‘উচিৎ শিক্ষা’ শিক্ষা নয়


প্রকাশিত:
২৬ নভেম্বর ২০২১ ২৩:২৯

আপডেট:
২৯ জানুয়ারী ২০২২ ০১:৩৭

‘‘সুশিক্ষার লক্ষণ এই যে, তাহা মানুষকে অভিভূত করে না, তাহা মানুষকে মুক্তিদান করে’’— রবীন্দ্রনাথ (জাতীয় বিদ্যালয়, শিক্ষা)

লকডাউনে এই প্রশ্নটার সম্মুখীন হতে হয়েছে কম বেশি সবাইকেই- ‘কী কী স্কিল ডেভেলপ করেছো এই লক ডাউনে?’ এই দক্ষতা সৃষ্টির ব্যাপারটা আমার কাছে বরাবরই যান্ত্রিক ও প্রাণবিবর্জিত মনে হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত বিচারে, ইম্প্রেশনিস্ট আর হাইপাররিয়েল আর্টের মধ্যে, ইম্প্রেশনিস্ট আর্টের ধরনটা বেশি জীবন্ত লাগে, মানবিক লাগে। যার এলোমেলো স্ট্রোকে প্রাণের দুরন্ততাটা ফুটে ওঠে, পিক্সেল বাই পিক্সেল সুনিপুণ সুদক্ষ হাতে আঁকা ফটোগ্রাফির মত হাইপাররিয়েল আর্টে সেই শিল্প ও আত্মার প্রকাশটা থাকে না, কেননা শিল্পীর কোন পার্স্পেক্টিভ থাকে না সেখানে।

প্রচলিত ব্যবস্থায় আমাদের শিক্ষকেরা যতটা না শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন, তার চেয়ে অনেক বেশি স্কিল ডেভেলপমেন্টে বা দক্ষতা গড়ায় সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করেন। স্কিল ডেভেলপমেন্টকে হিউম্যানাইজ (মানবিকীকরণ) করার ফলাফলই হওয়া উচিৎ ছিল আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় নামে প্রচলিত যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তা কার্যত ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার কিংবা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে খুব বেশি আলাদা নয়— যেখানে জ্ঞানের চেয়ে, চিন্তার চেয়ে গৎবাঁধা কারিকুলামে শিখনের অভিমুখ সুনির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন— নেই স্বাধীন চিন্তার চর্চার পরিবেশ, না আছে স্বীয় প্রতিভার বিকাশের সুযোগ। দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল মানবিক বোধের সমৃদ্ধি, আত্মার মুক্তির লক্ষ্যে শিক্ষা, যার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশে সায়েন্স ফ্যাকাল্টিগুলাতেও প্রতিক্রিয়াশীলতার চাষাবাদ হয়। দক্ষতা অর্জনে গড়পড়তা মেধার সাথে প্রয়োজন শৃঙ্খলা , যেখানে মনন উপেক্ষিত। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের সমাজ ডেস্পারেটলি উচ্ছৃঙ্খল দুর্বিনীত তারুণ্যের অভাবে ভোগে। ঠিক মাঝেমাঝে না, প্রায়শই ভুগে, কেননা সভ্যতার গতিটা বৃদ্ধ রক্ষণশীল মানুষের হাতে বজায় থাকেনা, তাদের ভাবনাগুলো স্থির ও স্থবিরতাকে আঁকড়ে ধরে থাকেন। অচলায়তনকে প্রশ্ন করলে তারা কেঁপে ওঠেন, জরাগ্রস্ত প্রাচীরে নতুনত্বের আঁচড়ে তারা খুব সহজেই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠেন।

শিক্ষা, শিক্ষক প্রশ্নে ঘুরেফিরে একই আলাপই আসে, তার সারবস্তু কেবল অর্থনৈতিক। বেতন বৃদ্ধি হলেই মানসম্পন্ন শিক্ষকের পরিমাণ বাড়বে এটা আমি মনে করি না। আর্থিক স্বচ্ছলতার গুরুত্ব অনস্বীকার্য কিন্তু অর্থের প্রয়োজনের পাশাপাশি আত্মার মুক্তির একটা চাহিদা, ক্ষুধা থাকা লাগে— যেই ক্ষুধাটা এই সমাজের মানুষের মধ্যে, ব্যবস্থায়— একেবারেই অনুপস্থিত।

