কবিতার মায়া ও কায়া

শেখ মুসলিমা মুনের যুদ্ধ ও প্রেম


প্রকাশিত:
২৪ নভেম্বর ২০২১ ১১:৪১

আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২১ ১২:৪৫

বাঙালির ইতিহাসে হাজার বছরের একটি উজ্জ্বলতম বাতিঘর  হল ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীনতা লাভ।  এ নিয়ে  অনেক কবিই কবিতা লিখেছেন। কিন্তু আবুল হাসান দেখেছেন, প্রকৃত অর্থে, আমরা ভালো থাকি না; ভান করি মাত্র। তিনি স্বাধীনতার পতাকায় দেখতে থাকেন চেনা মানুষের মুখ, মুখের প্রতীক- আপনজন হারানোর যন্ত্রণা-আভাস : ‘তবে কি আমার ভাই আজ/ ঐ স্বাধীন পতাকা?/ তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদীতে উৎসব?’ (‘উচ্চারণগুলি শোকের’) শিল্পের প্রতি, তার লাবণ্য আর প্রসন্নতার প্রতি দারুণ আস্থাশীল কবি আবুল হাসান।

কবি আবুল হাসানের কবিতার মতো স্বাধীনতার পতাকার মধ্যে ড. শেখ মুসলিমা মুন খুঁজেছেন তার শহীদ বুদ্ধিজীবি বাবা শেখ আবদুস সালামের মুখ। তিনি দেখাতে চেয়েছেন স্বাধীনতা শব্দটি ও তার শহীদ বাবা কিভাবে এক হয়ে উঠে।

এ আলোচনায় যাওয়ার আগে কবি জীবনানন্দ দাশের সেই বিখ্যাত কথা মনে করি, কবিতা অনেক রকমের। শেখ মুসলিমা মুনের বেশিরভাগ কবিতায় প্রতীক, উপমা ও ছন্দের দ্যোতনা সুন্দরভাবে উঠে এসেছে।

কবি আবুল হাসান দেশমাতার প্রতি তার প্রাণখোলা আহ্বান জানিয়েছেন : ‘উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো!/... সবুজ দীঘির ঘন শিহরণ? হলুদ শটির বন? রমণীর রোদে/ দেয়া শাড়ি? তুমি কি দ্যাখোনি আমাদের/ আত্মাহুতি দানের যোগ্য কাল! তুমি কি পাওনি টের/ আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া চোখের কোণায় তুমি কি বোঝোনি আমাদের/ হারানোর, সব হারানোর দুঃখ- শোক? তুমি কি শোনোনি ভালোবাসা/ আজও দুঃখ পেয়ে বলে, ভালো আছো হে দুরাশা, হে নীল আশা?’ (উদিত দুঃখের দেশ)।

একইভাবে ড. শেখ মুসলিমা মুনও  এ বইয়ের নাম- কবিতায় বলছেন :

স্বাধীনতা আছে : আমাদের বাবা নেই।

সূর্যের মতো আমাদের বাবা নেই।

আমাদের অহংকার আছে। আমাদের আনন্দ নেই।

আমাদের গৌরব আছে। আমাদের সুখ নেই।

দেখা যাচ্ছে, কবিতায় নিত্য অনিত্যের কথাও রয়েছে।আবার কিভাবে স্বাধীনতার সঙ্গে শহীদ বাবা’র সত্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আছে ও নেই এর তালিকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু  উপসংহারের দিকেই শেখ মুসলিমা মুন আবার আশাজাগানিয়া আলাপের বিস্তার ঘটাচ্ছেন কবিতায়। যেমন :

আমাদের স্বপ্ন আছে: আমাদের যুদ্ধ আছে-স্বাধীনতা নেই।

আমাদের যৌবন আছে , আগুন নেই।

নেই নেই নেই।

এই না থাকার মানেই আমার যুদ্ধ

এই না থাকার মানেই আমার একাত্তর

এই না থাকার মানেই আমার স্বাধীনতা

স্বাধীনতা শব্দটি আজ আমার শহীদ বাবার সমার্থক।

ফলে কবি এখানে ত্যাগ , তিতিক্ষা ও স্বজনের প্রাণের বিনিময়ে যে প্রাপ্ত স্বাধীনতা সেটি যে কতোখানি উজ্জ্বল সেটিই বোঝাতে চেয়েছেন। সেজন্য  ওই হিরন্ময় লাইন তিনটি , ‘আমাদের যৌবন আছে , আগুন নেই। নেই নেই নেই। এই না থাকার মানেই আমার যুদ্ধ

 কবি ড, শেখ মুসলিমা মুন রাজনীতি সচেতন। কিন্তু কবিতাকে রাজনীতির স্লোগানের দিকে ঠেলে দেননি। এখানে তার শিল্পরুচির পরিমিতিবোধ। কিন্তু নৃতাত্ত্বিক ভাষ্য খুঁজেছেন। যেমন, ‘একুশ’ নামের কবিতায় তিনি লিখেছেন,

