শ্রীলঙ্কায় অর্থনীতির লঙ্কাকাণ্ড


প্রকাশিত:
২১ এপ্রিল ২০২২ ১৭:৫৭

আপডেট:
১৮ মে ২০২২ ০৬:৪৩

শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তার দেউলিয়াত্ব নিয়ে বাংলাদেশেও আলোচনা আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে জাতিকে আশ্বস্ত করেছেন যে আমাদের অবস্থা অনেক ভালো।

কেন এমন হলো, এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ আসছে। খোদ লঙ্কান মিডিয়া থেকে জানা যাচ্ছে, প্রায় দেড় দশক আগেই সাবধানবাণী শুনিয়েছিলেন দেশটির অর্থনীতিবিদদের একাংশ। তারা বলেছিলেন, তামিল বিদ্রোহীদের নির্মূল করতে মরিয়া শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) মাহিন্দা রাজাপাকসের সামরিক খাতে বিপুল ব্যয়ের সিদ্ধান্ত সে দেশের অর্থনীতির ভিত দুর্বল করে দিতে পারে। ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটির বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সেই আশঙ্কা পুরোপুরি অমূলক ছিল না।

এখন চরম আর্থিক সংকটের কারণে বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধে অপারগতার কথা জানিয়ে লঙ্কার সরকার তার দেশকে ‘ঋণখেলাপি’ ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সে দেশের অর্থনৈতিক দেউলিয়া দশা মেনে নিয়েছে।

চলতি বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক ঋণ এবং সুদ মেটাতে অন্তত ৬৯০ কোটি ডলার ব্যয় করার কথা শ্রীলঙ্কার। কিন্তু কোনও অর্থ নেই। বেহাল আর্থিক দশার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে ও তার ভাই শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দার পদত্যাগের দাবিতে শুরু হয়েছে ব্যাপক জন-আন্দোলন। চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে এখন এই দেশ।

অনেকেই বলছেন এর কারণ চীনা ঋণের ফাঁদ। করোনাভাইরাস মহামারি আকার নিলে বিপদে পড়ে দেশটি। অতিমারি পরিস্থিতি থেকেই ধীরে ধীরে আর্থিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছিল। ২০১৯-এর শেষ পর্বে শ্রীলঙ্কার বিদেশই ঋণের পরিমাণ ছিল মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৯৪ শতাংশ। ২০২১-এর শেষ পর্বে তা ১১৯ শতাংশে পৌঁছায়। ফলে বিদেশি ঋণ পাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জানুয়ারির গোড়াতেই সে দেশে মূল্যবৃদ্ধি ২৫ শতাংশ ছুঁয়ে রেকর্ড গড়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্বে তলানিতে ঠেকেছিল বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়।

আন্তর্জাতিক বন্ড, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পাশাপাশি কলম্বোর বিদেশি ঋণের বড় অংশ চীন থেকে নেওয়া। একটা প্রচারণা আছে যে সংকটের সময় চীনের শি জিনপিং সরকারকে সেভাবে শ্রীলঙ্কার পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। বরং আগামী দুই বছরের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নে দেওয়া প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার পরিশোধের জন্য চাপ দিয়েছে চীন। কিন্তু একতরফা চীনকে দায়ী করা ঠিক ন্যায্য নয় এ কারণে যে শ্রীলঙ্কার মোট ঋণের দশ ভাগ চীন থেকে নেওয়া। ঋণখেলাপি শ্রীলঙ্কার সর্বনাশের মূল কারণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় বন্ড বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অব্যাহত গতিতে বিক্রি করা। শ্রীলঙ্কার মোট ঋণের ৪৭ শতাংশ বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন বন্ড ইস্যু করে নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো শ্রীলঙ্কার সরকার ঢালাওভাবে ডলারে সেভিংস ইন্সট্রুমেন্ট বিক্রি করেছে। এই ডলারভিত্তিক সেভিংস ইন্সট্রুমেন্ট দেশটির সর্বমোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় অর্ধেক। রাষ্ট্রীয় রিজার্ভে ডলারের পরিমাণ তলানিতে ঠেকার কারণে এই সঞ্চয়পত্রের কিস্তিভিত্তিক লাভের টাকা দিতে শ্রীলঙ্কার সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