একাডেমিয়া দক্ষতার পাশাপাশি ডায়লগেরও জায়গা, আমাদের এখানে ডায়লেক্টিক্যাল লার্নিং (ডায়ালগের মাধ্যমে শিক্ষা) এর পরিবেশই নাই। এই পরিবেশটা জরুরি। তাছাড়া আমাদের ডায়লগকে হাইজ্যাক করে সংখ্যাগরিষ্ঠের পুরনো বস্তাপচা মূল্যবোধ। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় একটা কাঠামোগত পরিবর্তন না এলে বা সাংস্কৃতিক বিপ্লব না ঘটলে—যে বিপ্লব উত্তরণের, আত্মোন্নয়নের এবং জীর্ণ অন্ধকারে আলোকায়নের— শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও মানবিকায়নের ঘটনাটা ঘটবে না। ফলে পুরনো সংকট মলাটবদ্ধ, বিধিমালায় চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকবে।

আমাদের বর্তমান সমাজ কাঠামোতে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ইন্ট্যার‍্যাকশানটা একমুখী। টপ-ডাউন (উপর থেকে নীচের দিকে) ফ্যাশনে চলে, মানে শিক্ষক যে কি-না অথরিটি তার থেকে ছাত্র যে কি-না ভৃত্য পজিশনে আছে তার দিকে। বটম-আপ বা নীচ থেকে উপরে আওয়াজটা যায় না বললেই চলে। এই একমুখী প্রক্রিয়ায় শিখন স্থবির, জাড্য যেখানে বিধিবদ্ধতার বাইরে বিকাশের কোনও সুযোগ ঘটে না।

শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেও নয়, আমাদের পিতৃতান্ত্রিক অবকাঠামোতে সব অথরিটি ফিগারের মানুষের সাথে তার অধীনস্থের সম্পর্ক মাস্টার–স্লেভ (প্রভু–ভৃত্য) ডাইনামিকস মেইন্টেইন করে। পিতামাতার সাথে সন্তান, শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থী, বসের সাথে কর্মচারী, স্বামীর সাথে স্ত্রী, গৃহকর্ত্রীর সাথে গৃহকর্মী, সরকারের সাথে জনগণের ইত্যাদি সম্পর্কগুলার ধরনটাই প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্কের মত। আধুনিক সমাজে ভৃত্যদেরও গলার স্বর আছে, যেই আওয়াজটা অনেক সময় শিক্ষিত ও সভ্য গৃহকর্তার কানে পৌঁছায়। মাস্টার-স্লেভ ডাইনামিকসে ভৃত্য বলতে মধ্যযুগীয় কৃতদাসের ধারনার সদৃশ ধারনাকে বোঝাচ্ছি, যেখানে ভৃত্য এতটাই শোষিত যে তার কোন ভয়েস থাকে না, তার স্বাধীন কোনও অস্তিত্ব থাকে না, বিধিবদ্ধ পরিধির বাইরে তার পদক্ষেপ সেখানে অপ্রত্যাশিত, আজ্ঞায় সাড়া দেওয়া তার কাজ, প্রভুর আজ্ঞাপালনই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।

উল্লেখ্য, পিতৃতন্ত্র আর পুরুষতন্ত্র এই শব্দ দুটো আমার কাছে একই অর্থ বহন করে না। পুরুষতন্ত্র হলো পুরুষ আধিপত্য ও পুরুষের স্বার্থরক্ষার তন্ত্র, যেটাকে আমি পিতৃতন্ত্রের সাবসেট (পিতৃতন্ত্রের একটা অংশ) হিসেবে দেখি। পিতৃতন্ত্র হলো ফাদার ফিগারের বা অথরিটি ফিগারের তন্ত্র, যার অন্তর্ভুক্ত - নারীর উপর পুরুষের আধিপত্য, পরিবারের পিতার প্রতি– নারীপুরুষ নির্বিশেষে পরিবারের অন্য সকল সদস্যদের আনুগত্য; একইভাবে ডাক্তার, শিক্ষক ও বসের তার অধীনস্থের উপর আধিপত্য চলে।এই পিতৃ অবয়বটা ( ফাদার ফিগারটা) কেবল কর্তা বা প্রভু নয়, তাকে অনেকটা ঐশ্বরিক হাইটেই দেখা হয়, মানে প্রভুর ভুমিকাটা ঈশ্বরের অবস্থানের অনুকরণ, তাদের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যের প্রদর্শন।

