ভালোবাসা ও ক্ষমতার চর্চা


প্রকাশিত:
১৭ নভেম্বর ২০২১ ১২:৫৩

আপডেট:
২৯ নভেম্বর ২০২১ ১২:১৮

আমার প্রিয় কবি রাইনার মারিয়া রিলকের একটা উক্তি দেখে কিছু কথা মাথায় আসলো। উক্তিটা এমন "We need, in love, to practice only this: letting each other go. For holding on comes easily, we do not need to learn it."

আমাদের ভালোবাসাগুলো অনেকবেশি কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ–পরায়ণ। তাই ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলেই অনিবার্যভাবেই দগদগে ঘৃণার জন্ম হয়৷ এই ঘৃণার চর্চাটা অস্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব না মোটেই।

আমাদের ঘৃণার উৎস সকল পরিস্থিতিকে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা। সকল পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের এই অদ্ভুত ইচ্ছার জন্ম নেয়- অন্যের প্রতি অতি প্রত্যাশার বোঝা চাপানোর ইচ্ছা থেকে।

অন্যেরা আপনার প্রত্যাশার বোঝা নিতে বাধ্য- এরকম একটা ইনকন্সিডারেট (অবিবেচক) চাহিদা আপনার মধ্যে কেন সৃষ্টি হয়?

কেননা আপনি ভাবেন আপনি মহাগুরুত্বপূর্ণ, পুরো মহাবিশ্বকে আপনাকে কেন্দ্র করে ঘোরা উচিৎ এবং আপনি বাদে বাবি সকল মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া, সিদ্ধান্ত খুবই অগুরুত্বপূর্ণ।

আপনি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাববেন, এটাতে সমস্যা দেখি না। আমাদের প্রতিযোগিতার টেন্ডেন্সি, সোশ্যাল হায়ারার্কিতে উচ্চাসনে ওঠার টেন্ডেন্সি—বায়োলজিক্যাল, যত উপরে ওঠা যায় তত কম মানুষের নিপীড়ন আমাদের সহ্য করা লাগে। তাই নারীবাদ যা-ই বলুক না কেন একজন উচ্চবিত্ত ক্ষমতাবান পুরুষের স্ত্রীর সামাজিক সুযোগ সুবিধা এবং সম্মানের ক্ষেত্রেও একজন নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া গার্মেন্টসকর্মীর থেকে অনেক বেশি।

সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারটা কেবল অর্থনৈতিক গন্ডিতে আবদ্ধ না, উচ্চবিত্ত পুরুষের স্ত্রীর সামাজিক জবাবদিহিতার চাপ কম, সমালোচনার জায়গাটা শিথিল, এবং তাদের ওপর ক্ষমতাবানের নিপীড়নও কম। মোদ্দা কথায় তাদের ওপর পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়নটা উগ্র পুরুষতান্ত্রিক সমাজেও অনেক কম। পিতৃতন্ত্র বা যেকোন তন্ত্রের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বটা কিন্তু খুবই সত্যি। এটা কোন মার্ক্সিস্ট সাহিত্য না, এটা আমাদের ইনহেরেন্ট বায়োলজি— মিস্টার সেরোটিননকে বাড়িয়ে ভালোলাগার অনুভূতিটাকে নিশ্চিত করার সাথে সম্পর্কিত।

আমরা ভালো থাকার জন্য এবং টিকে থাকার জন্য জন্য, তথা সেল্ফ প্রিজারভেশনের জন্য এমনভাবেই হার্ডওয়্যার্ড যে — ভালো মন্দ, ন্যায় অন্যায় প্রায়শই কেবলমাত্র আমাদের স্বার্থরক্ষার মাপকাঠিতেই মাপি। এই সেল্ফ প্রিসার্ভেশন এবং ভালোবোধ করার এই চাহিদাটা অন্যায় চাওয়া না। প্রত্যাশা, আকাঙ্খা এগুলা আমাদের জৈবিক মানসিক চাহিদাকে কেন্দ্র করেই আসে। সেই চাওয়া পাওয়াগুলোও মিথ্যা না, এগুলাকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করে বাঁচাও সম্ভব না।