একুশ ছিল দেশবিভাগে সাতচল্লিশের বিভেদে

একুশ ছিল একাত্তরের নয়টি মাসের সংগ্রামে

অগ্নিঝরা সাতই মার্চ আর পঁচিশ এবং ছাব্বিশে।

মানে কবি একুশের ইতিহাসও খুবই অল্প পরিসরে কবিতায় নিয়ে এলেন। কীভাবে ? দেশবিভাগ হয়েছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। বৃটিশদের ডিভাইড এন্ড রুল পলিসির ফাঁদে পড়ে। মুসলিমদের জন্য স্বাধীন দেশ হলো পাকিস্তান। কিন্তু সেই পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে হলো কেন বাংলাদেশকে ? মুসলিম মুসলিম তো একই জাতি, ধর্মীয়ভাবে। তবে ? এখানে ভাষার যে সাংস্কৃতিক দ্বন্ধ , ‘উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ এর প্রতিবাদে বায়ান্নোতে আন্দোলন হয়েছিল। মানে শুধু ধর্মীয় জাতিসত্ত্বা দিয়েই একটি রাষ্ট্র সুসংঘবদ্ধ থাকে না যদিনা, সাংস্কৃতিক শোষণ নি:শেষ না হয়। ঠিক এই কথাই কবি শেখ মুসলিমা মুন কতো অল্পতে লিখলেন। এরপরের লাইনগুলোতে দেখা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ক্রনলজিক্যাল একটা ইতিহাস।

 

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফসল হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জন্ম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রবণতাগুলোকে চিহ্নিত করা যায় বাঙালি ভাষা ও সংস্কৃতি এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাম্যবাদী চেতনা এবং গণতান্ত্রিক চেতনার ভেতর দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আরও অনেকেই বেশ কিছু ভালো কবিতা লিখেছেন। কিন্তু শেখ মুসলিমা মুন যেন ইতিহাসকে, স্বজন হারানোর বেদনাকে পোস্টমর্টেম করে দেখালেন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা ছিল সক্রিয়। কবি একাত্তরের স্বাধীনতার স্বাদ ও মর্যাদাকে বিপর্যস্ত হতে দেখেছেন। সেই পুরনো শকুনেরা পুনরায় জাতিসত্তাকে খামছে ছিঁড়ে ফেলতে শুরু করেছে- তা তিনি অনুভব করেন প্রাতিস্বিক-বোধে। তাই রুদ্র লেখেন- ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই। আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি/ ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে।... ‘রক্তের কাফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে,/ সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা/ স্বাধীনতা সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন/ স্বাধীনতা সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল/ ধর্ষিতা বোনের শাড়ি এ আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।’ শেখ মুসলিমা মুনও  মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও একুশের পোর্টেট এঁকেছেন আবেগ ও ইতিহাসের আয়না হয়ে । রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতার ‘ স্বাধীনতা সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন’ লাইনের মতো ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন মেজাজে শেখ মুসলিমা মুন তার শহীদ বাবা’রই ছবি যেন এঁকেছেন কবিতায়। এই শহীদ বাবার ছবি যেন গোটা স্বাধীন বাংলাদেশের।

শেখ মুসলিমা মুনের কিছু দুর্দান্ত প্রেমের কবিতা রয়েছে। আনন্দ সিরিজের কবিতাগুলো ছাড়াও তার বেশ কিছু কবিতায় দেখা যায় , প্রেমের তীব্র আকুতি। কবি মহাদেব সাহার ‘মানুষের বুকে এতো দীর্ঘশ্বাস’ কবিতার লাইনে কিযে অপেক্ষা প্রেমের। যেমন : একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস বয়ে/ বেড়ায়, কেউ জানে না/ একেকটি মানুষ নিজের মধ্যে কীভাবে নিজেই মরে যায়,/ হায়, কেউ জানে না!

শেখ মুসলিমা মুনের  ‘ কোনো এক বিশুদ্ধ সন্ধ্যায়’ কবিতার অপেক্ষা এমন : ‘কোনো এক বিশুদ্ধ সন্ধ্যায়, মৌন বিকেলে/ আমায় তুমি কথা দিয়েছিলে-একটি ভৈরবী ভোর/মাছরাঙা সকাল আমাকে দিবে/-----------অত:পর  অপেক্ষায় আছি/ তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবস্যা কেটে গেল/সেই প্রভাতি ভৈরবী আজো এলো না/

শেখ মুসলিমা মুন কবি মহাদেব সাহার মতো সরাসরি আকুতি করেননি। কিন্তু ভৈরবীর আকুতি করা মানে দিনের শুরু করা। শান্ত স্নিগ্ধ অপেক্ষা। এরপর অমাবস্যার উপমা এসছে বিরহের। এসেছে চন্দ্রভুকের উপমা উৎপ্রেক্ষা। এখানে কবি কুহকের জন্ম দিয়েছেন কবিতায়। কবিতা একটু কুহকও চায়। বলেছিলেন বহু বহু আগে বিনয় মজুমদার। শেখ মুসলিমা মুন একাজটি করেছেন।  আছে তার অভিমান । আছে অভিমান । না পাওয়ার বেদনা। তাই তিনি ‘ভালোবাসা আমার নয়’ কবিতার শুরুতেই লিখছেন, ‘ জন্মাবধি যা কিছু ভালো লেগেছে/তার কিছুই ছিল না আমার কোনোদিন/ দুরের কোনো নক্ষত্র যেন অসীম দুরত্বে তার অবস্থান’/চাঁদকে ভালোবেসে জোৎস্না জলে ভিজব বলে পেতেছি আঁচল/ অথচ আশ্চর্য হয়ে দেখিজল-কাদা-মাটি বৃষ্টিতে নিমজ্জিত নিজেই/

