কবিতার যেন ঝুলবারান্দা

হাসান কল্লোলের কাব্যভুবন


প্রকাশিত:
১৬ নভেম্বর ২০২১ ১৪:৩১

আপডেট:
২৯ নভেম্বর ২০২১ ১২:১৫

হাসান কল্লোলের কাব্যগ্রন্থের নাম  ‘ পাখিজীবন ও আমার ঘুমগাছ’। প্রকাশক, অভিযান।প্রচ্ছদ, মোস্তাফিজ কারিগর। প্রকাশকাল ২০২১ এর অমর একুশে বইমেলা।

বইটিতে পঞ্চাশটি কবিতা রয়েছে। প্রায় সবগুলো কবিতায় যেন পরাবাস্তববাদ  ও জাদুবাস্তবতার মধ্যে একটা দৃশ্যকল্পের পর্দা দুলেছে বারবার। যা মুগ্ধ করার মতো ব্যাপার। উদাহরণ পরে দিচ্ছি। এর আগে সবাই যদিও জানেন, তবু বলি,  পরাবাস্তব শব্দটির ইংরেজি সুরেলিয়িজম।। একে আবার অধিবাস্তবতাও বলা যায়। ১৯২৪ সালে ফরাসী কবি আঁদ্রে ব্রেতোঁর ‘মেনিফেসটো ওন সুরেলিয়িজম’ নামক দলিলটি প্রকাশিত হওয়ার পর পরাবাস্তবতা শব্দটি এসেছে। মূলত এটি একটি আন্দোলন যা ফ্রান্সে শুরু হয়। ডাডাবাদ থেকেই এই ধারার শুরু। এটার মূল কথা হল- কোন বিধি নিয়ম এবং যুক্তি না মেনে অবচেতন মনকে শিল্প সাহিত্যে রূপায়িত করা।
ডাডাবাদীরা নতুন কিছু সৃষ্টির লক্ষ্যে পুরাতন সবকিছুকে ওড়িয়ে দেয়ার পক্ষপাতী কিন্তু নেতিবাচক ও উদ্দেশ্যহীন বলে এ ধারা টিকতে পারেনি। তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ মগ্নচৈতন্যের জগৎ অবাস্তব বলে মনে করত না। তারা স্বপ্নকে বাস্তবেরই প্রতিরূপ মনে করত। এবং এর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করত। এক কথায় বিধিনিয়ম এবং যুক্তিতর্কের গন্ডির বাইরে অবচেতন মনকে রূপায়িত করাই হল পরাবাস্তবতা। আর জাদুবাস্তবতা হলো রিয়েলিটির ওপরে আরেকটি মায়াময় স্বপ্নজাল তৈরি করা।

এই দুটি কাজই কবি নিপুণভাবে করেছেন। যেমন,  শৈশবের ঘড়ি কবিতার শুরুটাই এমন, ‘ আমার একটা ঘড়ি ছিল,ঘড়ির ভিতরে ছিল সমস্ত শৈশব।’ বা নাকফুল নিয়ে লিখতে গিয়ে শিরোনামের কবিতার শুরু এমন, ‘ তিনি খাচ্ছিলেন শীতমাখা চা’। আশ্চর্য ! কী এক উদ্ভট কথা শিরোনামের শুরু এমন, ‘ বেদনা পোহাতে গিয়ে তিনি ট্রামে চাপা পড়ে গেলেন’। ( বলার অপেক্ষা রাখেনা কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে রচিত) জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে শিরোনামে কবিতা ছাড়াও নজরুল ইসলাম, আবুল হাসানকে নিয়ে আছে দুর্দান্ত কবিতা।

তো দেখা যায়, কবিতার শুরুতেই দরোজায় তার এক মায়াজাল বিস্তার। একজন কবির এই যে চিত্রকল্প তৈরি করা এটিই হয়ত কুহক ও রহস্য যা কাব্যদেবী চান কবির কাছে। হাসান কল্লোল এখানে সফল।

 

আধুনিক কবিদের মধ্যে সুররিয়ালিজম নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন : জেইমস টেইট, জন লরেন্স অ্যাশবেরি এবং মাইকেল পালমার। বাংলা কবিতায় সুররিয়ালিজমের যে বাঁক বদল ঘটে তা কল্লোল যুগেই; অতি ভাবনাকাতরতা থেকে কবি জবিনানন্দ দাশ লিখেছেন- 'সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে;/ ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল'। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন 'হাজার চাঁদের চূড়া ভেঙে-ভেঙে হয়েছে ধূসর স্মৃতির গুড়া'। আমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মধ্যেও এই চর্চা দেখে যায়। এক অলৌকিক স্বপ্নভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে মান্নান সৈয়দ দেখেন : চোখের হরদ, চন্দ্র সম্প্রপাত, আলো-জ্বালা জাহাজ, পাশবিক ট্রেনগাড়ি, রূপোর বাকশোর মতো নারী জলতলে শুয়ে আছে, অথবা কী চড়া বাজার! আমাদের পাশের লোকটির সত্যি সত্যি গলা কেটে নিল চীনে পেল্টের উপর এক গাঢ় দোকানদার।

 