তাই সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে শ্রীলঙ্কার এই সমস্যা রাতারাতি তৈরি হয়নি। গত ১৫ বছর ধরে এ সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে দেদার ঋণ নিয়েছে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন সরকার। একটি দেশের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে এ ধরনের সার্বভৌম বন্ড বিক্রি করা হয়। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে এ ধরনের বন্ড বিক্রি করে অর্থের জোগান দেওয়া হয়। শ্রীলঙ্কা সেটাই করেছে।

কিন্তু এই অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে সে ব্যাপারে খুব একটা চিন্তা-ভাবনা করেনি। শ্রীলঙ্কায় বৈদেশিক মুদ্রার বড় জোগান আসে দেশটির পর্যটন খাত থেকে। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে প্রায় দুই বছর পর্যটন শিল্পে কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় চরম সংকটে পড়েছে দেশটি। মহামারি শুরুর আগে শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসতো চীন থেকে। কিন্তু চীনে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোর থাকায় চীন থেকে পর্যটক আসতে পারেনি। এর ফলে দেশটির পর্যটন খাতে বিপর্যয় নেমে আসে।

আরেকটি বড় কারণ ছিল, কৃষি খাতে অর্গানিক পদ্ধতির চিন্তাহীন ব্যবহার। ২০২৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়া প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশে অর্গানিক কৃষি চালু করেন। সেজন্য কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এর অংশ হিসেবে শ্রীলঙ্কায় সার আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল কৃষিক্ষেত্রে। এতে চালের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়।

একসময় চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্রীলঙ্কা বাধ্য হয় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের চাল আমদানি করতে। চালের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। অর্গানিক কৃষির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল দেশটির চা উৎপাদনেও। চা রফতানি করে শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। সেখানেও বড় ধাক্কা লাগে। অর্গানিক কৃষি চালু করার আগে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা করা হয়নি। এতে উল্টো ফল হয়েছে।

অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে যে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, তা ছিল না দেশটিতে।

শ্রীলঙ্কায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ তেমন একটি হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগের পরিবর্তে বিভিন্ন সরকার ঋণ করে বড় প্রকল্প করার প্রতি মনোযোগী ছিল বেশি। এসব প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে কতটা ফলদায়ক তার কোনও সত্যিকারের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সততার সঙ্গে করা হয়নি। ঋণ করে প্রকল্প করা, সেগুলো করতে গিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি দেশটিকে লুটেরা অর্থনীতিতে পরিণত করে।

অনেকেই আমাদের দেশকে সতর্ক হতে বলছেন শ্রীলঙ্কার থেকে শিক্ষা নিয়ে। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে না, সেটা বোঝা যায়। কারণ, বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য কখনও নাজুক হয়নি। বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী দেশের বাইরে থাকে এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভকে সবসময় সচল রাখছে। আমাদের পোশাকসহ রফতানি খাত তাদের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এবং আমাদের বিদেশি ঋণ করে করা প্রকল্পসমূহ, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো দ্রুততার সঙ্গে অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রেখেছে। এবং আমাদের কৃষি খাত বরাবরই সাফল্য দেখিয়ে আসছে।

এদিকে পর্যটন নির্ভর অর্থনীতির নেপালেও সমস্যা শুরু হয়েছে। সেখানে মূল্যস্ফীতি নজিরবিহীন অবস্থায় পৌঁছেছে। ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। শ্রীলঙ্কার মতো বিদেশি দেনার ভারে পুরোপুরি জর্জরিত না হলেও ইতোমধ্যে দেশটি বিলাস পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করেছে। তাই লঙ্কান পরিস্থিতিতে সবাই পড়বে, এমন আশঙ্কা করা না হলেও নজর রাখতে অসুবিধা নেই নিশ্চয়ই।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top