এই না পাওয়া থেকে কবিমনে বাসনা জাগে। তিনি ‘শেকড় জীবন’ কবিতায় তাই লেখেন :

মাঝে মাঝে খুব গভীরে ডুব দিতে ইচ্ছে করে এতটা, এতটা গভীরে যে যেখানে নামতে নামতে

নামতে নামতে নামতে নামতে নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে

তারপরও কেবল ডুবতেই থাকব ডুবতেই থাকব

আর জলের তলানিতে গিয়ে নি:শ্বাস নেবো নতুন জীবনের

আমাদের জীবন হবে বাতাস-জীবন অথবা

বাকলহীন  শেকড় জীবন।

 

কবির মনে কেন এই বাসনা ? উত্তর তিনিই দিচ্ছেন , ‘নুয়ে পড়া লতার জীবন’ কবিতায়। যেমন :

এলিয়ে পড়েছি যখন নুয়ে থাকা লতা হয়ে/ বৃক্ষ নয় জেনেও জড়িয়ে ধরেছি শুন্যতাকে/------ আসে যদি অসময়ে বন্যা, ঝড় কিংবা প্রলয়/ যদি ভেঙে চুরমার হয়ে ডুবে যাই, ভেসে যাই/ ক্ষতি নেই তবু যেতে যেতে শিখে নেবো/ কূলে ওঠার অকূল কৌশল।

এজরা পাউন্ড প্রেমের কবিতা সম্পর্কে বলেছিলেন, ভাষাবিজ্ঞানে স্বীকৃত যে ভাষা আগে। ব্যাকরণ পরে এসেছে। প্রেমের কবিতার কোনো ব্যাকরণ না থাকাই ভালো। কারণ প্রেমের কবিতায় অনুভুতিটাই আসল। অনুভুতির কোনো অনুবাদ হয় না। হয় না ব্যাকরণসম্মত প্রকাশও।

ড. শেখ মুসলিমা মুনের কাব্যজগত আপাতভাবে খুব সরল, উচ্চমার্গীয়,সুররিয়ালিজম-পোস্ট মর্ডানিজম- ডাডাইজম, পোস্ট স্ট্রাকচারিলিজম এসব বহু বহু তত্ত্বের বা  গোত্রের মনে না হলেও এ জগত চিরকালীন। প্রশ্ন হতে পারে কেন চিরকালীন ?

এ প্রসঙ্গে নীরদ চন্দ্র চৌধুরী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বরাতে  বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন জীবনানন্দ দাশকে। এতে কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পছন্দ করতেন না রবীন্দ্রনাথকে। জীবনানন্দ দাশ মারা যাওয়ার পর বুদ্ধদেব বসু একটি স্মরণ সংখ্যা প্রকাশ করার জন্য কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাছে কবিতা চেয়েছিলেন । সুধীন দত্ত বলেছিলেন , যিনি ( জীবনানন্দ) কবি নন তাঁর জন্য স্মরণ সংখ্যা করবার কি দরকার ! পরে বুদ্ধদেব বসু সুধীনকে বলেছিলেন, আপনার কবিতা রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন না বেশি বুদ্ধিমত্তা দিয়ে লেখা বলে। আর জীবনানন্দ প্রাণের ভাষায়, অনুভুতিকে ভাষায় আনতেন। তাই রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন।

রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুর ১৯৩৮ সালে বাংলা কবিতার একটি সংকলন গ্রন্থ বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশ করেন  । ‘ বাংলা কাব্য পরিচয় ‘ নামে । এই সংকলনে জীবনানন্দ দাশের ‘ মৃত্যুর আগে ‘ কবিতাটি স্থান পেয়েছিল ।

ফলে ড. শেখ মুসলিমা মুনের কবিতা সহজ নয়। দুর্বোধ্যও নয়। তত্ত্বের কপচানি নেই। আছে অনুভুতির অনুবাদ।

ভাষার থেকে অনুভুতির দুরত্ব কতোদুর ?  যোজন যোজন কিলোমিটার দুর। সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের কথা। ইন্টারপ্রিটেশন অব ফিলিং বইতে। শেখ মুসলিমা মুনের কাব্যজগতে সেই অনুভুতির খেলাই আছে প্রখরভাবে , রৌদ্রজ্জ্বল দিনের মতো স্পষ্ট আবার শীতের কুয়াশার মতোন কুহকময়।

 

কবির এ বইটি  প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে। আগামী প্রকাশনী থেকে। মুল্য ১৬০ টাকা।

 



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top