পৃথিবীর সমস্ত দেশেই এই আধিপত্যের ব্যাপারটা দেখা গেলেও, সভ্য দেশগুলাতে এই ব্যক্তিপর্যায়ে এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থেও পারস্পরিক আধিপত্যবাদের চর্চাটা নিরুৎসাহিত করবার অবস্থান তৈরি হয়েছে এবং তা কার্যত শিথিল হয়ে আসছে ক্রমান্বয়ে। উন্নত দেশগুলাতে অধীনস্থের আবেগ-অনুভূতি, চিন্তাভাবনা, মতামত ও সুবিধা অসুবিধাকে গুরুত্ব দেওয়ার চল আছে, মানে শিথিলভাবে অথরিটির আধিপত্য চলে। ডমিনেন্স কিংবা হায়ারার্কির উপস্থিতি প্রাকৃতিক যার ফলে এর পূর্ণ বিলোপ সম্ভব নয়, কিন্তু আধুনিক সমাজে হায়ারার্কির বৈশিষ্ট্য হবে সহনীয়, এবং এটা শোষণের অনুরূপ না হওয়া বাঞ্ছনীয়।

আমাদের পিতৃতান্ত্রিক ও আধা সামন্ততান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় টপ-ডাউন ফ্যাশনে তীব্র চেইন অফ কমান্ড প্রচলিত। তাই অযোগ্য সিনিয়ররা বেশ একটা আত্মতৃপ্তির ঈদ-ঈদ অনুভূতি পেয়ে থাকেন; কেননা তারা তো এই সমাজের প্রশ্নাতীত ঈশ্বর! তাদেরও যে জবাবদিহিতার প্রশ্ন আসতে পারে এই বিষয়টাই তাদের ভাবনা-পরিধির বাইরে। বার্ধক্য ও জরাকে( এই শব্দ দুটোকে আমি আক্ষরিক ও ফিগারেটিভ দুই অর্থেই বলেছি) উদযাপন করা সমাজে, বৃদ্ধরা (যে কোন অথরিটেটিভ ফিগার) যদি নিষ্ফলা বটবৃক্ষ হয়, তাদের ছায়ায় ফলদায়িনী আমের গাছ আলো পায় না বিধায় তা জন্মায় না— এই সহজ জিনিসটা বটবৃক্ষের ছায়াপ্রার্থী বেশিরভাগ মানুষই ভু'লে বসেন।

ভাগ্যিস! বৃদ্ধদের শৌর্যবীর্যকে রক্ষা করবার একটা সামাজিক ব্যবস্থা আছে! নয়তো এই অযোগ্য মানুষগুলার বয়েস আর প্রজ্ঞাহীন (ইন্সাইটলেস) অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কোন পুঁজি ছিল না নিজেকে যোগ্য মানুষ হিসেবে ভাবার ও নিজের আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে।

পিতৃতান্ত্রিক বার্ধক্যকে ঐশ্বরিক তাৎপর্য আরোপ করা ও তারুণ্যকে পিষে হত্যা করবার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন না ঘটলে শিক্ষা ব্যবস্থার দৌড় কারিগরি শিক্ষা পর্যন্তই থাকবে, কেননা মুক্ত পরিবেশ না পেলে মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটে না কখনোই। আর মুক্তি কেবল তখনই সম্ভব যখন আমাদের সমাজ ব্যবস্থার কারণে উদ্ভুত কর্তাব্যক্তিদের ঢালাও গডকমপ্লেক্সের একটা প্রতিকার পাওয়া যাবে, যখন কর্তারা নিজেদের সাধারণ মানুষের কাতারে দেখার চর্চাটা করতে পারবেন এবং অধীনস্থের আওয়াজটা আরেকটু জোরালো হবে। যখন শিক্ষক শিক্ষার্থীর জ্ঞানের আদান প্রদানটা উভমুখী হবে, অর্থাৎ একটা ডায়লগের সূচনা হবে। নতুন দিনের শিক্ষার অভিমুখ হতে হবে যুগপৎ মানবিক বোধের বিকাশ এবং সৃজনশীল দক্ষতা অর্জনের সমন্বয়ে।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top