কমলকলি চৌধুরীর পাঁচ কবিতা


প্রকাশিত:
২৮ নভেম্বর ২০২১ ১৭:৪৮

আপডেট:
৬ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩:৩১

প্রথম পুরুষ

তোমার পায়ের পাতায় প্রথম পুরুষের প্রথম চুম্বনের অবশেষটুকু শিশিরের মতো শুকিয়ে গেলো নীরবে! কেহ জানিলো না হায়! একদিন নরম ঘাসের মাঠে যেদিন অগণিত কাশফুল বিছিয়েছিলাম পরম যতনে - সেদিনই পৃথিবী প্রথম শরতের স্পর্শ পেয়েছিলো। তোমার চোখে সেদিন যে আলো ফুটেছিলো, সেই আলো চুরি করে নিয়ে জোনাকিরা অন্ধকারে ডানা মেলে দিলো।

তুমি যখন চোখ বুজে বৃষ্টির মতোন সুখস্পর্ষ অনুভব করলে - তখনই পৃথিবীতে প্রথম বর্ষা নামলো।

সমুদ্রের উত্তুঙ্গ ঢেউয়ের গ্রীবায় লাজনম্র খয়েরি আঙুরগুলো আমার দিকে তাকিয়েছিলো তৃষ্ণার্ত -
হেমন্ত বিকেলের মিষ্টি রোদের ঘ্রাণ তোমার শিরদাঁড়া বেয়ে ক্রমশ ঝরনাধারার মতো গড়িয়ে পড়ছিলো আর সুখধারা হয়ে শুভ্র মেঘের মতোন আমাকে ঘিরে ঘিরে পল্লবিত করছিলো!

একদিন গোলাপি অধরে গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে যেদিন প্রণয়ের সুর তুলেছিলাম আদিম সেতারে - সেদিন একটি অন্ধকার ঘরে আলোর রেখা ভূমিকম্পের মতো কেঁপে কেঁপে উঠছিলো - আর আমি অবাক-চোখে তাকিয়ে দেখছিলাম মৃদঙ্গের মাতাল বোলে পেখম তুলে নাচছিলো অজস্র ময়ূরী! দেখছিলাম সূর্যের প্রখর আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার ঝলকিত রূপ!

আমিই সেই - পৃথিবীর প্রথম পুরুষ - পৃথিবীর প্রথম শিল্পী।


সময়
এ.
জ‌লোচ্ছ্বা‌সে ধ‌সে বাঁধ, ভা‌ঙে কূল
ভেসে যায় পরিপাটি ঘর!
দুর্বিনীত ঝড়ে -
ঝরে পড়ে নিকষিত নীড়,
থেমে যায় বিহঙ্গের বিকশিত স্বর।

দ.
প্রেম এক অফুরন্ত পথ -
হঠাৎ-জাগা চর,
দূরের দিগন্ত, বিষণ্ন মরু, বিদ্ধ-শর
অথবা আলেয়া-ঘোর
কিংবা পদতলে পাতার মর্মর!

ত.
প্রবল জ্যোৎস্নায় প্লাবিত চরাচর -
প্রেম-প্রসবিনী পথের ডাকে
ছাড়ে ঘর পৃথিবীর নারী ও নর!

সময়! সময় এক আশ্চর্য জাদুকর!


ইতিবৃত্ত

পৃথিবীতে তখন একটিও ফুল ফোটেনি,
একটি কবিতাও হয়নি লেখা।
মাধবীলতার নাম তখনও শোনেনি কেউ,
শোনেনি কৃষ্ণচূড়া।
প্রাগৈতিহাসিক যুগেরও আরো আরো আগে...
আমিই নাম ধরে প্রথম ডেকেছিলাম তোমায় - মাধবীলতা!

আদিম নদীর জলে তুমি জলপদ্ম হয়ে বসেছিলে পা ডুবিয়ে,
চমকে ফিরে তাকাতেই সারা পৃথিবী উঠলো ভরে থোকায় থোকায় মাধবীলতায়!
সেই থেকে পৃথিবীর মানুষেরা জানলো মাধবীলতা একটি ফুলের নাম।

তোমার গ্রীবা থেকে আলো নিয়ে খচিত হলো দিন!
তোমার কবরীর কালো চুরি করে আঁধারে সাজলো রাত!
তোমার গা থেকে গড়িয়ে পড়া জলবিন্দু শুষে নিলো হাওয়া,
অতঃপর বৃষ্টি হয়ে ঝরলো মৃত্তিকায়!

