জলের কুচকাওয়াজ যখন ‘জলবোমা’


প্রকাশিত:
১ জুলাই ২০২২ ১৫:২৪

আপডেট:
১ জুলাই ২০২২ ১৫:৪৫

জল চেনে না ঘর

স্নেহের মতো নিচে নামার সূত্রটা হোক পর!’ – বাণের কবিতা

কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন– ‘প্রিয় ইন্দিরা তুমি বিমানের জানালা বসে গুজরাটের বন্যা দেখতে যেও না!’ আর একালের বন্যার কবিতা এমন–‘জল ফেরে না ঘরে/ জলের খেলা শেষে তোমার মন কী খারাপ করে?’ জলের খেলা যে খেলা খেলছে সে খেলুক, হয়তো প্রকৃতি অনিয়ম সহ্য করে না কিংবা হয়তো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আছে ২০২২ এর জুনের বন্যায় কিন্তু আজও একথা সমান সত্য যে ‘স্নেহের মতো জল নিম্নগামী’। বোমার ভালোবাসা বিস্ফোরণে আর জলের ভালোবাসা নিচের দিকে ছুটে যাওয়াতে। উজানের জল উপরেই থাকে, সুযোগ পেলেই নেমে আসে নিচের দিকে, দুর্দান্ত বেগে। ঝর্ণা কিংবা জলপ্রপাতের যে প্রবাহমান জল সেসব ‘জলশিল্প’। বন্যাটা একেবারেই ‘জল বোমা’! ছিন্নভিন্ন করে দেয় মানুষের জীবনযাপন!

বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর উৎস উজানে আর তাই শতকরা ৯৩ ভাগ নদ-নদীর জল আসে উজান অর্থাৎ ভারত, নেপাল ও সামান্য কিছু ভুটান থেকে! ভূপেন হাজারিকার গানে আছে– ‘পদ্মা আমার মা, গঙ্গা আমার মা’। কবি নজরুল নিজেও পদ্মার ঢেউয়ের হাহাকার নিয়ে গান লিখেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের সময়ে উদ্দীপ্ত স্লোগান ছিল– ‘তোমার আমার ঠিকানা/পদ্মা মেঘনা যমুনা!’ কিন্তু এটাও সমান সত্য যে বাংলাদেশে বন্যা হবে কিনা কিংবা কতটা বন্যা হবে তা নির্ভর করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, মেঘনা ও গঙ্গা অববাহিকায় বৃষ্টিপাতের ওপর। অতিবৃষ্টির কারণে এবার নেপাল, ভারতের মেঘালয় ও আসাম এবং বিহারে ব্যাপক বন্যা হয়েছে। উজানের নদ-নদীর পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করে নিচের দিকে নেমে এলে বাংলাদেশের সিলেট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, নেত্রকোনা ও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। আগের চেয়ে এই বন্যা (জুন ২০২২) নামের ‘জল বোমা’র ক্ষতির দিকটা অনেক বেশি।

সাধারণত বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, মেঘনা ও গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার তিনশত তেতাল্লিশটি পয়েন্টে পানির সমতল পর্যবেক্ষণ করে বন্যার পূর্বাভাস যাচাই করা হয়। নদ-নদীর এমন পয়েন্টে গিয়েছে পঞ্চাশের বেশি। একটি বিদেশি সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী এবছর বন্যার জল স্মরণ কালের সব বেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ১৯৮৮ সনের বন্যায় বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে জল বিপদ সীমার ১১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল, ৯৮ সালের বন্যায় এটা ছিল আরও কম। ২০২২ সালে নদ-নদীর জল বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ১৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে যা আর কখনও হয়নি। সে কারণে এত দ্রুত এদেশের কোথাও বন্যার পানি বাড়েনি, এত মারমুখো ছিল না জলের কুচকাওয়াজ।