হাসান কল্লোল কবি হিসেবে নিভৃতচারী। কিন্তু যেন তাদেরই উত্তরাধিকার। না হয়, এরকম  লাইন তিনি লিখে যান বহু কবিতায়।  উদাহরণ দেওয়া যাক একটা : ‘কবিতা জানে না, কবি তা জানে। যেই জলে এই নদী টলমল/ সে জল জানে না/কতো জল আছে জানে জলাধার।নকশীর কত কারুকাজে প্রেম/হয়েছে গলার হার।( কবিতা: কবিতা জানে না, কবি তা জানে)

 

তার কবিতার কয়েকটি লাইন, ‘ আমি এক বাউলকে জানি/বাতাসের চিরকুটে সে লিখেছিল/ যেদিন তুমি নি:সঙ্গ হবে ইভের মতো/ এই আদমকে সেইদিনই পাবে তুমি!/ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যুবক নিয়েছিল সন্ন্যাস/ মর্গে তবে কার লাশ কাটে আঙুল !! ( কবিতা:জল শুধু সমুদ্রে নেই)

 

কবি হাসান কল্লোলের একটি কবিতার শিরোনাম, জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে। তার এ কবিতায় যাওয়ার আগে আসুন দেখি অন্য দুই প্রধান কবি কি বলছেন তাদের কবিতায়। বিনয় মজুমদার যখন লেখেন 'ধূসর জীবনানন্দ' এবং 'কতিপয় চিল বলেছিল এই জন্মদিন' তখন কবিতা রূপ বদলায়; কবি যেন প্রকৃতির এক অন্যলোকে জীবনানন্দকে নিয়ে ভাবছেন; জন্মদিনে হয়তো সোনালি ডানার চিল এসে সম্ভাষণ জানিয়ে যাচ্ছে। মান্নান সৈয়দ ডুব দিয়েছেন আরও গভীরে, লিখেছেন 'আমার ছেলেবেলায় হারিয়ে ফেলা সবুজ প্রিজম দু'টুকরো হয়ে জ্বলছে' অথবা 'হেমন্তের শিশিরের সুঁই ঘিরে ধরেছে তাঁর পদযুগল'। মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দকে দেখছেন দূরে দাঁড়িয়ে; প্রিজমের মধ্যে আলো ফেলে, দূরের সেই অস্পষ্ট পাঞ্জাবি পরিহিত জীবনানন্দকে দেখছেন কাছাকাছি আয়নায়। যদি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তাহলে কি ঘটে? সবুজ প্রিজম দু'টুকরো হয়ে জ্বলা... এখানে মান্নান সৈয়দ যদি দুটি চোখের কথা বুঝিয়ে থাকেন তাহলে সেটা রূপক হিসেবে ধরতে হবে কিন্তু কবিতাটি পরাবাস্তব, তা তিনি ঘোষণা দিয়ে লিখেছেন, সেই অর্থে ধরে নিতে হবে বাস্তবতাকে একটু ভিন্নভাবে বুঝিয়ে দিতেই পরাবাস্তবের আশ্রয় গ্রহণ করা। 'হেমন্তের শিশিরের সুঁই ঘিরে ধরেছে তাঁর পদযুগল'...এখানে সূচের মতো শিশির অথবা শিশিরের সুঁই এক অর্থে রূপক হিসেবে কাজ করে; আবার কবির অতিকল্পনাও ধরা যেতে পারে। 'জীবনানন্দ' কবিতাটি অতটা বিমূর্ত নয় যে সম্পূর্ণরূপে পরাবাস্তবতায় আবদ্ধ হয়। দু'টো কবিতাই জীবনানন্দকে স্মরণ করে লেখা, দুটো কবিতার মধ্যেই বিমূর্ততার ছাপ আছে, বিষয় এক থাকলেও আঙ্গিক ভিন্ন। এদিকে কবি হাসান কল্লোলের কবিতার লাইনগুলো এমন,  ‘ দেহ কেটেকুটে গোলাপি ফুসফুস/ কিছু স্নায়ুকোষ,কিছু সঞ্জীবনী রক্তের সুধা/ বইমেলার নরম ব্যাগে ভরে নিয়ে আসার পর/ তুমি বাজারের ফর্দের সাথে মিলিয়ে দেখে তা বাতিল করে দিলে/ তোমার প্রয়োজন ছিল বনমোরগের দু’কেজি মাংস/ তরতাজা অতিথিদের থালায় থালায় দিবে বলে/

জীবনানন্দ দাশের যে বিপন্নতা এটিই কি খুব মায়াময়ভাবে কবি হাসান কল্লোল অতি সংবেদনশীলতার সাথে ফুটিয়ে তুললেন না ?  প্রকৃতি নয়। বিনয় বা মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দের প্রকৃতির অন্বেষণ করেছেন। আর হাসান কল্লোল  খুঁজলেন অর্থের সঙ্গে কাব্যের প্রেম-অপ্রেমের দাম্পত্য ।

 

এই বইটিতে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, অপশক্তির হামলায় হুমায়ুন আজাদের পরিণতি বিভিন্ন কবিতায় এসেছে। এসবই  কবিকে আরও বেশি সময়ের ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

 

 

 

 

 

 



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top