বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নির্বাচন শুরু হয়েছে গত ২৭ মার্চ

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার মসনদে কে বসবে?


প্রকাশিত:
১০ এপ্রিল ২০২১ ১২:১৩

আপডেট:
৫ আগস্ট ২০২১ ১০:১৭

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নির্বাচন শুরু হয়েছে গত ২৭ মার্চ। মাসব্যাপী এই নির্বাচন কার্যক্রমে ভোট গ্রহণ চলবে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত এবং ফলাফল প্রকাশ হবে ২ মে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আসাম, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং পন্ডিচেরীর নির্বাচনের ফলাফলও প্রকাশিত হতে যাচ্ছে একইদিনে।

সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে বামপন্থী দল এবং বেশকিছু স্বতন্ত্র দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও চূড়ান্ত জয় পরাজয়ের লড়াই হবে মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির মধ্যে। আকাশসম জনপ্রিয়তা নিয়ে বাঙালি নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা ভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে টানা তৃতীয়বারের মত বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদির দল ঘোষণা দিয়েছে, বিজেপি এবার পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০০টি আসনে জয়লাভ করবে। যার প্রতিউত্তরে তৃণমূল কংগ্রেস বলেছে বিজেপি এই বাংলায় ১০০টি আসনও পাবে না।

এমন নির্বাচনী বাকবিতণ্ডার মধ্যেই শেষ হয়েছে ৮টি পর্যায়ে অনুষ্ঠিতব্য ভোটগ্রহণের তৃতীয় পর্যায়। এ পর্যায়ে এসে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা একসময় আকাশসম থাকলেও এবারের নির্বাচনে তা অনেকাংশেই কমে এসেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটে ভাগ বসাতে আবির্ভাব ঘটেছে নতুন কিছু স্বতন্ত্র মুসলিম দলের। সেই সঙ্গে বিজেপির জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকটা। এছাড়া বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট কমাতে সক্ষম হয়েছে বলেও অনেকে মনে করছেন।

১৯৯৮ সালের পহেলা জানুয়ারি মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেন তার নিজস্ব দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। তার রাজনৈতিক জীবনে পূর্বের ২৬ বছর তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৯৮ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৭টি আসনে জয়লাভ করে, ১৯৯৯ সালে বিজেপির সাথে ৮টি আসনে, ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সমর্থনে ৬০টি আসন, ২০০৬ সাথে বিজেপির সাথে ৩০টি এবং ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বঙ্গ প্রদেশে ১৯টি আসনে জয়লাভ করে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস উত্তর উত্তর তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে চলেছে।

২০১১ সালের অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে মমতার "মা, মাটি ও মানুষ" শ্লোগান এক বিশাল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং ৩৪ বছরের পুরনো বামপন্থী সরকারকে নির্বাচনে হারিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসতে সমর্থ হয়। এতবড় জয়লাভের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং কংগ্রেসের সমর্থন। পরের নির্বাচন ২০১৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ২৯৪ টি আসনের মধ্যে এককভাবে ২১১ টি আসন নিয়ে জয়লাভ করে। এসময় বামপন্থী দলগুলো আরও বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

তবে ২০২১ সালের অর্থাৎ বর্তমান নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস তৃতীয়বারের মত ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হলেও ২০১১ সালের মত রাজনৈতিক পটচিত্রে এত বড় পরিবর্তন কিংবা ২০১৬ সালের মত বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ হয়ত নিশ্চিত করতে সমর্থ হবে না। কেননা এবার বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার অনেকাংশ জুড়েই রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, মুসলিম ভোট একত্র করার চেষ্টার অভিযোগ এবং কোভিড-১৯ মোকাবেলায় অব্যবস্থাপনাসহ আরও বিভিন্ন বিষয়।

বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ২৭ শতাংশের বেশি (২০১১ সালের গণনা অনুসারে) মুসলিম ভোট নিজের পক্ষে নেয়ার 'অপচেষ্টা' চালিয়েছে। বিজেপির এমন অভিযোগের কারণ, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস মুসলিম ভোটের ৭০ শতাংশ অর্জনে সক্ষম হয়েছিলো, যেখানে কংগ্রেস পেয়েছিলো ১২ শতাংশ এবং বামপন্থী দল পেয়েছিলো মাত্র ১০ শতাংশ মুসলিম ভোট। কিন্তু পূর্বের চিত্র এমনটা ছিলো না। ২০০৬ সালের অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে ৪৫ শতাংশ মুসলিম ভোট পেয়েছিলো বামপন্থী দল, ২৫ শতাংশ  কংগ্রেস এবং ২২ শতাংশ পেয়েছিলো তৃণমূল কংগ্রেস। তবে এই চিত্র ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে পাল্টাতে শুরু করে। ঐ বছর লোকসভার ৪২ টি প্রাদেশিক আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ৩৪ টি আসনে জয়লাভের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ মুসলিম ভোট যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলো। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে মুসলিম ভোটের ৫১ শতাংশই পড়েছিলো তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে।