বিদেশি ওই সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী সারা দেশে ছোট বড় বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এবার সিলেট ও অন্যান্য এলাকার বন্যায় এই বাঁধের অনেকটাই ভেঙে গেছে। হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এইসব বাঁধের মেরামত ও জলবোমার সঙ্গে যুদ্ধে যেন এই বাঁধ আবার না ভাঙে। এবার এই ভয়াবহ বন্যায় আগাম সতর্কীকরণও শক্তভাবে করা হয়নি, ছিল না কোনও প্রস্তুতিও। পানির তোড়ে ভেসে গেছে সব প্রতিরোধ, সব ফসল আর অনেক আবাদী পশু। সব হারানো মানুষের কান্নাও সম্ভবত বন্যার জল বাড়িয়েছে।

কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে কেন হয় বন্যা? ছোটকালে পাঠ্যবইতে পড়ানো হতো– ভৌগলিক কারণে আবহাওয়া বা জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এবং মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বন্যা হয়। বাংলাদেশে প্রবাহমান ৪০৫টি নদীর (ট্রান্সবাউন্ডারি রিভার) উৎস ভারত, ভুটান, চীন ও নেপালে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা হিমালয়ের বরফগলা জলের কারণে নদ-নদীর উৎসমুখ থেকে আসা বাড়তি জল নিচের দিকে নেমে আসা শুরু করে। নিচের দিকের জলের উৎস যদি সমুদ্র হয় এবং জল নামার উপায় না থাকলে জল ডুবিয়ে ছাড়ে লোকালয় কিংবা ফসলের ক্ষেত। ডুবে যায় হাওর, বাওর বিল কিংবা নিচু এলাকা। প্রকারভেদে চার ধরনের বন্যা দেখা যায় বাংলাদেশে।

২০২২ এর জুনে সিলেট ও কুড়িগ্রামের বন্যা মূলত ভারি ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত জনিত বন্যা। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের পানি বাড়লে যে বন্যা দেখা দেয় সেটা উপকূলীয় বন্যা। জুলাই-আগস্ট সেপ্টেম্বরে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে যে বন্যা সেটার নাম মৌসুমী বন্যা। পাহাড় ও পাহাড়ী নদীর ঢলে কখনও-সখনও যে বন্যার দেখা মেলে তার নাম আকস্মিক বন্যা। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা আর গঙ্গা অববাহিকার জল একসঙ্গে বাড়লে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয় যা এবারে দেখেছে মানুষ।

বন্যা এলে বৈজ্ঞানিকভাবে মোকাবিলা করলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কম হয়। জল এলে জল ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ জলের এই ফেরার প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করলে বন্যার জল দীর্ঘস্থায়ী হয় লোকালয়ে। আগেই বলা হয়েছে এই জলের উৎস উজানে অর্থাৎ ভারত, নেপাল, চীন বা ভুটানে। বাংলাদেশে প্রবেশের আগে এসব নদীতে জমে থাকা পাথর উত্তোলন করা হয় যার ফলে নদী ভূমির মাটি আলগা হয়ে যায়। এই আলগা মাটি, কাটা গাছ, পাথর ও ইটের টুকরা বা মানুষের ফেলে দেওয়া আবর্জনা সব ধেয়ে আসে, বাংলাদেশে প্রবাহিত নদী হয়ে যায় সাগরে। ফলে নদীরনাব্যতা সংকট দেখা দেয়। নিয়মিত ড্রেজিং করা সম্ভব হয় না। আবার আগের জলাভূমি, ডোবা বা হাওর নেই। হাওর বাওরে জল জমে থাকা কিংবা প্রবাহের পকেট কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে। ভবন হয়েছে অনেক জল তাই গভীরতা পায় না। নগরায়ণের কারণে সব সঙ্কুচিত হয়েছে। জল তাই বের হতে পারে না, মানুষের দুর্দশা হয়ে জমে থাকে লোকালয়ে, রাস্তায়, গোয়ালঘরে, অফিসে বা স্কুলে। এছাড়া ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আছে বাঁধ না থাকা। সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ বা নেত্রকোনা হাওর এলাকার বেশিরভাগ জনপদে কোনও শহর রক্ষা বাধ নেই।

