেলে বসবাস করতেন। এবং নিকোলাসের কাছেই মার্কেস শুনেছিলেন ফিডেল ক্যাস্ট্রোর কথা। এ কথা মার্কেস লিখেছিলেন ফিডেল ক্ষমতায় আসবার পর মার্কেস যখন সেই বছরই কিছুদিনের মধ্যে কিউবায় ফিডেলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। এই ভাবে "দ্যা ম্যান হ্যাস ফলেন" একটি বিখ্যাত উক্তি হয়ে থেকে গেল। কাজটি করেছিলেন একজন কবি ! আর তা লিখে গেছেন একজন উপন্যাসিক!

( বানানরীতি লেখকরে নিজস্ব। এটি আজ থেকে প্রতি বুধবার প্রকাশিত হবে। পরে অপারবাংলা বই হিসেবে প্রকাশ করবে)



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top