মোটকথা, পশ্চিমবঙ্গের বামঘেঁষা মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটব্যাংক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলিতে এসে পড়ায় বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মুসলিম ভোটব্যাংক একত্রীকরণের অভিযোগ নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণায় বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া শুভেন্দু অধিকারীসহ তৃণমূলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল পরিবর্তন করে বিজেপিতে যোগদান করায় তৃণমূলের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আবার মোহররমের সময় দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনে বাঁধা তৈরি করায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে ২০১৭ সালে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত জবাবদিহি করতে হয়েছিলো, যা হিন্দু ভোট একত্রীকরণে খুব ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে বিজেপি।

অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটব্যাংক নিজের ঝুলিতে নেয়ার সর্বাত্বক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন কৌশলে। শুদ্র, মাতুয়াসহ বিভিন্ন তফসিলি সম্প্রদায়ের ভোট তিনি একত্র করে চলেছেন। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অভিযোগ, ভোটের দিন মোদি আশেপাশের অঞ্চলে সভা করেন; যেটা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন। এমন অভিযোগ আনার পর থেকে নরেন্দ্র মোদিকে প্রায় প্রতিবারই ভোটের আগেরদিন বা ভোটের দিন নির্বাচনী এলাকার আশেপাশের অঞ্চলে সভা করতে দেখা যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যথেষ্ট রাগিয়ে তুলেছে; যে ব্যাপারটি তার বক্তব্যের মাধ্যমেও স্পষ্ট বোঝা যায়। মোদি এখানে নিঃসন্দেহে মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলতেই বসেছেন। তিনি এবং তার দল বিজেপির অনেক নেতাকর্মীই মমতা ও তৃণমূল কংগ্রেসকে ব্যাঙ্গ করে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতাও দিয়ে বেড়াচ্ছেন, যা তৃণমূলের উপর অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

মমতা ও তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপিকে "বহিরাগত" হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সেই সাথে বিজেপির প্রতি সতর্কবার্তায় বলেছে "খেলা হবে"। পাল্টা উত্তরে মোদিও জানিয়েছেন "খেলা শেষ হবে"। বিজেপি এবং তৃণমূলের এমন ব্যাঙ্গাত্বক খোলামেলা চ্যালেঞ্জের মাঝে আবির্ভাব ঘটেছে মুসলিম নেতৃত্বাধীন কিছু স্বতন্ত্র দলের।  দলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির "অল ইন্ডিয়া মাজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন" এবং ফুরফুরা শরিফের আব্বাস সিদ্দিকীর দল "ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট", যেটি কংগ্রেসের বামজোটের সাথে একত্র হয়ে নির্বাচন করবে হুগলী অঞ্চলে। এ দলগুলো মমতার ভোট নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিজেপি কখনই পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে সুবিধা করতে পারেনি। বরং একসময় বিজেপিকে "বারবাজারের পার্টি" বলে ব্যাঙ্গ করা হতো। পরবর্তীতে ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে বিজেপি ২ টি আসনে জয়লাভ করতে সমর্থ হয়।

৯০' এর দশকের শেষের দিকে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মের সাথে সাথে পশ্চিমবঙ্গে যেমন বামদল এবং কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা কমতে থাকতে ঠিক তেমনি এই সময় থেকেই বিজেপির ভোটব্যাংক একটু একটু করে বাড়তে শুরু করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি ১৮ শতাংশ ভোটের মাধ্যমে এককভাবে ২টি আসনে জয়লাভ করতে সমর্থ হয় এবং ২০১৬ সালের অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে ৩টি আসনে। আশা করা যায় গত নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনেও বিজেপির অবস্থান উন্নতির পথেই থাকবে।

২০১৯ সালে নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল পাশের মাধ্যমে মোদি সরকার ধর্মের ভিত্তিতে শুধুমাত্র মুসলিম সম্প্রদায় বাদে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্ব প্রদানের অঙ্গীকার করেছেন। ফলে উক্ত সম্প্রদায়ের অভিবাসীদের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত বিজেপির জনপ্রিয়তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সেই সাথে এর বিপরীত প্রভাবও কম নয়। কেননা হিন্দু সম্প্রদায় ব্যতীত অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকের চেয়ে মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যায় বেশি।

মোটকথা, ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে চূড়ান্ত বিজয়লাভ করতে পারুক বা না পারুক ২০২৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই অবস্থান যথেষ্ট সুবিধা দেবে। তবে বিতর্কিত কৃষি আইন, দুর্নীতি, নেপাল ও চীনের সাথে সীমান্ত দ্বন্দ্ব ইত্যাদি অভিযোগের পরেও যদি বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে নিজের খুঁটি শক্ত করতে সমর্থ হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে সেটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে হবে বড় ধরণের পরিবর্তন। এখন দেখার পালা সৌভাগ্যের চাকা কার দিকে ঘোরে, যেটা জানার জন্য মে মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে ভারতবাসীকে।

 



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top