বন্যা নাকি মানুষও ভাগ করে। তাই কবিতার ভাষা এমন- ‘কত্ত বড় সাহস তোমার মানুষ করো ভাগ/ এক ভাটাতে যায় কী মুছে সব জোয়ারের দাগ?’ বন্যার জল যদি দুর্ভোগের জোয়ার হয় তাহলে খানিক প্রশান্তির ভাটার আশায় থাকে মানুষ। সেই ভাটা যতদিন আসে না দুর্ভোগ তারচেয়ে বহুদিন বেশি থাকে। খুব সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনের ওপর দিয়ে যায় বলে অনেক স্মৃতি জমিয়ে রাখার মতো বন্যার স্মৃতি সহসা মোছে না দেশ-বিদেশের বন্যার গল্প আজও লোকমুখে শোনা যায় রূপকথার মতো।

১৯১১ ও ১৯৩৫ সালের বন্যার স্মৃতি এখনও মনে রেখেছে চীন। ইয়াংজি নদীর কারণে সৃষ্ট এ বন্যায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষ প্রাণ হারায়, গৃহহীন হয়ে পড়ে আরও কয়েক লক্ষ মানুষ। ১৯৭৫ সালের টাইফুন নিনার কারণে চীনের ঝুমাদিয়ান সিটির ‘রু’ নদীর ‘বানকিয়া’ বাধ ভেঙে গেলে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ মারা যায়। মহামারি ছড়িয়ে পড়ে যা চীনের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। সেই চীন এখন ‘স্পঞ্জ সিটি’ তৈরি করছে। বন্যার জল এলে মহাসমারোহে স্বাগত জানিয়ে সেসব শহরের জলের আধারে জমিয়ে রাখা হয়। এই জল পরে অন্য কাজে লাগায় চীন।

ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে সুনীল গাঙ্গুলি যে কবিতা লিখেছিলেন সেটা সত্তর দশকের গুজরাটের বন্যার পর। কবিতা শোনার পর ইন্দিরা গান্ধী সুনীলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন 'নটি বয়!'

তবে ২০০৫ এর গুজরাটের বন্যা ছিল ভয়াবহ। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের হারিকেন ক্যাটরিনার আঘাতে সৃষ্ট বন্যায় দু’ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায় আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে লাখ মানুষ। ১৯৮৯ সালের জোনসটাউনের বন্যাতেও এমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশের বন্যা আর ২০১৪ সালে জম্মু-কাশ্মির তথা পাকিস্তান, ভারতের বন্যাও দেশ-বিদেশের বহু পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিল। ২০২২ এর জুনের বন্যা ১৯৮৮ সালকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। এমন জলের মাতম কখনও এদেশে আর দেখা যায়নি।

বন্যা আসবে আবারও। দুর্ঘটনার পর, লঞ্চডুবি বা বিমান দুর্ঘটনার পর আমরা যেমন অনেক কিছু জানতে পারি বন্যার পরও তেমন অনেক কিছু জানা যায়। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর সে সময়কার ফিডব্যাক ব্যান্ডের গায়ক মাকসুদের একটা গান জনপ্রিয় হয়েছিল। গানটির কথা এমন– ‘মাঝি তোর রেডিও নাই বইলা/জানতেও পারলি না আইতাছে ভাইঙ্গা/ সারা বাংলাদেশ জানলো মাঝি তুই তো জানলি নারে।

এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। অনেক কিছু আগে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক তোলপাড় হয়। মানুষের মুখ হয়তো বন্ধ রাখা যায় জলকে আটকানো যায় না। জল আসে, ঘর ভেঙে মানুষকে ডুবিয়ে নিয়ে যায়, বাবা হয়তো তার তিন সন্তান কাঁধে গলায় নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। কেউ গরুকে কোলে নিয়ে বন্যার জল পাড়ি দেয়।

বন্যার ভোগান্তি আগের মতো নেই শুধু। সেটা কয়েকগুণ বেড়েছে। দিন যায়, এদেশে দ্রব্যমূল্য বাড়ার মতো ভোগান্তিও বাড়ে। এই ভোগান্তি খেটে খাওয়া মানুষের। গরিব মানুষের কখনও কেউ ছিল না এখনও নেই! লেখক: রম্যলেখক



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top