এসব কিছুই ছিল না আগে...

তোমার লাজনম্র আঁখি থেকে রং চুরি করে
কৃষ্ণচূড়া উঠলো রাঙা হয়ে!
তখন ফাগুন বলে ছিল না কিছু জগতে,
বসন্ত ছিল কেবল একটি রোগেরই নাম।

তুমি যখন চোখ নাচিয়ে হাসলে -
বেজে উঠলো বাঁশরি, জেগে উঠলো রোদ,
গেয়ে উঠলো পাখি, ফুটে উঠলো ফুল,
নেচে উঠলো নদী, দুলে উঠলো হাওয়া...

মানুষের মধ্যে তখন কেউ কেউ সৃষ্টিশীল হয়ে উঠলেন -
লিখতে শুরু করলেন কবিতা!
আমি চিৎকার করে বললাম, এলো এলো,
ফাগুন যে এলো, বসন্ত এলো এ ধরায়!

সেই থেকে ফাগুন আগুন ছড়ালো -
সেই থেকে বসন্ত আমাদের হলো।

ভালোবাসা

কোনো এক অচেনা পাখির ডাকে
ঘুম ভেঙে যায় যদি,
যদি দৈবাৎ গবাক্ষ-পথে উঁকি মারে ভোর,
নিস্পন্দ শরীর যদি ছুঁয়ে যায় রোদরং আলো,
যদি ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইলো’
কানেকানে মনেমনে ধ্যানেধ্যানে বাজিলো বাজিলো -
আহা! ভালোবাসিলো ভালোবাসিলো...

ভালোবাসা তো হয়েছে ঢের,
ধ্যানমগ্ন কাপালিকের ব্রহ্মচর্য পড়েছে বাঁধা লাম্পট্যের কবলে!
অবশেষে ভালোবাসা লিখিয়াছে ভালো ভালো গান,
তাম্বুলের রসে অধর করিয়া লাল
ভালোবাসা ফাঁদিয়াছে কোটি কোটি কবিতার জাল!
প্রেমিকেরা ভালোবাসে, প্রেমিকারা ভালোবাসে -
নীড়হারা পাখির কূজনে ভালোবাসা গাঁথিয়াছে বিরহের কাল!
এইসব ভালোবাসাবাসি হাসি রাশিরাশি
এখন সব যেনো হয়েছে বাসি!

মাঘের রাতে যারা মাগে ওম শীতল শয্যায়
ভালোবাসা দূরে সরে অগোচরে
অদেখা মেঘের পিঠে, দূরে - অতি দূরে...

প্রেম তখন ভুলে যাওয়া সুখটান -
ঠোঁটের ফাঁকে ধরে থাকা কালো চুরুট,
নিভু নিভু আগুন - ছাই!
আঙুলের আলতো টোকায়
পথের পাশে লুটিয়ে পড়া রাই!


ত্রৈলোক্য

এ.
অরাজক মেঘের মানচিত্রে যখন
ভেসে ওঠে তোমার অবয়ব,
আমার তখন শয্যার সাথে সহবাস
ঘুমচোখে নীল জ্যোৎস্নার শব!

দ.
ত্রিকোণ নদীর অমিত জলধারা,
তীর ঘেঁষে তার আবছায়া বন।
অগণিত শীতরাত্রির আলুলিত মুখ,
যৈবতী জ্যোৎস্নার মাতাল ঘ্রাণে -
শিহরিত সুখে নতজানু মন!

একদা বিশালাক্ষীর জলে যখন
নেচে ওঠে তোমার ময়ূরপঙ্খি নাও,
আমি তখন বিপ্রতিপ সময়ের
দাঁড়টানা মাঝি - ছিন্নকাছি পাল,
আমার তখন মেলে না বাঁও!

ত.
অবশেষে সেতারের তারে যখন
অন্তিম তান -
বিরহব্যথায় সুর তোলে ইমনকল্যাণ!
অদূরে দিগন্তরেখায় তখন -
গোধূলির মুছে যাওয়া রং,
চিতার চিত্রকল্প! অস্পৃশ্য মন!

জীবনের জলছবি রঙধনুর মতো তখন
রাঙিয়ে তোলে মৃত্যুর অমৃত-ক্ষণ!



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top