তাই, আমাদের আশাভঙ্গের বিলাপ থেকে জন্ম নেওয়া হতাশা, অনিরাপত্তা ও এক্সট্রিম কেইসে ঘৃণাটাও খুবই সত্যি। তবে এই নিজের চাওয়া পাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার সাথে সাথে অন্যের অনুভূতি, সিদ্ধান্ত ও চাওয়া-পাওয়ার গুরুত্বটুকু স্বীকার করে নেওয়া - ন্যায্য শান্তিপূর্ণ পৃথিবী তৈরির পূর্বশর্ত।

বিশেষত সোশ্যাল হায়ারার্কিতে, হাই র‍্যাংকের মানুষেরা তাদের থেকে লো-র‍্যাংক এর সকল মানুষের ভোগান্তিকে, তাদের অনুভূতির অস্তিত্বকে স্বীকার করা তো দূরে, সেটার অস্তিত্ব আছে বলেই মনে করেন না।

লো র‍্যাংকের মানুষেরা তাদের স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্খাকে বিসর্জন দিয়ে হাই র‍্যাংকের মানুষের বাড়তি সুবিধা দেবে- এই ভাবনাটা আমাদের প্রবৃত্তিগত। সত্যি বলতে, এই বিষয়টা ভাবনার পর্যায়েও যায়নি এটা রিফ্লেক্স লো র‍্যাংকের মানুষকে এক্সপ্লয়েট করার সময় আমরা ভাবিই না যে কাজটা অন্যায় হচ্ছে কি-না। বরং এই বিষয়গুলাকে আমরা মহানন্দে গ্রান্টেড ধরে নিয়ে জীবন পার করছি। এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের আত্মসচেতন ও পরিস্থিতি সচেতন করে, আত্মজিজ্ঞাসার ( self-searching) ওই জায়গাগুলো তৈরি করতে পারেনি। আমরা, আমাদের ইন্টুইশনকে প্রশ্ন করায় অভ্যস্ত না। এজন্য বস কর্মচারীকে ধমকায়, কর্মচারী স্ত্রীকে ধমকায়, স্ত্রী কাজের লোক ধমকায়, শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ধমকায়। টপ-ডাউন ফ্যাশনে ধমকাধমকি নিরন্তর চলে আরকি- এবং এটা খুব স্বাভাবিক।

তবে, ভালোবাসার পূর্বশর্ত প্রত্যাশা কম করা, ক্ষমা বেশি করা, অন্যের অনুভূতিগুলোর অস্তিত্বকে স্বীকৃতি ও সম্মান দেওয়া, একটু সুবিবেচক আচরণ করা। এই বোধটা সৃষ্টি করা কেবল প্রয়োজন না, অত্যাবশ্যক।

সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্য, প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে অবস্থান, তথা প্রবৃত্তিকে পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ। আর আধুনিক সভ্যতার বৈশিষ্ট্য সহিষ্ণুতা ও মুক্তচিন্তার বিকাশ।

আধুনিক ভালোবাসা, হোক সেটা রোমান্টিক বা প্ল্যাটোনিক, মানুষের প্রতি মানুষের যেকোন সভ্য ও আধুনিক ভালোবাসাটা হবে অন্যের অনুভূতির অস্তিত্বকে এবং চিন্তার জায়গাগুলোকে সম্মান দিয়ে। সর্বক্ষেত্রে সম্মান দিতে না পারাটাও একটা বাস্তব ঘটনা, সেক্ষেত্রে নিদেনপক্ষে গুরুত্ব দিয়ে। এই সহজ বিষয়টুকু বুঝলে আমাদের উচ্চ প্রত্যাশার থ্রেশহোল্ডটা সামান্য নেমে আসবে, সেক্ষেত্রে সকল পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের প্রিমিটিভ ও শিশুতোষী প্রবল আকাঙ্খাও শিথিল হয়ে আসবে। আর এইটুকু হলে ঘৃণার চাষাবাদটা কিছুটা হলেও লোপ পাবে। সেই সাথে সমস্ত মানুষকে নিজের কাছে এবং নিজের প্রয়োজনে আঁকড়ে ধরার মুষ্টিটাও শিথিল হবে। আমরা তখন ভালোবাসা প্রয়োজনে ছেড়ে দেওয়াটা (letting go) হয়তো কিছুটা শিখবো। এই যে ছেড়ে দেওয়ার এই শিক্ষাটা, এইটা জরুরি– একজন পরিণত ও আধুনিক মানুষ হয়ে উঠতে।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top